📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ফতোয়াপ্রদানে তাঁর অবস্থান

📄 ফতোয়াপ্রদানে তাঁর অবস্থান


পূর্বের অধ্যায়গুলোতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের এবং ভূমিকা ও অবদানের যত প্রমাণ ও নিদর্শন গিয়েছে, তা থেকেই অনুমান করা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরোধানের পর জীবনের বাকি চল্লিশটি বছর তিনি এমনভাবে অতিবাহিত করেছিলেন যে, তিনি ছিলেন সর্বসাধারণের জিজ্ঞাসার মূল কেন্দ্র এবং প্রায় সর্বজনের অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আনন্দের বিষয়, সৌভাগ্যবশত আমাদের কাছে, এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করার মতো যথেষ্ট লিখিত প্রমাণাদিও রয়েছে। খোলাফায়ে ইসলাম, উলামায়ে সাহাবা এবং সাধারণ মুসলমানগণ যে কোনো সঙ্কটে ও সমস্যায় এবং যে কোনো নতুন নতুন জিজ্ঞাসায় মসজিদে নববীর ছোট্ট কিন্তু মহৎ প্রাঙ্গনেরই শরণাপন্ন হতেন。
হাদীস-বিশারদগণ ফতোয়ার আধিক্য ও স্বল্পতার ভিত্তিতে উলামায়ে সাহাবাকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। যাদের ফতোয়াসমগ্রকে স্বতন্ত্র ও আলাদা করে সাজালে একটি বৃহৎ সংকলনের রূপ পরিগ্রহ করে, তারা আছেন প্রথম স্তরে। দ্বিতীয় স্তরে আছেন যাদের এক-একটি ফতোয়া এক একটি নিবন্ধের সমান। তৃতীয় স্তরে আছেন যাদের সমগ্র ফতোয়াকে একত্রিত করলে একটি নিবন্ধের সমান হয়।
হযরত উমর রাযি., হযরত আলী রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি., হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এবং সবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রী, সিদ্দীকে আকবর রাযি.-এর নয়নমণি হযরত আয়েশা রাযি. আছেন প্রথম স্তরে। তাঁদের ফতোয়া হাদীসগ্রন্থগুলোতে এত বেশি পরিমাণে এসেছে যে, এগুলোকে একত্রিত করলে একটি আলাদা দফতর ও বৃহৎ সংকলন প্রস্তুত হবে।'

টিকাঃ
১. আলামুল মুকিঈন ইবনে কাইয়ুম (মুকাদ্দিমা)।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 খেলাফায়ে ইসলামের ফতোয়া চাওয়া

