📄 হযরত আয়েশা রাযি. এবং বিখ্যাত মুসলিম নারীগণ
সিদ্দীকায়ে কুবরা রাযি. ছাড়া পৃথিবীর আর কোন নারী আছেন? যিনি আপন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, নৈতিক আভিজাত্য ও ধর্মীয় মাহাত্ম্য-সহ ধর্মের জগতে, জ্ঞানের জগতে, সমাজ-জীবনে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এত বিচিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এত অবদান রেখে গেছেন? আর কোন নারী কীর্তিময় জীবনের মহিমায়, প্রভু-ভক্তি ও উপাসনায়, চারিত্রিক শিক্ষার প্রচারে, আত্মিক দীক্ষার প্রসারে, সুগভীর ধর্মীয় জ্ঞানে, ধর্মীয় বিধি-নিষেধের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি নারীর' জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হয়ে আছেন? এমন সর্বতোমুখী জীবনের জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আছেন? আর কোন নারী এত বৃহৎ একটি সমাজকে ধর্মীয়, সামাজিক ও জ্ঞানগত অবদানে এত ঋণী করে রেখেছেন?
মুসলিম রমণীকূলের ইতিহাসে পবিত্র স্ত্রীগণ রাযি. এবং পবিত্র কন্যাগণ রাযি. ছাড়া আর কার সঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর তুলনা করা যেতে পারে?
টিকাঃ
১. মুসলিম নারীর আনুমানিক সংখ্যা।
📄 হযরত খাদীজা রাযি. এবং হযরত ফাতেমা রাযি.
মুসলিম-ইতিহাসে সকল পণ্ডিত একমত যে, মুসলিম নারীসমাজে হযরত খাদীজা রাযি., হযরত ফাতেমা রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.- ই শ্রেষ্ঠ। অধিকাংশ পণ্ডিত সর্বাগ্রে রেখেছেন হযরত খাদীজা রাযি.-কে, এরপর হযরত ফাতেমা রাযি.-কে, তারপর হযরত আয়েশা রাযি.-কে। কিন্তু এ স্তরবিন্যাস কোনো শরঈ নস বা সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে নয়; বরং পণ্ডিতবর্গের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, বিবেচনা ও গবেষণার আলোকে প্রদত্ত। প্রকৃতপক্ষে, এই তিন মহীয়সী আলাদা আলাদা মর্যাদা ও মহিমায় মূল্যায়িত হয়েছেন বিভিন্ন হাদীসে। তাই অনেক পণ্ডিত স্তরবিন্যাসে না যাওয়াই শ্রেয় জ্ঞান করেছেন। অপর দিকে আল্লামা ইবনে হাযাম রহ. সকল পণ্ডিতের বিপরীতে স্পষ্টত হযরত আয়েশা রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন। তাঁর মতে, হযরত আয়েশা রাযি. শুধু আহলে বাইতের মধ্যেই নয়, শুধু পৃথিবীর নারী-জগতেই নয়; বরং সাহাবীগণের মধ্যেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি তাঁর দাবির স্বপক্ষে অসংখ্য প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। যদি কারও আগ্রহ থাকে তা হলে الملل والنحل গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
এক্ষেত্রে আমরা আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এবং তাঁর শিষ্য আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি। তাঁরা লিখেছেন-শ্রেষ্ঠত্বের অর্থ যদি হয় পরকালীন মর্যাদা তা হলে তার প্রকৃত স্বরূপ একমাত্র আল্লাহই জ্ঞাত আছেন। কিন্তু পার্থিব বিচারে তাঁদের মূল্যায়ন বিভিন্ন আঙ্গিকে হতে পারে। যদি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বমুখী বিপদের মোকাবেলা করে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা, ছায়ার মতো তাঁর সঙ্গে থাকা, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তাঁকে সাহস ও শক্তি যোগানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়, তা হলে হযরত খাদীজা রাযি. সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু যদি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পূর্ণতা, ব্যাপক পরিসরে ধর্মীয় কার্যক্রম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবনাদর্শের প্রচার-প্রসারের দিকটি সামনে আনা হয়, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সমকক্ষতার দাবিদার কেউ হতে পারেন না।'
টিকাঃ
১. যুরকানি: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৯।
📄 হযরত মারইয়াম আ. ও হযরত আসিয়া আ.
হযরত মারইয়াম আ.-এর মাহাত্ম্য আমরা ইসলামের কল্যাণেই জেনেছি। মহাগ্রন্থ ইনজিলের একটি বাক্যও তাঁকে মহিমান্বিত করেনি। ফেরাউন-পত্নী হযরত আসিয়া আ.-ও ইসলাম ধর্মে সম্মানিত হয়েছেন। কিন্তু মহাগ্রন্থ তাওরাত তাঁর সম্মানে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেনি। যেহেতু ইসলাম তাঁদেরকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছেন, তাই বিশ্বাসগতভাবে তাঁদের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যকে আমরা মেনে নিতে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতার ভাষায় এর প্রতিক্রিয়া ও অভিব্যক্তি শুধুই দ্বিধাহীন বিশ্বাস ও আশ্বস্ত নীরবতা।
ওহীর নিখাদ প্রত্যাদেশ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সেটিই সবচেয়ে শুদ্ধ, সবচেয়ে খাঁটি, সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সাচ্চা:
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ رَض قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمُلَ مِنَ الرِّجَالِ كَثِيرٌ وَ لَمْ يَكْمُلْ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَ آسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ وَ فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الثَّرِيْدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
অর্থ: হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুরুষের মধ্যে অনেকেই কামেল হয়েছেন; কিন্তু নারীদের মধ্যে কামেল হয়েছেন শুধুমাত্র ইমরান- তনয়া মারইয়াম আ. এবং ফেরাউন-পত্নী আসিয়া আ.। নিঃসন্দেহে আয়েশা রাযি.-ই শ্রেষ্ঠ সকল নারীর ওপর, যেমন সারিদ' শ্রেষ্ঠ সকল খাদ্যের ওপর।
টিকাঃ
১. সারিদ হলো তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ খাবার। এটি রুটির ব্যাঞ্জনের সঙ্গে ভিজিয়ে খাওয়া হতো。
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৭৬৯ ا كتاب فضائل أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم