📄 ইদ্দতের সময় সফর থেকে ঘরে ফেরা
স্বামীর মৃত্যুর পর নারীকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হয়। এ সময় আপন ঘরে অবস্থান করা নারীর কর্তব্য, অন্য কোথাও যাওয়া অনুচিত। এই মাসআলা থেকে অনেকে ভেবেছেন, স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে থাকে, তা হলে স্বামীর যেখানে মৃত্যু হবে সেখানে ইদ্দত পালন করতে হবে; আর যদি সঙ্গে না থাকে তা হলে যেখানে মৃত্যুসংবাদ জানতে পারবে সেখানে ইদ্দত পালন করতে হবে। অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না।' অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর কোনোরকম সফর করা নারীর ওপর হারাম। তারা তাদের বুঝের পক্ষে সর্বোচ্চ যে যুক্তিটি উপস্থাপন করেন তা এই যে হাদীসে আছে, এ সময় অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না। অথচ তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, এ সময় বাইরে থাকলে ঘরেও আসা যাবে না, আবার সফরে থাকলে নগরেও আসা যাবে না। কিন্তু এ ধরনের কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। এজন্যই দেখা যায়, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. যে আমল করেছিলেন, তাতে তাদের প্রত্যাখ্যান হয়। তাঁর ভগ্নি উম্মে কুলসুম রাযি. হযরত তালহা রাযি.-এর পত্নী ছিলেন। জঙ্গে জামালের সফরে তিনি স্বামীর সঙ্গেই ছিলেন। হযরত তালহা রাযি. এখানে শহীদ হন। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী উম্মে কুলসুম রাযি.-কে সেখানেই ইদ্দত পালন করতে হতো। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় চলে আসেন। পথে বেশ কিছু দিন মক্কা মুআযযামায়ও অবস্থান করেছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কথা উঠল। তাবেঈ আইয়ুব রহ. মানুষের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, এটা ঘর থেকে বের হওয়া নয়; এটা ঘরে ফিরে আসা। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁকে সফর থেকে নগরে ফিরিয়ে এনেছেন মাত্র।' তাবেঈ আইয়ুবের উত্তরটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। বাস্তবতার নিরিখে বিচার করুন, যদি হযরত আয়েশা রাযি. মাসআলাটি স্পষ্ট করে না দিতেন, তা হলে কত নারীকে এ দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ ও মুয়াত্তায় ফারিয়া বিনতে মালেকের একটি রেওয়ায়েত আছে। তারা সেটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন।
২. ইবনে সাদ: جزء النساء৩৩৯।
📄 ইচ্ছাধিকার দেওয়ায় তালাক হওয়া না-হওয়া
তালাক যত বৈধ বস্তু আছে তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং পরিবার-জীবনের অশান্তিরও সর্বশেষ পরিণতি। এজন্য যতদূর সম্ভব, একে সীমাবদ্ধ, লাগামবদ্ধ করা উচিত। অথচ স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দান করে, আর স্ত্রী সেই অধিকার প্রয়োগ না করে স্বামীকেই বরণ করে নেয়; তা হলেও কতিপয় সাহাবী বলতেন, স্ত্রীর ওপর এক তালাক পতিত হবে। হযরত আয়েশা রাযি. অত্যন্ত কঠোরভাবে এই ফতোয়ার অগ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরেন এবং প্রমাণ হিসেবে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাখঈরের ঘটনাটি পেশ করেন। তাখঈরের আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের প্রত্যেকের কাছে যান এবং আলাদা হওয়ার ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন। কিন্তু কেউই আলাদা হননি এবং কারও ওপরই কোনো তালাক পতিত হয়নি। তা ছাড়া, এটা পারস্পরিক সদাচার ও কৃতার্থতারও পরিপন্থী। একজন নারী এই স্বামীভক্তি ও কৃতার্থতা দেখানোর বিনিময়ে শরীয়ত তার দাম্পত্যজীবনে ব্যর্থতার কালি এঁকে দেবে? সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
📄 জোরপূর্বক তালাক দেওয়ানো হলে
এমনিভাবে যদি কেউ কাউকে বাধ্য করে বলে যে, তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, নইলে তোমাকে হত্যা করা হবে বা দণ্ড প্রদান করা হবে স্বামী ভীত হয়ে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিল, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এই তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক বলে গৃহীত হবে না।' ইমাম আবু হানীফা রহ. ছাড়া সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীনের এই মূলনীতিটিকে গ্রহণ করেছেন। সত্যিই, যদি ইসলামী বিধানে এই ধারাটি না আসত, তা হলে অনেক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত নারী অত্যাচারী শাসক ও স্বেচ্ছাচারী আমীর-ওমরার কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে যেত।
📄 তালাক ও রজআতের সংখ্যা ও সীমা
জাহেলি যুগে যত কুপ্রথা ও কুসংস্কার অবলা নারীদের আষ্টেপৃষ্ঠে ঠেসে ফেলেছিল তার মধ্যে একটি এই ছিল যে, তখন না তালাকের নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল, না রজআতের (তালাক প্রত্যাহারের) সীমা-পরিসীমা ছিল। পাষণ্ড পুরুষেরা কথায় কথায় তালাক দিত, ইদ্দত শেষ হতে না হতেই তালাক প্রত্যাহার করে নিত; এভাবে একের পর এক তালাক আর রজআত চলতে থাকত। না নারীর মুক্তি হতো, না অত্যাচারীর মৃত্যু হতো। কিন্তু এটুকুতেও ওই সব 'স্বামী'দের তৃপ্তি হতো না; তারা নারীকে শুধু কষ্ট আর যন্ত্রণা দেওয়ার জন্যই এই কুপ্রথার সুব্যবহার করত: না স্ত্রীকে স্ত্রীত্বের সামান্য সুখটুকু দিত, না বিষময় জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগটুকু দিত। নারী এই জীবনব্যাপী ঘূর্ণাবর্তে ঘুরতে থাকত আজীবন; যেন মৃত্যুই মুক্তি।
কিন্তু উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. মুসলিম নারী-সমাজকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। ইসলাম আসার পর মুসলিম সমাজেও একবার এরকম একটা ঘটনার অবতারণা হলো। অত্যাচারিতা নারী ছুটে এলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে। তিনি তার দুরবস্থার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তুলে ধরলেন। অবতীর্ণ হলো পবিত্র কুরআনের এই যুগান্তকারী দিক নির্দেশনা :
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ، فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: তালাক সর্বোচ্চ দুই বার। এরপর হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে ফিরিয়ে নিতে হবে, নয় সদাচারের সঙ্গে চিরতরে মুক্ত করে দিতে হবে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
টিকাঃ
১. পুরো ঘটনা তিরমিযী: কিতাবুত তালাক-এ আছে।