📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ইহরাম অবস্থায় পোশাক ও নেকাব প্রসঙ্গ

📄 ইহরাম অবস্থায় পোশাক ও নেকাব প্রসঙ্গ


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতেন, ইহরাম অবস্থায় চেহারায় নেকাব ব্যবহার করা যাবে না (আরবে পুরুষরাও মরুভূমির রোদের তাপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য চেহারায় নেকাব ব্যবহার করত)। কিন্তু নারীদের জন্য পর্দার বিধানের কারণে সবসময় এটা করা সম্ভব হতো না। এজন্য হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমরা যখন বিদায় হজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম তখন কাফেলা সামনে থাকত, আমরা পেছনে থাকতাম; কিন্তু সামনের দিক থেকে কেউ এলে মাথার ওপর থেকে চাদর নামিয়ে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার চেহারা অনাবৃত করতাম। হিজরী প্রথম শতক পর্যন্ত হযরত আয়েশা রাযি.-এর ফতোয়ার ওপরই আমল ছিল。
জনৈকা তাবেঈয়া বর্ণনা করেন, আমরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভগ্নি হযরত আসমা রাযি.-এর সঙ্গে হজের সফর করতাম। আমরা ইহরাম অবস্থায়ও মুখ ঢেকে রাখতাম; কিন্তু তিনি আমাদের নিষেধ করতেন না।'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বর্ণনা করেন, জনৈক সাহাবীর প্রশ্নের উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ইহরামের অবস্থায় জামা, পাজামা, টুপি, পাগড়ি পরা যাবে না। কাপড়ে জাফরান বা কুসুমের রঙ লাগানো যাবে না।'
এই হাদীসের আলোকে অনেকে নারীদের জন্যও জাফরান বা জাফরানের রঙ মিশ্রিত কাপড় ব্যবহার করা নিষিদ্ধ বিবেচনা করেছেন। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, হাদীসটি শুধুমাত্র পুরুষকে কেন্দ্র করে। তা ছাড়া, কথাটি বলাও হয়েছে একজন পুরুষেরই প্রশ্নের উত্তরে। এজন্যই হযরত আয়েশা রাযি. নিজেও ইহরাম অবস্থায় জাফরানের রঙ লাগানো কাপড় পরিধান করতেন। এমনকি তিনি মনে করতেন, নারীরা ইহরামের অবস্থায়ও অলঙ্কার পরতে পারবে; সাদা গোলাপি ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের কাপড়ও পরিধান করতে পারবে。

টিকাঃ
৩. আবু দাউদ : ا باب ما يلبس الغرم
১. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক রহ: | باب تخمير المحرم وجهه
٢. সহীহ বুখারী: | باب ما يلبس المحرم من الثياب
۳. সহীহ বুখারী: | باب ما يلبس المحرم من الثياب

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ব্যবহারিক অলঙ্কারের যাকাত প্রসঙ্গ

