📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 পুরুষদের প্রতি বিভিন্ন উপদেশ

📄 পুরুষদের প্রতি বিভিন্ন উপদেশ


মিশরি ও আজমিদের উসকানিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হযরত উসমান রাযি.-এর প্রতি এত ক্ষোভ জন্মে গিয়েছিল যে, কিছু লোক অভিশম্পাত করা শুরু করেছিল। তখন মুখারিক ইবনে শামামা বসরার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আপন ভগ্নিকে পাঠালেন উম্মুল মুমিনীনের খেদমতে। আবদার—সর্বময় গোলযোগের ব্যাপারে তাঁর মতটি কী তা যদি ব্যক্ত করতেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমার সন্তানদেরকে আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবে, অতঃপর বলবে, আমি আমার এই ঘরটিতেই এই দৃশ্য দেখেছি যে, জিবরীল আ. ওহী নিয়ে অবতরণ করতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনতেন, হযরত উসমান রাযি. সঙ্গে বসে থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাঁধের ওপর হাত রেখে বলতেন, এটা লেখো। আল্লাহ পাক এই সম্মান, এই মর্যাদা কোনো যেনতেন লোককে দিতে পারেন না। সুতরাং যারা উসমান রাযি.-এর ওপর অভিশাপ করছে, তাদের অভিশাপ তাদের ওপরই বর্তাবে।'
ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর বিখ্যাত মুসনাদ গ্রন্থে এই বর্ণনাটিই এনেছেন অন্য শব্দে : হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিলেন, যারা তাঁকে লানত করে, তাদের ওপরই আল্লাহর লানত। আমি দেখেছি, ওহী অবতীর্ণ হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে বসে থাকতেন। তিনি পরপর দুই-দুইটি মেয়েকে হযরত উসমান রাযি.-এর সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন। ওহী লেখার মতো মহাসম্মানটিও লাভ করেছিলেন তিনি। যদি কেউ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নিকট মনোনীত না হন, তা হলে কখনোই এত সম্মান, এত মর্যাদা, এত নৈকট্য লাভ করতে পারেন না।'
আবু সালামা রাযি. হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-এর পুত্র ছিলেন। একটি জমি নিয়ে কিছু মানুষের সঙ্গে তাঁর বিবাদ ছিল। হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টি জানতে পেরে আবু সালামাহকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে বোঝালেন-আবু সালামাহ, এই জমিটুকু নিয়ে আর বিবাদ কোরো না। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, এক বিঘত জমির জন্যও যদি কেউ জুলুম করে, তবে তার গলায় সাত-সাতটি শেকল ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।"
মদীনায় যখন কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করত, তখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে আনা হতো। তিনি দুআ করে দিতেন। একবার একটি শিশুকে আনা হলো। শিশুটির মাথার নিচে লোহার ক্ষুর জাতীয় একটি বস্তু ছিল। তিনি বললেন, এটা কী? মহিলারা বলল, এটা থাকলে ভুতেরা পালাবে। তিনি তখন ওই লোহাটি খুলে ফেলে দিলেন। এরপর বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছুকে অশুভ জ্ঞান করতে নিষেধ করেছেন। তোমরা এরকম করবে না।'
মুসলমান ও পারসিকদের মধ্যে মেলামেশা হযরত উমর রাযি.-এর যুগেই শুরু হয়। কিন্তু ফারুকে আযম রাযি.-এর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে অনারব জীবাণুগুলো আরবদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারেনি। হযরত উসমান রাযি.-এর যুগে আরবের আবহাওয়া অনারব সভ্যতায় বিষাক্ত হয়ে পড়ে। কবুতর ওড়ানো, দাবা খেলা, পাশা খেলা ইত্যাদি খেলাধুলা ও অনর্থক ক্রিয়াকলাপ ছড়াতে শুরু করে। সাহাবা কেরাম রাযি. যেহেতু জীবিত ছিলেন, সেহেতু এগুলো কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হতো। হযরত আয়েশা রাযি.-এর মালিকানাধীন একটি ঘরে এক ভাড়াটিয়া ছিল। তিনি জানতে পারলেন, লোকটি পাশা খেলায় অভ্যস্ত; তাই খুবই ক্রুদ্ধ হলেন এবং বলে পাঠালেন, যদি পাশার গুটি চিরতরে ঘর থেকে না বের করেছ, তা হলে তোমাকেই ঘর থেকে বের করে দেব。
