📄 ইচ্ছাধিকার দেওয়ায় তালাক হওয়া না-হওয়া
তালাক যত বৈধ বস্তু আছে তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং পরিবার-জীবনের অশান্তিরও সর্বশেষ পরিণতি। এজন্য যতদূর সম্ভব, একে সীমাবদ্ধ, লাগামবদ্ধ করা উচিত। অথচ স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দান করে, আর স্ত্রী সেই অধিকার প্রয়োগ না করে স্বামীকেই বরণ করে নেয়; তা হলেও কতিপয় সাহাবী বলতেন, স্ত্রীর ওপর এক তালাক পতিত হবে। হযরত আয়েশা রাযি. অত্যন্ত কঠোরভাবে এই ফতোয়ার অগ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরেন এবং প্রমাণ হিসেবে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাখঈরের ঘটনাটি পেশ করেন। তাখঈরের আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের প্রত্যেকের কাছে যান এবং আলাদা হওয়ার ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন। কিন্তু কেউই আলাদা হননি এবং কারও ওপরই কোনো তালাক পতিত হয়নি। তা ছাড়া, এটা পারস্পরিক সদাচার ও কৃতার্থতারও পরিপন্থী। একজন নারী এই স্বামীভক্তি ও কৃতার্থতা দেখানোর বিনিময়ে শরীয়ত তার দাম্পত্যজীবনে ব্যর্থতার কালি এঁকে দেবে? সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
📄 জোরপূর্বক তালাক দেওয়ানো হলে
এমনিভাবে যদি কেউ কাউকে বাধ্য করে বলে যে, তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, নইলে তোমাকে হত্যা করা হবে বা দণ্ড প্রদান করা হবে স্বামী ভীত হয়ে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিল, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এই তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক বলে গৃহীত হবে না।' ইমাম আবু হানীফা রহ. ছাড়া সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীনের এই মূলনীতিটিকে গ্রহণ করেছেন। সত্যিই, যদি ইসলামী বিধানে এই ধারাটি না আসত, তা হলে অনেক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত নারী অত্যাচারী শাসক ও স্বেচ্ছাচারী আমীর-ওমরার কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে যেত।
📄 তালাক ও রজআতের সংখ্যা ও সীমা
জাহেলি যুগে যত কুপ্রথা ও কুসংস্কার অবলা নারীদের আষ্টেপৃষ্ঠে ঠেসে ফেলেছিল তার মধ্যে একটি এই ছিল যে, তখন না তালাকের নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল, না রজআতের (তালাক প্রত্যাহারের) সীমা-পরিসীমা ছিল। পাষণ্ড পুরুষেরা কথায় কথায় তালাক দিত, ইদ্দত শেষ হতে না হতেই তালাক প্রত্যাহার করে নিত; এভাবে একের পর এক তালাক আর রজআত চলতে থাকত। না নারীর মুক্তি হতো, না অত্যাচারীর মৃত্যু হতো। কিন্তু এটুকুতেও ওই সব 'স্বামী'দের তৃপ্তি হতো না; তারা নারীকে শুধু কষ্ট আর যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যই এই কুপ্রথার সুব্যবহার করত: না স্ত্রীকে স্ত্রীত্বের সামান্য সুখটুকু দিত, না বিষময় জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগটুকু দিত। নারী এই জীবনব্যাপী ঘূর্ণাবর্তে ঘুরতে থাকত আজীবন; যেন মৃত্যুই মুক্তি।
কিন্তু উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. মুসলিম নারী-সমাজকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। ইসলাম আসার পর মুসলিম সমাজেও একবার এরকম একটা ঘটনার অবতারণা হলো। অত্যাচারিতা নারী ছুটে এলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে। তিনি তার দুরবস্থার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তুলে ধরলেন। অবতীর্ণ হলো পবিত্র কুরআনের এই যুগান্তকারী দিক নির্দেশনা :
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ، فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: তালাক সর্বোচ্চ দুই বার। এরপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে ফিরিয়ে নিতে হবে, নয় সদাচারের সঙ্গে চিরতরে মুক্ত করে দিতে হবে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
টিকাঃ
১. পুরো ঘটনা তিরমিযী: কিতাবুত তালাক-এ আছে।
📄 হজ্জে মেয়েলি মাজুরি
হজের সময় হয় চন্দ্র-মাসের শুরুর দিকেই পতিত। এই দিনগুলোতে অধিকাংশ মেয়েরই শারীরিক অপারগতা থাকে। এখন যদি অপবিত্র অবস্থায় হজের কাজগুলো তাদের জন্য সবই নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তা হলে হজ-উমরার ময়দান তো কেয়ামতের ময়দানে পরিণত হবে। হাজার হাজার মেয়েকে প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে হবে, তাদের সঙ্গে তাদের স্বজনরাও আটকে যাবে; অথবা হজ-উমরা না করেই এক বুক জ্বালা নিয়ে ফিরে আসতে হবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. নিজের জীবনের ঘটনা থেকে এর সমাধান দিয়েছেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে ফতোয়া জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে আয়েশা, তাওয়াফ ছাড়া হজের সকল কাজ এ অবস্থায়ও করতে পারবে। যদি ইয়াওমুন নাহরের (দশই জিলহজ) কাছাকাছি সময়ে অপারগতা আসে, তা হলে আখেরি তাওয়াফ করতে হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক-নির্দেশনার ভিত্তিতে হযরত আয়েশা রাযি. মুসলিম নারীদের সঙ্গে নিয়ে হজ করতেন। যাদের ব্যাপারে সন্দেহ থাকত, তাদের আখেরি তাওয়াফের পূর্বেই রোখসত করে দিতেন। আর যদি আখেরি তাওয়াফের পর সমস্যা হতো, তা হলে হজের সকল আমলই আদায় করাতেন।
হযরত যায়েদ রাযি., হযরত ইবনে উমর রাযি. এবং উমর রাযি. এ ব্যাপারে উম্মুল মুমিনীনের সঙ্গে মতভেদ করেছিলেন। পরবর্তীতে হযরত ইবনে উমর ও যায়েদ রাযি. নিজ নিজ ফতোয়া প্রত্যাহার করেছিলেন। হযরত উমর রাযি. তাঁর ফতোয়া বহাল রেখেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বরং এরকম সমস্যা হলে নারীদের মক্কায়ই পবিত্রতা পর্যন্ত থেকে যেতে বলতেন। একবার কিছু লোক হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে এই মাসআলাটি তুলল। তিনি বললেন, যদি এরকম না করা হয়, তা হলে হজের ময়দানে কমপক্ষে কয়েক হাজার নারীকে আটকে রাখতে হবে। এরপর তিনি অধিকাংশ সাহাবীর আমল দ্বারাও তাঁর মতটিকে সমর্থিত করলেন।' এই মাসআলায় কার কথাটি অধিক যুক্তিযুক্ত ও প্রমাণসিদ্ধ তা যে কেউই বিচার করতে পারেন।
টিকাঃ
১. মুয়াত্তা ও যুরকানী : ا باب إفاضة الحائض