📄 মতভেদে সিদ্ধান্ত দেওয়ার গ্রহণযোগ্যতা
যেসব মাসআলায় সাহাবা কেরামেরও মতভেদ ছিল, সেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফায়সালার জন্যও অনেকে আসতেন তাঁরই কাছে। একবার হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব এলেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরবারে; বললেন, একটি বিষয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ মতভেদ করছেন, আমিও দ্বিধাগ্রস্ত; এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর মতটি প্রকাশ করলেন। হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর দ্বিধা দূর হলো। তিনি বললেন, আজকের পর থেকে এই মাসআলাটি আর কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করব না।' হযরত আবু দারদা রাযি. ফতোয়া দিতেন, যদি ঘটনাক্রমে কারও বিতর নামায পড়া না হয়, আর সকাল হয়ে যায়, তা হলে বিতর পড়া যাবে না। লোকেরা হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল হয়ে গেলেও বিতর পড়ে নিতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. এবং হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি. দুজনেই বিজ্ঞ আলেম ও ফকীহ ছিলেন। তাদের মধ্যে ইফতারের বিষয়ে ইখতিলাফ হলো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, ইফতার করে অবিলম্বে মাগরিব পড়ে নিতে হবে। কিন্তু আবু মুসা আশআরি রাযি. বললেন— না, ইফতার করে একটু বিশ্রাম করতে হবে; এরপর মাগরিব পড়তে হবে। লোকেরা সুরাহার জন্য গেল হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে। তিনি বললেন, অবিলম্বে মাগরিব পড়ার কথা যে বলেছে, সেই ঠিক বলছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র অভ্যাসও এটাই ছিল。
যদি কেউ হজ করতে না যায়, কিন্তু কোরবানির জন্তু মক্কায় পাঠিয়ে দেয়, তা হলে লোকটির হুকুম কী হবে? হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. ফতোয়া দিতেন, সে হাজি সাহেবের মতোই হবে, অর্থাৎ হজের অবস্থায় তার ওপর যেসব বিধান আরোপিত হতো, এখনো সেগুলো আরোপিত হবে; কোরবানি হওয়া পর্যন্ত তাকে মুহরিমের মতো থাকতে হবে। যিয়াদ ইবনে আবিহি আমীর মুআবিয়া রাযি.-এর পক্ষ থেকে তখন হেজাজের গভর্নর ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে ফতোয়া চেয়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে দূত পাঠালেন। তিনি জবাব দিলেন, ইবনে আব্বাস রাযি.-এর ফতোয়া ঠিক নয়। কেননা, আমি নিজ হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোরবানিকে কিলাদাহ পড়িয়েছি, আমার পিতা স্বয়ং সেগুলো মক্কায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল কোনো কিছু থেকেই বিরত থাকেননি।'
বাইহাকী শরীফে আছে, ইমাম যুহরী রহ. বলেছেন, এই মাসআলায় সর্বপ্রথম উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-ই সত্যিকার বাস্তবতাটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। মানুষ যখন এই ফতোয়াটি জানতে পারেন, তখন থেকে এর ওপরই আমল শুরু করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি.-এর ফতোয়াটির আমল সেদিন থেকেই বাতিল হয়ে যায়।'
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. ফতোয়া দিতেন, রমযানে যদি সকাল হয়ে যায় এমতাবস্থায় যে কারও ওপর গোসল ফরজ হয়েছে, তা হলে তার সেদিনের রোযাটি হবে না। এক ব্যক্তি প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে এবং পরে হযরত উম্মে সালামা রাযি.-এর কাছে গিয়ে ফতোয়া চাইল। তাঁরা উভয়েই বললেন, কথাটি ঠিক নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল এমন ছিল না। ওই সময় মদীনার প্রশাসক ছিলেন মারওয়ান। তিনি লোকটিকে পুনরায় হযরত আবু হুরায়রা রাযি.- এর কাছে পাঠালেন। লোকটি গিয়ে উম্মুল মুমিনীনের ফতোয়াটি শোনালে তিনি আপন ফতোয়া প্রত্যাহার করে নেন。
ইহরাম অবস্থায় মোজা পরা ঠিক নয়। কিন্তু যদি কারও শুধু মোজা থাকে, জুতা না থাকে, তা হলে সে মোজার উপরের অংশ কেটে ফেলবে এবং সেটা দিয়েই জুতা বানাবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. ফতোয়া দিতেন, নারীরাও মোজা কেটে জুতা বানাবে। একবার জনৈকা তাবেঈয়া তাঁকে বললেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর ফতোয়া তো এমন নয়। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ফতোয়া শুনে ইবনে উমর রাযি. আপন ফতোয়া প্রত্যাহার করলেন।'
কোনো এক মজলিসে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. দুজনই উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ একটি মাসআলা উঠল: যদি কোনো মহিলা বিধবাও হয়, আবার গর্ভবতীও হয় তা হলে তার ইদ্দতকাল কোনটি হবে? কুরআন মাজীদে বিধবা ও গর্ভবতী দুজনের আলাদা আলাদা ইদ্দতকাল বর্ণিত হয়েছে। বিধবার ইদ্দতকাল হলো চার মাস দশ দিন, আর গর্ভবতীর ইদ্দতকাল হলো গর্ভপাত পর্যন্ত। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, দুই ইদ্দতের মধ্যে যেটির সময়কাল বেশি হবে, সেটিই পালন করবে। পক্ষান্তরে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বললেন, গর্ভপাত পর্যন্তই তার ইদ্দতকাল ধরা হবে। তাদের মধ্যে মতৈক্য না পাওয়ায় লোকেরা হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত উম্মে সালামা রাযি.-এর কাছে গেল। তারা বললেন, গর্ভপাত পর্যন্তই তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। তাঁরা হযরত সুবাইতার ঘটনাটি প্রমাণ হিসেবে পেশ করলেন। হযরত সুবাইতা যেদিন বিধবা হয়েছিলেন, তার তিন দিন পরই সন্তান প্রসব করেন; আর সেদিনই নতুন বিবাহের অনুমতিপ্রাপ্ত হন। উম্মুল মুমিনীনের ফতোয়াটি এত অকাট্য ছিল যে, আজ পর্যন্ত এর ওপরই আমল হয়ে আসছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এবং আবু হুরায়রা রাযি.-এর মধ্যে একটি মাসআলায় মতভেদ হলো। জানাযার পেছনে চলায় কোনো সওয়াব আছে কি নেই? প্রথমজন ফতোয়া দিলেন, সওয়াব আছে। দ্বিতীয়জন ফতোয়া দিলেন, সওয়াব নেই। মীমাংসা চাওয়া হলো হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে। তিনি হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর সমর্থন করলেন。
টিকাঃ
১. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : باب الغسل
২. মুসনাদে আহমাদ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৪২।
৩. মুসনাদে আহমাদ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪৮। সুনানে নাসাঈ : বাবুস সাজদাহ।
১. সহীহ মুসলিম ও বুখারী: কিতাবুল হজ।
২. আইনুল ইসাবা, সুয়ূতি রহ. (সুনানে বাইহাকীর উদ্ধৃতি)।
৩. সহীহ মুসলিম: কিতাবুস সিয়াম।
১. আইনুল ইসাবা, সুয়ূতি (শাফেঈ, বাইহাকী, আবু দাউদ ও ইবনে খুযাইমার উদ্ধৃতিতে)।
২. তয়ালিসি ও মুসনাদে আয়েশা রাযি. ও উম্মে সালামা রাযি.।
৩. সহীহ বুখারী: কিতাবুল জানাইয。