📄 যারা কুনিয়ত বা উপনামে পরিচিত
১. উম্মে বকর।
২. উম্মে জামদার।
৩. উম্মে হামিদা।
৪. উম্মে দারদা।
৫. উম্মে যারাহ (আয়েশা রাযি.-এর আজাদকৃত বাঁদি)।
৬. উম্মে সালেম।
৭. উম্মে সাঈদা।
৮. উম্মে আসেম।
৯. উম্মে আলকামা।
১০. উম্মে কুলসুম (বিনতে আবু বকর সিদ্দীক রাযি.)।
১১. উম্মে কুলসুম বিনতে সামামা।
১২. উম্মে কুলসুম আল লাইসিয়া।
১৩. উম্মে মুহাম্মাদ।
১৪. উম্মে আবদুল্লাহ।
১৫. উম্মে বেলাল।
📄 বিশিষ্ট শিক্ষাবৃন্দ
হযরত আয়েশা রাযি.-এর শিষ্যত্বগ্রহণকারী নারী-পুরুষের মধ্যে 'যারা তাঁর একান্ত সাহচর্যে লালিত-পালিত হয়ে বড় হয়েছিলেন, এবং হাদীস- শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য দেখিয়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জ্ঞানভাণ্ডারের চাবি বলে অভিহিত হয়েছিলেন তারা হলেন:
উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের
উরওয়াহ—হযরত যুবায়ের রাযি.-এর ছেলে, হযরত আবু বকর রাযি.-এর নাতী, হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-এর পুত্র, হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাগ্নে। তিনি সম্মানিতা খালার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। একেবারে ছোট্টবেলা থেকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রতিপালনে বড় হন। মদীনায় জ্ঞানে-গুণে ছিলেন সবচেয়ে এগিয়ে। ইমাম যুহরী রহ.-এর মতো বিশাল ব্যক্তিগুলো ছিলেন তাঁর ছাত্র। সীরাতশাস্ত্রের ইমাম বলে গণ্য। হযরত আয়েশা রাযি.-এর রেওয়ায়েত, ফিকহ, ফতোয়ার আলেম তাঁর চেয়ে বড় আর কেউ ছিলেন না। তিনি চুরানব্বই হিজরীতে ওফাতপ্রাপ্ত হন।
কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ
কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ—মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি.-এর ছেলে, হযরত আবু বকর রাযি.-এর নাতী, হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাতিজা। তিনিও ফুফির কোলেই প্রতিপালিত হন। ছোট্টবেলা থেকেই ধর্মীয় দীক্ষালাভে ব্রতী হন। বড় হয়ে মদীনার ফিকহের ইমাম হন। মদীনায় ফুকাহায়ে সাবআ (ফকীহ-সপ্তক)-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। হাদীস বর্ণনায় ছিলেন খুবই সচেতন। এক একটা অক্ষরও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতেন। একশো আট হিজরীতে তাঁর ইন্তেকাল হয়।
আবু সালামাহ
আবু সালামাহ—হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-এর ছেলে ছিলেন। অত্যন্ত অল্প বয়সেই পিতার স্নেহ-ছায়া থেকে বঞ্চিত হন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর লালন-পালন করেন। তাঁকে উরওয়াহর সমকক্ষ মনে করা হতো। মদীনার ইলমী অঙ্গনের বিশেষ আসনটি ছিল তাঁর দখলে। বড় বড় মুহাদ্দিস ও হাদীসবিশারদ তাঁর হাদীস বর্ণনা করেছেন। মৃত্যু চুরানব্বই হিজরীতে।
মাসরুক কুফি
