📄 নারীদের দাবি ও আবেদন-উত্থাপন
সাহাবীয়াগণ তাদের আবেদন, অভিযোগ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌছাতেন পবিত্র স্ত্রীগণের সাহায্যে। উসমান ইবনে মাযউন রাযি. একজন বড় মাপের সাহাবী ছিলেন। তিনি সন্ন্যাস-জীবন যাপন করতে আরম্ভ করেন। একদিন তার স্ত্রী হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে আসেন। তাকে খুবই মলিন ও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। সাজগোছ তো দূর, সাধারণ পারিপাট্যও ছিল না। কারণ জিজ্ঞেস করলে আমতা-আমতা করতে করতে একসময় বলে ফেললেন, আমার স্বামী সারা দিন রোযা রাখে, সারা রাত নামায পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তাশরীফ আনলে কথা বলতে বলতে হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টা জানালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান ইবনে মাযউন রাযি.-এর কাছে গেলেন এবং বললেন-উসমান, আমাদের তো সন্ন্যাস ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, আমার জীবন তোমার জন্য আদর্শ নয়? আমিই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করি, আমিই তোমাদের মধ্যে তাঁর নির্দেশ পালনে সবচেয়ে যত্নশীল। অর্থাৎ এরপরও আমি স্ত্রী-সন্তানের হক আদায় করি。
হাওলা রাযি. একজন সাহাবীয়া ছিলেন। তিনি রাতভর ঘুমাতেন না। শুধু নামায পড়তে থাকতেন। ঘটনাক্রমে তিনি একবার সামনে দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাকে দেখে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ওই যে উনি হযরত হাওলা রাযি.। লোকে বলে, তিনি নাকি রাতভর একটুও ঘুমান না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়ের স্বরে বললেন, রাতভর ঘুমান না? এরপর বললেন, ওই পরিমাণ আমলই করো, যা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যায়।'
জনৈকা মহিলা চুরির অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সে তওবা করে ভালো হয়ে যায়। তারপরও নারীরা তাকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. তাকে এড়িয়ে চলতেন না। মহিলাটি তাঁর কাছে আসত এবং তাঁর সঙ্গে মেলামেশা করত। অনেক সময় তিনি মহিলাটির পক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দরখাস্ত ও সুপারিশ পেশ করতেন。
জনৈকা সাহাবীয়াকে তার স্বামী প্রহার করেছিলেন। প্রহারের কারণে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দাগ উঠে যায়। সাহাবীয়া সরাসরি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে চলে আসেন এবং নিজের দুরবস্থা তুলে ধরেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে তাশরীফ আনলেন, তখন হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন,
مَا رَأَيْتُ مِثْلَ مَا يُلْقِي الْمُؤْمِنَاتُ لِجِلْدِهَا أَشَدَّ خُضْرَةً مِّنْ ثَوْبِهَا
অর্থ: কোনো মুমিনা নারীকে এমন বিপদের সম্মুখীন হতে আমি আর দেখিনি। এই বেচারির গায়ের চামড়া তার গayer কাপড়ের চেয়েও সবুজ হয়ে গিয়েছে।
স্বামী যখন জানতে পারলেন যে, স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছে গিয়েছে, তখন তিনিও ছুটে এলেন। দুজন মুখোমুখি হওয়ার পর দেখা গেল ত্রুটি দুজনেরই। আপন সাহাবী-সাহাবীয়ার বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীমাংসা করলেন。
টিকাঃ
১. হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী রাযি.-কে বলেছিলেন, أنت منى بمنزلة هارون من موسى إلا أنه لا نبي بعدي অর্থ : মুসা আ.-এর কাছে হারুন আ.-এর যে অবস্থান, আমার কাছে তোমার সেই অবস্থান। কিন্তু আমার পরে কোনো নবী নেই (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১/৪৫/১২১)।
