📄 শিক্ষার্থী, এতিম ও পালক-পালিকা
অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা ছাড়াও, তিনি আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীর ছেলে-মেয়ের, এবং শহরের বিভিন্ন এতিম শিশুর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করতেন এবং নিজে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও তালীম-তরবিয়াতের ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় এমনও হতো, যে ছেলেগুলোকে সম্ভাবনাময় মনে করতেন, একটু বড় হলেও, নিজের বোন বা ভাতিজি কাউকে দিয়ে দুধ পান করাতেন এবং তাদের দুধফুফু অথবা দুধনানী হয়ে যেতেন, তারপর তাদের ভেতরে আসার অনুমতি দিতেন।' যারা ভেতরে আসার অনুমতি লাভ করতেন না, অর্থাৎ যারা মাহরাম ছিলেন না, তাদের খুব আক্ষেপ হতো যে, আমরা ভালোভাবে ইলম হাসিলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তাবেঈ কুবাইসা রহ. আক্ষেপ করে বলতেন, উরওয়াহ আমার চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, সে ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেত।' ইমাম নাখঈ রহ. ইরাকের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হতে পেরেছিলেন বলে সমসাময়িক সকলে তাঁকে ঈর্ষা করতেন。
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম : باب رضاع الكم। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭১। এই মাসআলায়— যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে—হযরত আয়েশা রাযি.-এর এটি একক মত। অন্য কেউ তাঁকে সমর্থন করেননি।
২. তাহযিব, ইবনে হাজার : তরজমায়ে আয়েশা রাযি.।
৩. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি : তরজমায়ে ইমাম নাখঈ।
📄 সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জন
হযরত আয়েশা রাযি.-এর নীতি ছিল, তিনি প্রতি বছর হজে যেতেন। সমগ্র ইসলামী জাহানের মুসলিমগণ বছরে একবার হজের ময়দানে এসে এককাতারে দাঁড়াবার সুযোগ পেতেন। হেরা ও সাবির পর্বতের মাঝামাঝি জায়গায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর তাঁবু ফেলা হতো।' সারা দুনিয়ার ইলমে নববীর পিপাসুরা দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে এসে জড়ো হতেন। তারা অসংখ্য মাসায়েল পেশ করতেন, উত্তর চাইতেন। বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহের নিরসন চাইতেন। কিছু কিছু বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে অনেকে ইতস্তত করতেন। তিনি আশ্বস্ত করতেন এবং নিঃসঙ্কোচে প্রশ্ন করার উৎসাহ দিতেন। একবার এক ব্যক্তি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিল। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছিল। তিনি বললেন, তুমি তোমার মাকে যা জিজ্ঞেস করতে পারতে, আমাকেও তা জিজ্ঞেস করতে পারো। একই ঘটনা একবার হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর সঙ্গে ঘটেছিল। তাঁকেও এ কথাই বলেছিলেন।
বাস্তবেও তিনি ছাত্রদের একজন মমতাময়ী মায়ের মতোই দেখতেন। উরওয়াহ, কাসেম, আবু সালামা, মাসরুক, উমরাহ, সাফিয়্যা প্রমুখের তালীম-তারবিয়াত এ রকম মাতৃসুলভ স্নেহ নিয়েই করেছিলেন। বরং অনেককে পালক-পালিকারূপেও গ্রহণ করতেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের খরচপাতির দায়ও নিজে ঘাড়ে নিতেন। কিছু কিছু শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর এত মমতা ছিল যে, তাঁর আপনজনেরাও তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. তাঁর খুবই প্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁকে আপন সন্তানের মতো বড় করেছিলেন। তিনিও বড় হয়ে সম্মানিতা খালার এক খুদে শিক্ষার্থী আসওয়াদকে ঈর্ষা করতেন। তিনি আসওয়াদকে বলেছিলেন, উম্মুল মুমিনীন তোমাকে যা যা শেখাবে, সব আমাকে জানাবে। শিক্ষার্থীরাও তাঁর আপনজনদেরকে সেরকম সম্মানই করতেন। উমরাহ এক আনসারি মেয়ে ছিলেন। কিন্তু উম্মুল মুমিনীনকে খালা বলতেন। তাবেঈ মাসরুক ইবনে আজদাকে তিনি পোষ্যরূপে গ্রহণ করেছিলেন।' তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর নাম নিতেন বড় আজমত আর মহব্বতের সঙ্গে। তিনি বলতেন, الصِّدِّيقة ، بِئْتُ الصِّدِّيقِ ، حَبِيْبَةُ حَبِيْبِ اللَّهِ ، الْمُبَرَّأَةُ مِنَ السَّمَاءِ সিদ্দীকা (সত্যবাদিনী), বিনতুস-সিদ্দীক (সিদ্দীকের কন্যা), হাবিবাতু হাবিবিল্লাহ (আল্লাহর প্রিয়তমের প্রিয়তমা), আল-মুবাররআ মিনাস-সামা (আসমান হতে যার পবিত্রতা ঘোষিত হয়েছে)।
টিকাঃ
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২।