তাবেঈ ইবনে আবি সাইব রহ. মদীনার একজন সুবিখ্যাত বক্তা ছিলেন। বক্তাগণ মজলিস গরম করার জন্য ছন্দোবদ্ধ দুআ-মুনাজাত প্রস্তুত করে রাখতেন। সমাজে নিজেদের দাম বাড়ানোর জন্য যেখানে- সেখানে যখন-তখন ওয়াজ করা শুরু করতেন। একদিন হযরত আয়েশা রাযি. ইবনে আবি সাইবকে ডেকে বললেন, তোমরা বক্তারা যদি আমাকে তিনটি প্রতিশ্রুতি না দাও, তা হলে তোমাদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা করব। ইবনে আবি সাইব বললেন, হে উম্মুল মুমিনীন, বলুন, প্রতিশ্রুতিগুলো কী কী? তিনি বললেন, দুআ-মুনাজাতে ছন্দোবদ্ধ বাক্য পরিহার করো। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা কেরাম এগুলো করতেন না। সপ্তাহে মাত্র একদিন, যদি মানতে না পার তবে দুই দিন, খুব বেশি হলে তিন দিন ওয়াজ করবে। মানুষকে আল্লাহর কিতাবের প্রতি অনীহা প্রকাশে বাধ্য করবে না। কখনোই এমন কোরো না যে, যত্র-তত্র মানুষের ভিড়ে ঢুকে পড়লে আর ওয়াজ করা শুরু করলে। মানুষ যদি আবদার করে তবেই করো।'
ইসলামের বিধান হলো, তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতের দিনগুলোতে স্বামীর ঘরেই অবস্থান করবে। এই বিধানটির বিপরীতে শুধুমাত্র ফাতেমা বিনতে কায়স নাম্নী জনৈকা সাহাবীয়া সাক্ষ্য দিতেন। তিনি বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তালাকের পরই স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি এই ঘটনাটিকে ইদ্দতের স্থান পরিবর্তনের বৈধতার ওপর প্রমাণ হিসেবে পেশ করতেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর জীবদ্দশায়ই ফাতেমার দেওয়া বিবৃতির ভিত্তিতে জনৈক সম্ভ্রান্ত পিতা সদ্য তালাকপ্রাপ্তা মেয়েকে স্বামীর ঘর থেকে বের করে নিয়ে চলে আসেন। হযরত আয়েশা রাযি. এতে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং কঠোর আপত্তি জানালেন। কেননা এতে ইসলামের একটি সুবিদিত বিধানের প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শিত হয়। ওই সময় মদীনার গভর্নর ছিলেন মারওয়ান। তিনি মারওয়ানকে সংবাদ পাঠালেন, তুমি প্রশাসনিকভাবে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করো। তিনি মাসআলাটির বিষয়েও স্পষ্ট বলে দিলেন, ফাতেমার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবার ওপর বিধান আরোপ করা যাবে না। কেননা ফাতেমার স্বামীর বাড়ি ছিল আশঙ্কাজনক জায়গায়। রাতে জন্তু জানোয়ারের হানা দেওয়ার ভয় ছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষভাবে এই অনুমতি দিয়েছিলেন।'
অনারব দেশগুলো বিজিত হওয়ার পর তাদের প্রভাবে আরবরাও বিভিন্ন রকম নেশা জাতীয় পানীয়ে মজে গিয়েছিল। এগুলোর ভিন্ন-ভিন্ন নামই মূলত আত্মপ্রতারণার সুযোগ করে দিয়েছিল। এ জাতীয় পানীয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল 'বাযিক'। আমাদের পরিচিত শব্দে মদ বা এরকমই কিছু বলা চলে। আরবী ভাষায় এসব নিষিদ্ধ পানীয়কে বলা হতো 'খমর'। নামের গরমিলে অনেকের সন্দেহ হলো। এগুলোও কি খমরের মতো হারাম হবে কি না। হযরত আয়েশা রাযি. মজলিসের মধ্যে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দিলেন, এসব পানীয়ে শুকনো খেজুরও ভেজানো নিষেধ। এরপর তিনি বিশেষ কিছু নারীকে বললেন, যদি তোমাদের ঘরের সাধারণ পাত্রের পানিতেও নেশার বস্তুর মিশ্রণ ঘটে তা হলেও তা হারাম। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোনো নেশাজাতীয় বস্তুকেই নিষিদ্ধ করেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের তুলনায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরস-মজলিসগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল বেশি। নারীসংক্রান্ত সাধারণ মাসায়েল আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে স্বামীদের উদ্দেশ্যেও বিভিন্ন হেদায়েত ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে দিতেন। একবার বসরার কিছু মহিলা তাঁর খেদমতে হাজির হলে কথাপ্রসঙ্গে বললেন, আমি পুরুষদের সরাসরি সমালোচনা করতে লজ্জাবোধ করি, তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে বলে দেবে, তারা যেন পবিত্র হতে পানি ব্যবহার করে। আসলে এটাই সুন্নাত。