মাসরুক ছিলেন কুফা নগরীর সন্তান। কিন্তু তিনি মুসলিম গৃহযুদ্ধে ছিলেন না। ইমাম যাহাবি রহ. তাযকিরা-য় লিখেছেন, ইনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর পালকপুত্র ছিলেন। ইবনে সাদে আছে, একবার তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে এলেন, তখন উম্মুল মুমিনীন তাঁর জন্য শরবত বানাতে বানাতে বললেন, আমার ছেলের জন্য শরবত বানাচ্ছি। হযরত আয়েশা রাযি.-এর যখন ইন্তেকাল হলো, তখন তিনি বলেছিলেন, যদি মাতার কিছু কিছু উপদেশ আমার মনে না থাকত, তা হলে আজকে শোকের মাতম করতাম। ইমাম ইবনে হাম্বল মুসনাদে এবং ইমাম বুখারী সহীহে তাঁর অধিকাংশ বর্ণনাই উল্লেখ করেছেন। ইনি ইরাকের শ্রেষ্ঠ ফকীহ হিসেবে পরিগণিত হতেন। অত্যন্ত যাহেদ ও ইবাদতগুজার ছিলেন। কুফায় বিচারকের পদে ছিলেন; কিন্তু কোনো সম্মানী গ্রহণ করতেন না। তেষট্টি হিজরীতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান
নারীদের মধ্যে সর্বাগ্রে উমরাহ বিনতে আবদুর রহমানের নাম আসে। ইনি বিখ্যাত সাহাবী আসআদ আনসারি রাযি.-এর পুত্রী ছিলেন। নারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রতিপালনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মেছাল। হাদীসবিশারদগণ তাঁর নাম নেন অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে। ইমাম মাদিনির একটি উক্তি তাহযীবে উদ্ধৃত হয়েছে:
عُمْرَةُ أَحَدُ الثَّقَاتِ الْعُلَمَاءِ بِعَائِشَةَ الْأَثْبَاتِ فِيْهَا
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি.-এর সবচেয়ে প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলো যাঁরা জানতেন, উমরাহ হলেন তাঁদের অন্যতম।
একই গ্রন্থে ইবনে হিব্বানের একটি উক্তি আছে:
كَانَتْ مِنْ أَعْلَمِ النَّاسِ بِحَدِيْثِ عَائِشَةَ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসগুলো ইনিই সবচেয়ে ভালো জানতেন ও বুঝতেন।
সুফিয়ান রহ. বলতেন:
أَثْبَتُ حَدِيْثِ عَائِشَةَ عُمْرَةُ وَ الْقَاسِمُ وَ عُرْوَةُ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হলেন উমরাহ, উরওয়াহ, কাসেম।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।' এর সুবাদে মানুষও তাকে ভালোবাসত। ইমাম বুখারী রহ.-এর ভাষ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর 'প্রধান কেরানি'। লোকে তাঁর মাধ্যমেই হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরবারে হাদিয়া-তোহফা ও চিঠি-পত্র প্রেরণ করতেন।'
প্রথম হাদীস সংকলক যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অন্যতম হলেন আবু বকর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আমর ইবনে হাযম আনসারি। তিনি ছিলেন হযরত উমরাহর ভাতিজা। খলীফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. তাঁকে হাদীস সংকলনের জন্য মনোনীত করেছিলেন। খলীফার শাহি ফরমান ছিল: ...উমরাহর সবগুলো হাদীস লিপিবদ্ধ করে খেলাফত-সভায় প্রেরণ করা হোক...। ফুফি আপন ভাতিজার ফিকহী সমালোচনা হোক...। করতেন, ইজতিহাদগত ত্রুটি তুলে ধরতেন এবং সংশোধন করতেন।'
ইমাম যুহরী রহ. যখন হাদীস-সংকলনের কাজে হাত দিলেন তখন কেউ তাঁকে বললেন, যদি তোমার জ্ঞানার্জনের স্পৃহা থাকে তবে ভাণ্ডারের সন্ধান আমি জানি; উমরাহর কাছে যাও, তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে বড় হয়েছিলেন। ইমাম যুহরী রহ. বলেন, আমি তাঁর কাছে পৌঁছেছিলাম, তিনি ছিলেন জ্ঞানের অথৈ সাগর।'
সাফিয়া বিনতে শাইবা