📄 খেলাফায়ে ইসলামের ফতোয়া চাওয়া


হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরই আপন পিতার জীবদ্দশায় সর্বসাধারণের জিজ্ঞাসার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হন। ধর্মীয় ফতোয়া প্রদানের পদমর্যাদাও অর্জিত হয়েছিল তাঁর। জীবনের শেষ পর্যন্ত অপরাপর খলীফা ও শাসক-প্রশাসকের সময়ও সদাসর্বদা এ মর্যাদায় বিশিষ্ট ছিলেন তিনি। হযরত কাসেম রহ., যিনি সাহাবীগণের পর মদীনার বিশিষ্ট ফকীহ-সপ্তকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন, বলেন-
كَانَتْ عَائِشَةُ قَدِ اسْتَقَلَّتْ بِالْفَتْوَى فِي خِلَافَةِ أَبِي بَكْرٍ وَ عُمَرَ وَ عُثْمَانَ وَهَلُمَّ جَرًّا إِلَى أَنْ مَّاتَتْ رَحِمَهَا اللَّهُ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি. হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর সময়ই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে ফতোয়া প্রদানের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। হযরত উমর রাযি. ও হযরত উসমান রাযি.-এর পরও শেষ জীবন পর্যন্ত ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।'
হযরত উমর রাযি. নিজেও একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মুজতাহিদ ছিলেন। তিনিও এই মেশকাতুন নবীর প্রতি ছিলেন মুখাপেক্ষী।
كَانَتْ عَائِشَةُ تُفْتِي فِي عَهْدِ عُمَرَ وَ عُثْمَانَ بَعْدَهُ يُرْسِلَانِ إِلَيْهَا فَيَسْأَلَا بِهَا عَنِ السُّنَنِ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি. হযরত উমর ও উসমান রাযি.-এর জামানায়ও ফতোয়া প্রদান করতেন। হযরত উমর ও হযরত উসমান রাযি. তাঁর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে হাদীস জানার জন্য লোক পাঠাতেন।'
হযরত উমর রাযি.-এর শাসনামলে নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া আর কারও ফতোয়াপ্রদানের অনুমতি ছিল না। সুতরাং বোঝা যায়, হযরত উমর রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর জ্ঞান ও যোগ্যতার প্রতি কতখানি আশ্বস্ত ছিলেন।
আমীর মুআবিয়া রাযি. দামেশক থেকে খেলাফত পরিচালনা করতেন। কিন্তু প্রয়োজন হলে সিরিয়া থেকে দূত এসে বাবে আয়েশা রাযি.-এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অনুমতি পেলে মহান শাসকের পক্ষ থেকে মাসআলা জানতে চাইতেন', বিভিন্ন বিষয়ে আজ্ঞা ও উপদেশ আবদার করতেন।°

টিকাঃ
২. ইবনে সাদ: ২/২/১২৬।
১. ইবনে সাদ : ২/২/১২৬।
২. মুসনাদে আহমাদ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৮৭।
৩. জামে তিরমিযী : باب ما جاء في حفظ اللسان ا

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আকাবিরে সাহাবার ফতোয়া চাওয়া

📄 আকাবিরে সাহাবার ফতোয়া চাওয়া


পবিত্র মদীনা ছিল আকাবিরে সাহাবার মূল কেন্দ্র। হযরত আবু বকর রাযি. ও হযরত উমর রাযি.-এর খেলাফত পর্যন্ত হযরত আলী রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি., হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি., হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাযি., হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি., হযরত উবাই ইবনে কাব রাযি., হযরত আবু দারদা রাযি., হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রাযি. প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ইসলামী জাহানে ইলম ও ফতোয়ার স্তম্ভ ছিলেন। হযরত উসমান রাযি.-এর শাসনামলে তাঁদের অধিকাংশই ওফাতপ্রাপ্ত হন। তাঁদের পর আসে সাহাবা কেরামের নতুন প্রজন্মের পালা। তাঁদের শিরোমণি ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি., আবু সাঈদ খুদরী রাযি., জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি., আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি., আবু হুরায়রা রাযি.। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স যদিও কম ছিল; তথাপি, যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে, তিনি প্রথম যুগ থেকে আকাবিরে সাহাবার জীবদ্দশায়ই ফতোয়ার আসনে সমাসীন ছিলেন। বড় বড় সাহাবা কেরাম কঠিন ও জটিল বিষয়গুলোতে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। জামে তিরমিযীতে আছে:
مَا أَشْكَلَ عَلَيْنَا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَدِيْثٌ قَطُّ فَسَأَلْنَا عَائِشَةُ إِلَّا وَجَدْنَا عِنْدَهَا عِلْمًا
অর্থ: আসহাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো হাদীস বুঝতে অসুবিধা বোধ করেছেন, হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করে এ সম্পর্কে কোনো না কোনো ধারণা অবশ্যই পেয়েছেন।
ইবনে সাদ গ্রন্থে আছে:
يَسْأَلُهَا الْأَكَابِرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থ: বড় বড় সাহাবা কেরাম রাযি. তাঁর কাছে এসে মাসআলা জানতে চাইতেন।'
তাবেঈ মাসরুক কসম খেয়ে বলতেন,
لَقَدْ رَأَيْتُ مَشِيْخَةَ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُوْنَهَا عَنِ الْفَرَائِضِ
অর্থ: আমি প্রবীণ সাহাবা কেরামকেও তাঁর কাছে ফারায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে দেখেছি।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-সহ অনেক সাহাবী, যাঁরা হাদীস, ফিকহ ও ইজতিহাদে তাঁর সমপর্যায়ের ছিলেন, তাঁরাও অনেকসময় অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে নিতেন। হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি. উলামায়ে আসহাবের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; তবু হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরসে নববী থেকে অমুখাপেক্ষী ছিলেন না。