১. ইবনে সাদ : جزء المدينيين ২১৮ পৃষ্ঠায় কোহে হেরা ও ওয়াদি সাবিরের মাঝামাঝি জায়গার উল্লেখ এসেছে; কিন্তু সহীহ বুখারী ১ম খণ্ড ২১৯ পৃষ্ঠায় ওয়াদি সাবিরের মধ্যস্থলের কথা এসেছে।
২. ইবনে সাদ: জুযউ আহলিল মাদীনা, ২১৮ পৃষ্ঠা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০। সহীহ বুখারী: /২১৯।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯০।
৪. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : باب الغسل |
৫. মুসনাদে আবু দাউদ, তয়ালিসি /১৯৭।
৬. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি।
১. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি। তাহযিব, ইবনে হাজার তরজমায়ে মাসরুক।
📄 বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা
তাঁর দীর্ঘ সাহচর্যে ধন্য হয়েছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। হযরত আয়েশা রাযি.-এর সবচেয়ে বেশি হাদীস এসেছে মুসনাদে আহমাদে। যেই শিষ্যগণ এই হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন তাদের সংখ্যা, যতদূর গুনতে পেরেছি, প্রায় দুইশো জন। এতে নারী-পুরুষ, সাহাবী-তাবেঈ, স্বাধীন-গোলাম, আত্মীয়-অনাত্মীয় সব ধরনের মানুষই আছেন। আবু দাউদ তয়ালিসি (মৃত্যু: ২০৪ হি.), যিনি ইমাম বুখারী রহ.-এর পূর্ববর্তী ছিলেন, মুসনাদে হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রত্যেকটি শিষ্যের বর্ণনা আলাদা-আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা খুব ছোট্ট পরিসরের ছিল, তাই হাদীস সংখ্যাও কম। ইবনে সাদ তাবাকায়ে আহলে মদীনা-য় তাঁর শিষ্যদের পরিসংখ্যান দিয়েছেন এবং তাদের জীবন-বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন।
📄 সাহাবী, তাবেঈ, আত্মীয়, গোলাম
ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তাহযীবুত তাহযীব-এ আত্মীয়, গোলাম, সাহাবী ও তাবেঈ—এই ক্রমানুসারে একটি তালিকা দিয়েছেন। এতে সাহাবীগণের তালিকায় নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গের নাম আছে:
হযরত আবু মুসা আশআরি, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত ইবনে উমর, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত আমর ইবনুল আস, হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ জুহানী, হযরত রবিআহ ইবনে আমর জারশি, সাইব ইবনে ইয়াযিদ, হারেস ইবনে আবদুল্লাহ প্রমুখ রাযি.।
গোলামদের মধ্যে আবু ইউনুস, যাকওয়ান, আবু আমর, ইবনে ফারাখ প্রমুখের নাম তাহযীবেই এসেছে। এছাড়া আবু মুদাল্লাহ মাওলা আয়েশা রাযি.-এর নাম এসেছে তিরমিযীতে।' আবু লুবাবাহ মারওয়ানের নাম এসেছে ইবনে সাদে। আবু ইয়াহয়া ও আবু ইউসুফের নাম এসেছে মুসনাদে। আলোচ্য ব্যক্তিদের মধ্যে যাকওয়ান ও আবু ইউনুস সবচেয়ে প্রসিদ্ধ।
মুসনাদে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযিদ রাযিয়ে আয়েশা (আয়েশার দুগ্ধপোষ্য)-এর নাম এসেছে। রিজাল গ্রন্থগুলোতেও এটুকুই আলোচিত হওয়ায় আলোচ্য ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মেলেনি।
আত্মীয়দের মধ্যে উম্মে কুলসুম বিনতে আবু বকর (বোন); আওফ ইবনে হারেস (দুধভাই); কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ, আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ (ভাতিজা); হাফসা বিনতে আবদুর রহমান, আসমা বিনতে আবদুর রহমান (ভাতিজি); আবদুল্লাহ ইবনে আতিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান (প্রপৌত্র); আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, কাসেম ইবনে যুবায়ের (ভাগ্নে); আয়েশা বিনতে তালহা (ভাগ্নি); এবং আব্বাদ ইবনে হাবিব ও আব্বাদ হামযা (ভাগ্নের পুত্র) বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এছাড়াও বেশ কিছু নিকটাত্মীয় ও কাছের মানুষের ছেলে-মেয়ের লালন- পালন করেছেন বলে পাওয়া যায়। তাবাকাতে ইবনে সাদ গ্রন্থে তাদের তালিকা আছে।
টিকাঃ
১. তিরমিযী: বাবু আইয়ু কালামিন আহাব্বু ইলাল্লাহ, ৫৯৭ পৃষ্ঠা।
২. ইবনে সাদ: আহলুল মাদীনা, যিকরুল মাওয়ালি।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৮।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৭।
৫. মুসনাদে আহমাদ ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২। উল্লেখ্য: রিজালগ্রন্থগুলোতে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযিদের নামের সঙ্গে সবসময় রাযিয়ে আয়েশা (আয়েশা রাযি.-এর দুগ্ধপোষ্য) কথাটি লেখা থাকে। তিনি কি স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এরই দুগ্ধপোষ্য ছিলেন, না তাঁর নির্দেশে তাঁর কোনো মাহরাম আত্মীয়ার দুগ্ধপোষ্য ছিলেন?-এ ব্যাপারে কোথাও কোনো ব্যাখ্যা বা টীকা আমরা পাইনি।