📄 ব্যবহারিক অলঙ্কারের যাকাত প্রসঙ্গ


ব্যবহারের জন্য বানানো সোনা-চাঁদির গয়নায় যাকাত আসবে কি না-সাহাবা কেরাম রাযি. এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.-সহ কতিপয় সাহাবী, তাবেঈ এবং ইমামের দৃষ্টিতে, এতে যাকাত আসবে। হানাফি আলেমগণ এ মতেরই সমর্থক। পক্ষান্তরে হযরত ইবনে উমর রাযি., আনাস ইবনে মালেক রাযি. এবং জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. মনে করতেন, এতে যাকাত আসবে না। শাফেঈ, মালেকি ও হাম্বলি আলেমগণ এ মতটিকে সমর্থন করেছেন।
অলঙ্কারাদি যেহেতু নারীদের বিষয় সেহেতু এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতটি মীমাংসাকারী হতে পারত। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটিও স্পষ্ট নয়। একদিকে মুআত্তা-য় আছে, তিনি তাঁর অধীনস্থ এতিম শিশুদের অলঙ্কারের যাকাত আদায় করতেন না।' অন্যদিকে আবু দাউদ ও দারাকুতনীতে আছে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাতে চাঁদির অলঙ্কার ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলোর যাকাত দাও? তিনি বললেন, জি না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, আয়েশা, জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকো。
এ কথা সুস্পষ্ট যে, হযরত আয়েশা রাযি. এত বড় সাবধান-বাণী শোনার পরও অলঙ্কারের যাকাত আদায় করেননি—এমনটা হতেই পারে না। এমনকি, দারাকুতনীতে হযরত আয়েশা রাযি.-এরই বর্ণনা আছে, যেই অলঙ্কারের যাকাত আদায় করা হয় তাই কেবল ব্যবহার করা জায়েয। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, হযরত আয়েশা রাযি. অলঙ্কারের যাকাত আদায় করতে হবে এ মতই পোষণ করতেন।
মুয়াত্তায় যে হাদীসটি এসেছে—তিনি এতিম শিশুদের অলঙ্কারের যাকাত আদায় করতেন না—তার উত্তর হতে পারে, তিনি মনে করতেন, শিশুদের ওপর যাকাত ওয়াজিব হয় না; যেমনটি অনেক সাহাবা ও ফুকাহা মনে করেন। এই উত্তরটির ওপর আর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: যদি তিনি শিশুদের ওপর যাকাত ওয়াজিব হয় না মনে করতেন, তা হলে আপন ভাতিজিদের মালিকানাধীন সম্পত্তির যাকাত—যেমনটি মুআত্তায় এসেছে, আদায় করতেন কেন? এর উত্তর হলো, তিনি শিশুদের সম্পদে যাকাত আদায় করা ওয়াজিব মনে করতেন না; কিন্তু মুস্তাহাব মনে করতেন।
বিষয়টি আর একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, তিনি যেহেতু মূল অলঙ্কারটাই হেফাজতে রাখতেন, বিক্রি বা বদল করে ব্যবসায় খাটাতেন না; তাই এতে কোনো প্রবৃদ্ধি সাধিত হতো না। উপরন্তু, শিশুকন্যাদের অলঙ্কারের সবসময়ই প্রয়োজন আছে। এজন্য তাদের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তাদের অলঙ্কারের যাকাত আদায় না করাকেই ভালো মনে করেছেন। পক্ষান্তরে আপন ভাতিজিদের সম্পদ, যেমনটি মুয়াত্তায় এসেছে, যেহেতু তিনি ব্যবসায় খাটাতেন, তাই এক্ষেত্রে তাদের সম্পদের যাকাত আদায় করাকেই তাদের জন্য কল্যাণকর জ্ঞান করেছেন।