টিকাঃ
১. আল আদাবুল মুফরাদ : باب نقص شيء من الاسم
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬, ২৫০।
১. সহীহ বুখারী : باب إثم من ظلم شيئا من الأرض
২. আল আদাবুল মুফরাদ : باب الطيرة من الجن
৩. আল আদাবুল মুফরাদ : باب الأدب وإخراج أهل الباطل
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৭।
১. সহীহ বুখারী: বাবু কিসসাতি ফাতিমাহ বিনতি কায়স।
২. সুনানে নাসাঈ: কিতাবুল খমর।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৩, ৯৪।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 নারীদের সংশোধন

📄 নারীদের সংশোধন


একবার কুফার কয়েকজন মহিলা হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোথেকে এসেছ? তারা আরজ করলেন, কুফা থেকে। কুফার নাম শোনামাত্রই তাঁর চোখে মুখে বিষাদ অনুভব করা গেল। এরপর তাদের মধ্য থেকে একজন একটি মাসআলা পেশ করলেন। মাসআলার ঘটনায় জড়িত মূল ব্যক্তিটি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি.। তিনি বললেন, তোমরা দুজনই ভারি অন্যায় করেছ। যায়েদ রাযি.-কে বলে দিয়ো, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে জিহাদে থেকে যেই সওয়াব অর্জন করেছিলেন, যদি তওবা না করেন, তা হলে সবই বরবাদ হয়ে যাবে।'
একবার সিরিয়ার কিছু মহিলা উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সিরিয়া এলাকার কিছু মহিলা বাইরে গোসল করতে যেত এবং বিবস্ত্র হয়ে গোসল করত। উম্মুল মুমিনীন রাযি. আগন্তুক মহিলাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা সিরিয়ার মেয়েরাই তো বাইরে গোসল করতে যাও, তাই না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মেয়ে বেপর্দা হয় সে তার ও আল্লাহর মধ্যকার সম্পর্ককে ছিন্ন করে ফেলে।'
হজের মওসুমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবস্থান-ক্ষেত্রটি লাখো মুসলমানের হৃদয়ের অবস্থান-ক্ষেত্র হয়ে থাকত। মুসলিম নারীগণ দিদিগন্ত থেকে উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর অবস্থানকে কেন্দ্র করে এসে জমায়েত হতেন। হজ-কাফেলার নেত্রী হয়ে তিনি চলতেন সামনে সামনে, আর সমবেত মুসলিম নারীগণ চলতেন পেছনে পেছনে। এভাবে পথ চলতে চলতেও ইরশাদ ও হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করতে ভুলতেন না। একবার এক মহিলার কাপড়ে ক্রুশের নকশা দেখে একটু বকলেন, এরপর বললেন, এই কাপড় পরিত্যাগ করো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এমন কাপড় দেখতেন তা হলে খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হতেন।'
যেসব অলঙ্কারে শব্দ হয়, সেসব অলঙ্কার নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। এমনকি, ঘণ্টার শব্দও নিষিদ্ধ। একবার একটি মেয়ে নূপুর পরে উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর খেদমতে এল। তিনি বললেন, মা, এটা পরে আর কখনো আমার কাছে এসো না। এর শব্দ করা অংশগুলো কেটে ফেলো। জনৈকা মহিলা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে বা সফরে ঘণ্টা বাজে বা অলঙ্কারের শব্দ হয়, তাতে রহমতের ফেরেশতা আসে না।'
হাফসা বিনতে আবদুর রহমান তাঁর ভাতিজি ছিলেন। তিনি একদিন খুবই পাতলা ওড়না পরে ফুফির কাছে এলেন। উম্মুল মুমিনীন ক্রুদ্ধ হয়ে ওড়নাটা ছিঁড়ে ফেললেন। বললেন, তুমি জানো না, সূরা নূরের মধ্যে আল্লাহ কী বলেছেন? এরপর তিনি ভাতিজিকে অন্য একটি মোটা কাপড়ের ওড়নার ব্যবস্থা করে দিলেন।'