সাফিয়া বিনতে শাইবা মশহুর তাবেঈয়া ছিলেন। শাইবা ছিলেন খানায়ে কাবার চাবি-রক্ষকের পুত্রী। প্রায় সকল হাদীসগ্রন্থেই তাঁর বর্ণনা এসেছে। হাদীসের জগতে তাঁর পরিচিতি সাফিয়া বিনতে শাইবা ও সাহেবায়ে আয়েশা নামে। সাহেবায়ে আয়েশা রাযি. বলতে বোঝানো হয়, তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিশেষ বিদ্যার্থিনী ছিলেন, অথবা তাঁর বিশেষ সোহবত ও সাহচর্য লাভ করেছিলেন। লোকেরা তাঁর কাছে ফিকহী মাসায়েল ও হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীস জানার জন্য ভিড় জমাত। আবু দাউদ শরীফে আছে:
خَرَجْتُ مَعَ عَدِيِّ بْنِ عَدِيُّ الْكِنْدِي حَتَّى قَدِمْنَا مَكَّةَ فَبَعَثَنِي إِلَى صَفِيَّةَ بِنْتِ شَيْبَةَ وَكَانَتْ حَفَظَتْ مِنْ عَائِشَةَ
অর্থ: আমি আদি ইবনে আল কিনদির সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা যখন মক্কায় পৌঁছলাম, তখন সে আমাকে সাফিয়া বিনতে শাইবার নিকট পাঠাল। ইনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসের হাফেজা ছিলেন।
কুলসুম বিনতে আমর কুরাশিয়া
কুলসুম বিনতে আমর কুরাশিয়া। রিজালগ্রন্থগুলোতে তাঁর নামের সঙ্গেও সাহেবায়ে আয়েশা রাযি. কথাটি পাওয়া যায়। তিনিও অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আয়েশা বিনতে তালহা
আয়েশা বিনতে তালহা। হযরত তালহা রাযি.-এর মেয়ে, সিদ্দীকে আকবর রাযি.-এর নাতনী এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাতিজি ছিলেন। খালার কোলেই বড় হয়েছিলেন। ইবনে মাঈন তাঁর সম্পর্কে বলতেন— ثِقَةٌ ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য), حُجَّةٌ হুজ্জাত (প্রামাণ্য)। আজালির মূল্যায়ন— ثِقَةٌ ، تَابِعِيَّةٌ ، مَدَنِيَّةٌ মদীনাবাসিনী, তাবেঈয়া, নির্ভরযোগ্যা। আবু যুরা দিমাশকির মন্তব্য : حَدَّثَ عَنْهَا النَّاسُ لِفَضْلِهَا وَ أَدَبِهِ অর্থ : মানুষ তাঁর মহত্ত্ব ও শিষ্টাচার দেখে তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন।'
মুআযা বিনতে আবদুল্লাহ আদাবিয়া
মুআযা বিনতে আবদুল্লাহ আদাবিয়া। মাতৃভূমি ছিল বসরা। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘনিষ্ট শিক্ষার্থিনী ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর অনেক হাদীস তাঁর থেকেও বিবৃত হয়েছে। বড় ইবাদতগুজার ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর কখনো বিছানায় যাননি। একবার তিনি অসুস্থ হলে হেকিম নাবিযে মিশ্রিত ঔষধ দেন। ঔষধ প্রস্তুত হলে পেয়ালা হাতে নিয়ে বলেন, আল্লাহ, আপনি জানেন, হযরত আয়েশা রাযি. আমাকে বলেছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাবিয খেতে নিষেধ করেছেন। হঠাৎ পেয়ালাটি হাত থেকে পড়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
টিকাঃ
১. আল আদাবুল মুফরাদ: বাবুল মুরাসালাতি ইলান নিসা।
২. আল আদাবুল মুফরাদ : ঐ।
৩. তাহযিব, ইবনে হাজার : তরজমায়ে উমরা।
১. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : اما لا قطع فيه
২. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি : ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৯।
১. আলোচ্য রাবীগণের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে যেটুকু আলোকপাত করা হয়েছে, সবই রিজালগ্রন্থগুলো থেকে গৃহীত। বিশেষ করে তাবাকাত, ইবনে সাদ ও তাহযিব, ইবনে হাজার দ্রষ্টব্য।