টিকাঃ
১. ইবনে সাদ ও হাকেম।
২. সহীহ বুখারী: আল-বিত্র, আল-জানাইয। নাসাঈ : ا باب لبس الحرير
৩. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : ا باب الغল

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সমস্ত ইসলামী জাহান থেকে ফতোয়া চাওয়া

📄 সমস্ত ইসলামী জাহান থেকে ফতোয়া চাওয়া


মদীনা সমগ্র ইসলামী জাহানের প্রাণকেন্দ্র ছিল। মানুষ যিয়ারত ও বরকতের উদ্দেশ্যে যে কোনো স্থান থেকে এখানে আসত। তারা মদীনায় এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনসঙ্গিনীর খেদমতে অবশ্যই হাজির হতো। দূরদূরান্ত থেকে যে মানুষগুলো আসত, তারা অনেকে সাধারণ শিষ্টাচার ও সৌজন্য সম্পর্কে জ্ঞাত থাকত না; তাই প্রথমে ভালো করে শুনে-জেনে নিত, এরপর উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর দরবারে অনুমতিপ্রার্থনার সালাম পেশ করত।' হযরত আয়েশা রাযি. তাদের সঙ্গে অত্যন্ত মার্জিত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করতেন।' মাঝখানে পর্দার আড়াল থাকত। লোকেরা তাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসা পেশ করত, মনে কোনো খটকা থাকলে সমাধান চাইত। উম্মুল মুমিনীন রাযি. তাদের জিজ্ঞাসার জবাব দিতেন, সন্দেহের নিরসন করতেন। তারা সান্ত্বনা পেত, কৃতজ্ঞ হতো। অনেকে অনেক সময় কিছু জিজ্ঞেস করতে সঙ্কোচ করলে إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ )আল্লাহ সত্যপ্রসঙ্গে লজ্জা করেন না) এই আয়াতে কারীমার ভিত্তিতে নিঃসঙ্কোচে কথা বলতে উৎসাহিত করতেন, বলতেন-আমি তোমাদের মা, মায়ের কাছে সঙ্কোচ কিসের?
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বার্ষিক হজ পালন কখনো বিঘ্নিত হতো না। প্রতি বছর হজের মৌসুমে সাবির পর্বতের পাদদেশে টানানো হযরত আয়েশা রাযি.-এর তাঁবুকে ঘিরে জ্ঞান-পিপাসুদের ভিড় জমে যেত। অনেক সময় তিনি খানায়ে কাবায় জমজমের ছাদের নিচে আসন গ্রহণ করতেন এবং ইলমে ওহীর জ্ঞানার্থীদের জ্ঞান বিতরণ করতেন। মানুষ বিভিন্নমুখী সাওয়াল পেশ করত, আর তিনি কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে সকল সাওয়ালেরই জবাব দিতেন。

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৬।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৯। সহীহ বুখারী: বাবু তাওয়াফিন নিসা।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৫, ৭৫৭।
৫. সহীহ বুখারী: বাবু তাওয়াফিন নিসা।
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০, ৯৫, ২১৯, ২২৫, ২৫৯, ২৬১।
৭. সহীহ বুখারী: বাবু তাওয়াফিন নিসা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00