টিকাঃ
১. সুনানে বাইহাকী: কিতাবুল বুয়ু。
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৩。
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৫। মুয়াত্তা, বাবুল ইফতা, কিতাবুল হজ-এর আলোচনাও দ্রষ্টব্য。
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৫, ২৪০。
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪২。
২. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক: কিতাবুল লিবাস。

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সাধারণ উপদেশ

📄 সাধারণ উপদেশ


হযরত আয়েশা রাযি. একটি মুকাতাব গোলাম আজাদ করলেন। বিদায় বেলায় বললেন-যাও, আল্লাহর পথে জিহাদ করতে থাকো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলমানের শরীরে আল্লাহর পথের ধুলা-বালি লাগে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারে না।'
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাযি. তাঁর কাছে এলেন। তিনি খুবই সাধারণভাবে তাড়াহুড়া করে ওযু করে চলে যেতে লাগলেন। হযরত আয়েশা রাযি. ডাক দিয়ে বললেন, ভ্রাতা আবদুর রহমান, ভালো করে ওযু করে নাও। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ওযুর যে অঙ্গটি শুকনো থাকে তা জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে।'
তিনি একবার এক বাড়িতে মেহমান হলেন। বাড়িটিতে উঠতি বয়সী দুটো মেয়ে ছিল। তারা কোনো বড় কাপড় বা চাদর শরীরে না জড়িয়ে নামায পড়ছিল। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আর কেউ যেন বড় কাপড় বা চাদর ছাড়া নামায না পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটিই নির্দেশ দিয়েছিলেন।'
ইহুদিদের একটি প্রথা ছিল, যদি কোনো মেয়ের চুল ছোট হতো, তা হলে কৃত্রিম চুল লাগিয়ে সৌন্দর্যের ঘাটতি দূর করতে চাইত। ইহুদিদের দেখাদেখি আরব নারীদের মধ্যেও এর রেওয়াজ শুরু হয়। একবার এক মহিলা এসে জিজ্ঞেস করল, আমার মেয়ের বিয়ে হতে যাচ্ছে। অসুস্থতার কারণে ওর চুলগুলো ঝরে গিয়েছিল। হে উম্মুল মুমিনীন, কৃত্রিম চুল লাগানো যাবে কি? তিনি বললেন, যারা কৃত্রিম চুল লাগিয়ে নেয়, আর যারা কৃত্রিম চুল লাগিয়ে দেয় উভয়কেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশম্পাত করেছেন।'
মানুষ মনে করে, কুরআন মাজীদ যত দ্রুত পড়া যাবে সওয়াবও তত দ্রুত হতে থাকবে। এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, হে উম্মুল মুমিনীন, কিছু লোক এক রাতে দুই খতম, তিন খতম করে কুরআন পড়ে ফেলেন। তিনি বললেন, ওদের পড়া আর না পড়া সমান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তিনি সূরা বাকারা, সূরা আ-লি ইমরান, সূরা নিসাই অতিক্রম করতে পারতেন না (মাত্র তিনটি সূরা পড়তে পড়তেই রাত শেষ হয়ে যেত)। যখন সুসংবাদের আয়াত আসত তখন প্রার্থনা করতেন, আর যখন সাবধানবাণী আসত তখন পানাহ চাইতেন।'
হযরত উসায়েদ ইবনে হুযায়ের রাযি. অত্যন্ত বড় মাপের সাহাবী ছিলেন। হজের কাফেলার সঙ্গে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করছিলেন। মদীনার কাছাকাছি এসে সংবাদ পেলেন, তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। দীর্ঘদিনের সফর শেষে ঘরে ফিরছেন, এমন সময় প্রিয়তমা স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদ তাঁকে মুহ্যমান করল। তিনি মুখে কাপড় চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। হৃদয়ের আবেগকে কে-ইবা অস্বীকার করতে পারে? কিন্তু তারপরও, এভাবে সাহাবা-কাফেলার ভরা মজলিসে—মুখ চেপে ধরে—অন্তত একজন সাহাবীর কেঁদে ফেলা সম্পূর্ণ শোভন মনে হয়নি। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি হযরত উসায়েদ রাযি.- কে সম্বোধন করে বললেন, ‘আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন সাহাবী; ইসলামে অগ্রবর্তিতার সম্মানপ্রাপ্ত হয়েছেন; অথচ স্ত্রীর মৃত্যুশোক আপনাকে এমন মুহ্যমান করে ফেলছে?’
