📄 ইদ্দতকালীন খোরপোশ
যদি কোনো নারীকে তার স্বামী এক বা দুই তালাক দেয় তা হলে তার ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ স্বামীর ওপরই বর্তাবে, এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই; কিন্তু যদি তিন তালাক দেয়, তা হলে স্বামীর ওপর দায়িত্ব থাকবে কি থাকবে না, এ নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, এমতাবস্থায় তার ওপর খোরপোশ আবশ্যক হবে না। প্রমাণ হিসেবে তারা বলেন, কুরআনে যে আয়াতটিতে এ আলোচনা করা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, স্ত্রী না স্বামীর ঘর থেকে বের হবে, না স্বামী তাকে বের করে দেবে। এরপর বলা হয়েছে:
لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا
অর্থ: আশা করা যায়, এরপর আল্লাহ কিছু ঘটাবেন।
তারা বলতে চান, এই আয়াতটি থেকে বোঝা যায়, স্ত্রী স্বামীর ঘরেই থাকবে, অন্য কোথাও যাবে না এর কারণ হলো, এ দীর্ঘ সময়ে হতে পারে তাদের মাঝে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে; কিন্তু তিন তালাক হয়ে গেলে তো আর এই সুযোগ থাকে না; সুতরাং কুরআন মাজীদের বিধানটি তালাকে রজঈর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, তালাকে বাইনের ক্ষেত্রে নয়।'
কিন্তু আমরা মনে করি, এই প্রমাণ উপস্থাপন যথার্থ নয়। ইদ্দতের সময় স্বামীর ঘরে থাকতে বলার এটাও একটা কারণ, আমরাও তা মানি; কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ, তা মানা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি, এছাড়াও আরও অনেক কারণ ও কল্যাণ আছে এই নির্দেশটিতে। যেমন: তালাকের পর এও নিশ্চিত হতে হয় যে, স্ত্রী গর্ভবতী কি না? এজন্য স্ত্রীকে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়, সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিবাহ করতে পারে না; তাকে যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, সেটা তো প্রথম স্বামীর কারণেই হচ্ছে; তাই অপেক্ষার সময়টাতে খোরপোশ স্বামীকেই বহন করতে হবে। এ কারণেই হযরত আয়েশা রাযি. ফাতেমা বিনতে কায়সের প্রমাণ উপস্থাপনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফাতেমার জন্য এতে কল্যাণ নেই যে, সে তার ঘটনাটি যেখানে-সেখানে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকবে। তার প্রথম স্বামীর ঘরটি অরক্ষিত ছিল বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অন্য ঘরে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। মারওয়ানের শাসনামলে হুবহু এরকমই একটি ঘটনা ঘটে গেল। মারওয়ান ফাতেমা বিনতে কায়সের ঘটনা অনুযায়ী ফায়সালা দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত আয়েশা রাযি. সংবাদ পাঠালেন, তোমরা এটা ঠিক করছ না। ফাতেমার ঘটনা এই ছিল যে, তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা ভালো ছিল না। আর কিছু বর্ণনায় আছে, ফাতেমা কঠোরভাষী ছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন।'
টিকাঃ
১. আবু দাউদ: কিতাবুত তালাক।
২. সহীহ বুখারী, আবু দাউদ, মুয়াত্তা: কিতাবুত তালাক।
📄 ইদ্দতের সময় সফর থেকে ঘরে ফেরা
স্বামীর মৃত্যুর পর নারীকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হয়। এ সময় আপন ঘরে অবস্থান করা নারীর কর্তব্য, অন্য কোথাও যাওয়া অনুচিত। এই মাসআলা থেকে অনেকে ভেবেছেন, স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে থাকে, তা হলে স্বামীর যেখানে মৃত্যু হবে সেখানে ইদ্দত পালন করতে হবে; আর যদি সঙ্গে না থাকে তা হলে যেখানে মৃত্যুসংবাদ জানতে পারবে সেখানে ইদ্দত পালন করতে হবে। অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না।' অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর কোনোরকম সফর করা নারীর ওপর হারাম। তারা তাদের বুঝের পক্ষে সর্বোচ্চ যে যুক্তিটি উপস্থাপন করেন তা এই যে হাদীসে আছে, এ সময় অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না। অথচ তাদের প্রমাণ করতে হবে যে, এ সময় বাইরে থাকলে ঘরেও আসা যাবে না, আবার সফরে থাকলে নগরেও আসা যাবে না। কিন্তু এ ধরনের কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। এজন্যই দেখা যায়, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. যে আমল করেছিলেন, তাতে তাদের প্রত্যাখ্যান হয়। তাঁর ভগ্নি উম্মে কুলসুম রাযি. হযরত তালহা রাযি.