২. হাদীসে হযরত মারইয়াম আ.-এর কামাল বর্ণনা করার পর হযরত আয়েশা রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়েছে (সহীহ বুখারী: কিতাবু ফাযাইলি আসহাবিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৬।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৪।
২. সহীহ বুখারী: باب شهادة القاذف।
৩. সহীহ বুখারী: বাবুস সিয়াবিল খাযর।
📄 নারীকে তুচ্ছজ্ঞান করার প্রতিবাদ
নারীদের কেউ ছোট করে দেখলে উম্মুল মুমিনীন রাযি. তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হতেন। কোনো মাসআলায় যদি নারীদের প্রতি অবজ্ঞা-ভাব প্রকাশ পেত, তা হলে তার তল দেখে ছাড়তেন। দু-একজন সাহাবী মাসআলা দিতেন, যদি নামাযরত অবস্থায় নামাযীর সামনে দিয়ে কুকুর, গাধা বা নারী অতিক্রম করে তা হলে তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে। হযরত আয়েশা রাযি. মাসআলাটি শুনতে পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন, এবং বললেন—
إِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا دَابَّةُ سُوْءٍ بِئْسَ مَا عَدَلْتُمُوْنَا بِالْحِمَارِ وَ الْكَلْبِ
অর্থ: তা হলে নারীও একটা ইতর প্রাণী! এ কেমন ইনসাফ তোমাদের যে, আমরা কুকুর আর গাধার সমতুল্য হয়ে গেলাম? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়তেন, আর আমি তাঁর সামনে শুয়ে থাকতাম।' এটা তয়ালিসির বর্ণনা।' অন্য একটি বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, রাসূল যখন সেজদায় যেতে চাইতেন, আমার পায়ে দাবা দিতেন, আর আমি পা সরিয়ে নিতাম।' কোনো কোনো ফকীহ মনে করেন, নারীকে স্পর্শ করলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর বর্ণনাটি এসব ভুল বোঝাবুঝির নিরসন করে না কি?
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনটি কুলক্ষণ আছে তিনটি বস্তুতে ঘর, ঘোড়া, নারী। বর্ণনাটি শুনে হযরত আয়েশা রাযি. রেগে যান। তিনি বলেন— কসম ওই সত্তার, যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই এমন কথা বলেননি; তবে তিনি বলেছিলেন, ইহুদি ও জাহেলরা এই তিনটি বস্তু থেকে অশুভ পূর্বাভাস গ্রহণ করত।
টিকাঃ
১. মুসনাদে তয়ালিসি: ২০৫ পৃষ্ঠা (হায়দারাবাদের ছাপা)।
২. আবু দাউদ: বাবুল মারআতি লা ইয়াকতাউস সালাহ।
📄 মাসজালায় নারীদের সুবিধা-অসুবিধা বোঝা
কিছু কিছু মাসআলায় সাহাবা কেরামের মতভেদ ছিল। এসব মাসআলায় তিনি ওই দিকগুলোকেই প্রাধান্য দিতেন যেগুলোতে নারী জাতির জন্য সুবিধা হয়। কেননা তিনিই নারীর সুবিধা-অসুবিধা ভালো বুঝতেন। তাই বলে খেয়াল-খুশির আশ্রয় নিতেন না। বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকেই এগুলোর প্রমাণ পেশ করতেন। এ কারণেই দেখা যায়, এ ধরনের অধিকাংশ বিষয়েই ফকীহগণ তাঁর মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, এবং অধিকাংশ রাষ্ট্রে এ অনুযায়ীই ফতোয়া প্রদত্ত হয়।
📄 গোসলে খোঁপা-খোলা প্রসঙ্গ
হযরত ইবনে উমর রাযি. ফতোয়া দিতেন, নারীদের শরঈ পবিত্রতা অর্জনের জন্য খোঁপা খুলে গোসল করতে হবে। হযরত আয়েশা রাযি. এ কথা শুনে বললেন—সে এ ফতোয়াই দিয়ে দিত যে, নারীদের মাথার চুলমুল কেটে ফেলে দিতে হবে। আরে, আমি তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে গোসল করতাম, আমি শুধুমাত্র তিন বার পানি ঢালতাম;' একটি চুলও খুলতাম না।'
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: باب الغسل
২. সুনানে নাসাঈ : باب الغسل