কাবা শরীফে প্রতি বছর নতুন গিলাফ চড়ানো হয় এবং পুরনোটি নামিয়ে ফেলা হয়। হযরত আয়েশা রাযি.-এর যামানায় যিনি কাবা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন, তিনি পুরাতন গিলাফটি মাটিতে দাফন করে দিতেন। তার অনুভূতি ছিল, পবিত্র গিলাফ অপবিত্র মানুষের সংস্পর্শে রাখব না। শাইবা ইবনে উসমান ছিলেন কাবার চাবি-রক্ষক। তিনি বলেন, আমরা গভীর গর্ত খনন করতাম, তারপর পুরনো গিলাফের সবগুলো কাপড় সেখানে দাফন করতাম। কেননা আমরা মনে করতাম, মানুষের সংস্পর্শে থাকলে এগুলোর অসম্মান হবে। অনেকে এগুলো পরিধান করা শুরু করবে। হতে পারে কেউ নাপাক অবস্থায়ও পরোয়া করবে না। কিন্তু যিনি শরীয়ত সম্পর্কে সম্মক অবগত ছিলেন, তিনি ধরে ফেললেন—এই সম্মানপ্রদর্শন অবশ্যই শরীয়তসম্মত নয়। তিনি উপলব্ধি করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এ ধরনের নির্দেশ দেননি। খুব সম্ভব, আজকের এই অতি অনুভূতি অদূর ভবিষ্যতে কোনো ভ্রান্ত বিশ্বাসের আবর্ত সৃষ্টি করবে, যাতে সরলপ্রাণ মুসলমানেরা ফেঁসে যাবে। উম্মুল মুমিনীন শাইবাকে ডেকে পাঠালেন, বললেন, এটা ঠিক নয়, তোমরা যা করছ ভালো করছ না। গিলাফটি যখন কাবা শরীফ থেকে নামানো হয়ে গেছে, তখন যদি কেউ তা নাপাক অবস্থায় পরিধান করেও, তবু ক্ষতি নেই। তোমরা বরং একে বেচে ফ্যালো এবং এর পয়সা দিয়ে গরিব- দুঃখীদের সহায়তা করো।' যতদূর ধারণা করা হয়, এর পর থেকেই কাবা শরীফের পুরনো গিলাফ সাধারণ مسلمانوں হাতে আসে এবং আগ্রহী মানুষেরা বরকত-স্বরূপ কিনে নিয়ে কাছে রাখে। এই অনুগ্রহটির জন্যও সকল মুসলমানকে উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
একবার এক ব্যক্তি (ধারণা করা হয়, হযরত আবু হুরায়রা রাযি. হবেন) মসজিদে নববীতে এলেন এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরার কাছে বসে পড়লেন। এরপর শুনিয়ে শুনিয়ে খুব দ্রুত ও উচ্চস্বরে হাদীস বলতে লাগলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তখন নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ হতে না হতেই লোকটি গায়েব হয়ে গেলেন। এমন সময় উরওয়াহ এলেন উম্মুল মুমিনীনের খেদমতে। তিনি বললেন, কি আশ্চর্য, অমুক আমার ঘরের পাশে বসে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে দ্রুত হাদীস বলতে লাগল। আমি নামাযে ছিলাম। নামায শেষ হতে না হতেই সে গায়েব। থাকলে বলতাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার মতো এত দ্রুত কথা বলতেন না।' হযরত আয়েশা রাযি.-এর কথার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি হাদীসচর্চা করবে তার কথা ও কাজে সঙ্গতি থাকতে হবে। নয়তো নিছক হাদীস বলায় উপকার নেই।
হজের মওসুমে তিনি একটি তাঁবুতে ছিলেন। মানুষেরা তাঁর সাক্ষাতের জন্য আসছিল। কয়েকটি কুরাইশি যুবক হাসতে হাসতে এল। তিনি হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তারা বলল, মাতা, আপনার তাঁবুর দিকে আসতে লেগে অমুক এমনভাবে পড়ে গিয়েছিল যে, হয়তো চোখ যেত, নয়তো ঘাড় ভাঙত। তিনি বললেন, হেসো না। সাধারণ কোনো কাঁটা-ফাটা বা এর চেয়েও কোনো ছোট বিপদ যদি মুমিনকে আক্রান্ত করে তাতেও তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং গোনাহ মাফ হয়।'