-এর পত্নী ছিলেন। জঙ্গে জামালের সফরে তিনি স্বামীর সঙ্গেই ছিলেন। হযরত তালহা রাযি. এখানে শহীদ হন। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী উম্মে কুলসুম রাযি.-কে সেখানেই ইদ্দত পালন করতে হতো। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় চলে আসেন। পথে বেশ কিছু দিন মক্কা মুআযযামায়ও অবস্থান করেছিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কথা উঠল। তাবেঈ আইয়ুব রহ. মানুষের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, এটা ঘর থেকে বের হওয়া নয়; এটা ঘরে ফিরে আসা। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁকে সফর থেকে নগরে ফিরিয়ে এনেছেন মাত্র।' তাবেঈ আইয়ুবের উত্তরটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। বাস্তবতার নিরিখে বিচার করুন, যদি হযরত আয়েশা রাযি. মাসআলাটি স্পষ্ট করে না দিতেন, তা হলে কত নারীকে এ দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ ও মুয়াত্তায় ফারিয়া বিনতে মালেকের একটি রেওয়ায়েত আছে। তারা সেটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন।
২. ইবনে সাদ: جزء النساء৩৩৯।
📄 ইচ্ছাধিকার দেওয়ায় তালাক হওয়া না-হওয়া
তালাক যত বৈধ বস্তু আছে তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং পরিবার-জীবনের অশান্তিরও সর্বশেষ পরিণতি। এজন্য যতদূর সম্ভব, একে সীমাবদ্ধ, লাগামবদ্ধ করা উচিত। অথচ স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দান করে, আর স্ত্রী সেই অধিকার প্রয়োগ না করে স্বামীকেই বরণ করে নেয়; তা হলেও কতিপয় সাহাবী বলতেন, স্ত্রীর ওপর এক তালাক পতিত হবে। হযরত আয়েশা রাযি. অত্যন্ত কঠোরভাবে এই ফতোয়ার অগ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরেন এবং প্রমাণ হিসেবে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাখঈরের ঘটনাটি পেশ করেন। তাখঈরের আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের প্রত্যেকের কাছে যান এবং আলাদা হওয়ার ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন। কিন্তু কেউই আলাদা হননি এবং কারও ওপরই কোনো তালাক পতিত হয়নি। তা ছাড়া, এটা পারস্পরিক সদাচার ও কৃতার্থতারও পরিপন্থী। একজন নারী এই স্বামীভক্তি ও কৃতার্থতা দেখানোর বিনিময়ে শরীয়ত তার দাম্পত্যজীবনে ব্যর্থতার কালি এঁকে দেবে? সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।
📄 জোরপূর্বক তালাক দেওয়ানো হলে
এমনিভাবে যদি কেউ কাউকে বাধ্য করে বলে যে, তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও, নইলে তোমাকে হত্যা করা হবে বা দণ্ড প্রদান করা হবে স্বামী ভীত হয়ে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিল, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এই তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক বলে গৃহীত হবে না।' ইমাম আবু হানীফা রহ. ছাড়া সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনীনের এই মূলনীতিটিকে গ্রহণ করেছেন। সত্যিই, যদি ইসলামী বিধানে এই ধারাটি না আসত, তা হলে অনেক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত নারী অত্যাচারী শাসক ও স্বেচ্ছাচারী আমীর-ওমরার কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে যেত।