টিকাঃ
১. তিরমিযী এবং মুয়াত্তা মালেক : ا باب زكوة الحلى
২. দারাকুতনীর এই রেওয়ায়েতের একজন রাবী হলেন মুহাম্মাদ ইবনে আতা। ইমাম দারাকুতনী এই রেওয়ায়াতটি উল্লেখ করার পর লিখেছেন, মুহাম্মাদ ইবনে আতা মাজহুল রাবী। কিন্তু আবু দাউদ-এ স্পষ্টত আছে যে, ইনি মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে আতা। যিনি একজন মাশহুর রাবী। সুতরাং হাদীসবিশারদগণ মনে করেন, ইমাম দারাকুতনীর এই জারাহ বা সমালোচনা সহীহ নয়। ইমাম তিরমিযী বলেন, অলঙ্কারের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা পাওয়া যায় না। তার আরবী ভাষ্যটি হলো : ه لا يصح في هذا عن النبي صلى الله عليه وسلم شيء দারাকুতনীতে ফাতেমা বিনতে কায়স রাযি.-এর বর্ণনা আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অলঙ্কারে যাকাত আছে। আমর ইবনে শুআইবের সূত্রে ইবনে লাবিআহর রিওয়ায়েত আছে, দুজন স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন, তাদের হাতে সোনার চুরি ছিল, তিনি বললেন, তোমরা এগুলোর যাকাত দাও? তারা বললেন, জি না, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন, তোমরা কি আগুনের চুরি পরা পছন্দ করবে? তারা বললেন, জি না, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন, তা হলে এর যাকাত আদায় করো (তিরমিযী)। ইমাম তিরমিযী রহ. রেওয়ায়েতটিকে যঈফ বলেছেন। এর কাছাকাছি অর্থের আরও কয়েকটি রেওয়ায়েত আছে। মোটকথা, এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈগণের রেওয়ায়েত ও আকওয়াল ভিন্ন ভিন্ন। উভয় মতের দলিল-প্রমাণ উভয় পক্ষের কিতাবগুলোতে আছে। তবে অলঙ্কারের যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সবচে বড় দলিল এই যে, সোনা-রুপার কান্য বা যাকাত আদায় না করে সঞ্চিত করে রাখার ব্যাপারে কুরআনে হুমকি এসেছে .... والذين يكنزون الذهب والفضة অর্থ : আর যারা সোনা ও রুপা কান্য (সঞ্চিত) করে রাখে... [সূরা তাওবা: ৩৪] এবং সুনানে আবু দাউদ-এ উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি সোনার কিছু অলঙ্কার পরে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এও কি কান্য বলে গণ্য হবে? ইরশাদ করলেন, যদি যাকাত পরিমাণ হয়ে যায় এবং যাকাত আদায় করা হয় তা হলে কান্য বলে গণ্য হবে না। এই হাদীস থেকে কান্য-এর ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট হয়ে যায় এবং এও স্পষ্ট হয় যে, যদি কোনো অলঙ্কারের যাকাত আদায় না করা হয় চাই সেটা ব্যবহারের হোক বা না হোক-তা হলে তা কান্য-এর পর্যায়ভুক্ত হয়ে যাবে। যার ওপর কুরআনে কারীমে কঠোর হুমকি এসেছে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 নিহতের দিয়ত বা রক্তমূল্যে নারীর অংশ

📄 নিহতের দিয়ত বা রক্তমূল্যে নারীর অংশ


যদি কেউ কারও হাতে নিহত হয়, আর হত্যাকারী দিয়ত (রক্তমূল্য) আদায় করতে চায়, তা হলে এক-এক করে সকল উত্তরাধিকারীর সম্মতি গ্রহণ করতে হবে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, وَ إِنْ كَانَتِ امْرَأَةًঅর্থ: উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যদিও কোনো মেয়ে মানুষ থাকে'; অর্থাৎ যদি ওয়ারিশদের মধ্যে নারীও থাকে তা হলে তারও সম্মতি নিতে হবে; শুধু পুরুষের সম্মতি যথেষ্ট হবে না। কেননা, উত্তরাধিকার শুধু পুরুষেরই হয় না; বরং নারীরও হয়।

টিকাঃ
১. আবু দাউদ: كتاب الديات، باب عفو النساء

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 উত্তরাধিকারে নারীর অংশ

📄 উত্তরাধিকারে নারীর অংশ


ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবে মেয়েদের উত্তরাধিকার ছিল না। ইসলাম এসে তাদেরও উত্তরাধিকার প্রদান করে। উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত অধিকাংশ মাসআলাই কুরআন মাজীদে বিবৃত হয়েছে। নারীদের অংশও সবিস্তারে উঠে এসেছে। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার এমনও রয়ে গেছে, যেগুলোর সমাধানে কুরআন-হাদীসের আলোকে কিয়াস বা বিবেচনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে অন্যান্য মূলনীতির সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অধিকারের বিষয়টিও হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাথায় ছিল। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে : যদি মাইয়েতের কোনো ছেলে না থাকে, শুধু দুই বা ততোধিক মেয়ে, নাতী ও নাতনী থাকে; তা হলে ফারায়েযের বিধান কী হবে? হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.-এর বিবেচনায় নাতনীদের কোনো অংশ নেই; কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবেচনায় নাতনীদেরও অংশ সাব্যস্ত।'

টিকাঃ
২. মুসনাদে দারিমি: كتاب الفرائض

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00