টিকাঃ
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৮৫।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৬।
২. মুসনাদে আহমাদ ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১১। হাদীসটি আরও অনেক কিতাবে এসেছে। সনদও সহীহ। অনেক দিন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা এবং এত কঠোরতা আরোপ ও অভিশম্পাতের কারণ আমার বুঝে আসেনি। ঘটনাক্রমে একটি প্রবন্ধে ইউরোপের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানার সুযোগ হলো। একটা অদ্ভুত তথ্য পেলাম ইউরোপে যে মেয়েদের চুল সুন্দর হয় তারা মারা গেলে প্রসাধনী কোম্পানিগুলো নাকি তাদের চুল কিনে প্রক্রিয়াকরণ করে, এরপর বাজারে বিক্রি করে। মেয়েরা নিজেদের চুলের শ্রীবৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম চুল হিসেবে সেগুলো কিনে নেয় এবং ব্যবহার করে। আমার মনে হয়, যেহেতু এটা যৎপরনাস্তি ঘৃণ্য ও মানবতাবিরোধী কাজ, সেহেতু হাদীসে এই শান্তি ও অভিশম্পাতের কথা এসেছে। আরব ইহুদিদের মধ্যেও হয়তো এই প্রথাই ছিল। কারণ এরা খুবই অর্থলোভী ও স্বার্থপর ছিল। এরা যে এটা করত না, সেটা ভাবার তুলনায় এরা যে এটা করত, সেটা ভাবাই বেশি সঙ্গত। তা ছাড়া, কোনো নারী বেঁচে থাকতে কী করে নিজের চুল বিক্রি করে নিজের শ্রীহানি ঘটিয়ে অন্যের শ্রীবৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে পারে?
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫২।
১. আইনুল ইসাবা, সুয়ূতি রহ. (বাইহাকীর উদ্ধৃতি)।
২. সহীহ বুখারী: সিফাতুন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
৩. সহীহ মুসলিম: باب ثواب المؤمن فيما يصيب

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00