📄 দরস-দানের পদ্ধতি
শিশু, নারী এবং যেসব পুরুষের সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর পর্দা ছিল না, তারা ঘরের ভেতরে বসতেন। অন্যরা কামরার সামনে মসজিদে নববীতে বসতেন। দরজায় পর্দা ঝোলানো থাকত। পর্দার আড়ালে তিনি বসতেন।' শিষ্যরা জিজ্ঞেস করত, তিনি উত্তর দিতেন। কখনো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনা উঠত, গুরু-শিষ্যের মধ্যে কথোপকথন চলত।' কখনো নিজেই কোনো মাসআলার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন, লোকেরা নীরবে শুনতে থাকত।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭২। ইবনে সাদ: ২/২/২৯।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৫।
📄 নিভৃত ভাষায় কথা বলার ব্যাপারে কঠোরতা
শিষ্যদের ভাষা, বাচনভঙ্গি ও বিশুদ্ধ উচ্চারণেরও কঠোর তত্ত্বাবধান করতেন। একবার তাঁর দুই ভাতিজা কাসেম ও ইবনে আবি আতিক তাঁর খেদমতে এলেন। তাঁরা দুজন বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন। কাসেমের ভাষা পরিচ্ছন্ন ছিল না। ব্যাকরণগত ত্রুটি ছিল। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি এভাবে বল না কেন, যেভাবে ইবনে আবি আতিক বলছে? বুঝেছি, তাকে তার মা এবং তোমাকে তোমার মা শিখিয়েছেন। কাসেমের মা একজন দাসী ছিলেন। তাই তার ভাষাজ্ঞান তেমন ছিল না।
📄 শিক্ষার্থী, এতিম ও পালক-পালিকা
অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা ছাড়াও, তিনি আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীর ছেলে-মেয়ের, এবং শহরের বিভিন্ন এতিম শিশুর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করতেন এবং নিজে তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও তালীম-তরবিয়াতের ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় এমনও হতো, যে ছেলেগুলোকে সম্ভাবনাময় মনে করতেন, একটু বড় হলেও, নিজের বোন বা ভাতিজি কাউকে দিয়ে দুধ পান করাতেন এবং তাদের দুধফুফু অথবা দুধনানী হয়ে যেতেন, তারপর তাদের ভেতরে আসার অনুমতি দিতেন।' যারা ভেতরে আসার অনুমতি লাভ করতেন না, অর্থাৎ যারা মাহরাম ছিলেন না, তাদের খুব আক্ষেপ হতো যে, আমরা ভালোভাবে ইলম হাসিলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। তাবেঈ কুবাইসা রহ. আক্ষেপ করে বলতেন, উরওয়াহ আমার চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল শুধু এ কারণে যে, সে ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেত।' ইমাম নাখঈ রহ. ইরাকের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হতে পেরেছিলেন বলে সমসাময়িক সকলে তাঁকে ঈর্ষা করতেন。
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম : باب رضاع الكم। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭১। এই মাসআলায়— যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে—হযরত আয়েশা রাযি.-এর এটি একক মত। অন্য কেউ তাঁকে সমর্থন করেননি।
২. তাহযিব, ইবনে হাজার : তরজমায়ে আয়েশা রাযি.।
৩. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি : তরজমায়ে ইমাম নাখঈ।
📄 সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জন
হযরত আয়েশা রাযি.-এর নীতি ছিল, তিনি প্রতি বছর হজে যেতেন। সমগ্র ইসলামী জাহানের মুসলিমগণ বছরে একবার হজের ময়দানে এসে এককাতারে দাঁড়াবার সুযোগ পেতেন। হেরা ও সাবির পর্বতের মাঝামাঝি জায়গায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর তাঁবু ফেলা হতো।' সারা দুনিয়ার ইলমে নববীর পিপাসুরা দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে এসে জড়ো হতেন। তারা অসংখ্য মাসায়েল পেশ করতেন, উত্তর চাইতেন। বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহের নিরসন চাইতেন। কিছু কিছু বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে অনেকে ইতস্তত করতেন। তিনি আশ্বস্ত করতেন এবং নিঃসঙ্কোচে প্রশ্ন করার উৎসাহ দিতেন। একবার এক ব্যক্তি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিল। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছিল। তিনি বললেন, তুমি তোমার মাকে যা জিজ্ঞেস করতে পারতে, আমাকেও তা জিজ্ঞেস করতে পারো। একই ঘটনা একবার হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর সঙ্গে ঘটেছিল। তাঁকেও এ কথাই বলেছিলেন।
বাস্তবেও তিনি ছাত্রদের একজন মমতাময়ী মায়ের মতোই দেখতেন। উরওয়াহ, কাসেম, আবু সালামা, মাসরুক, উমরাহ, সাফিয়্যা প্রমুখের তালীম-তারবিয়াত এ রকম মাতৃসুলভ স্নেহ নিয়েই করেছিলেন। বরং অনেককে পালক-পালিকারূপেও গ্রহণ করতেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের খরচপাতির দায়ও নিজে ঘাড়ে নিতেন। কিছু কিছু শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর এত মমতা ছিল যে, তাঁর আপনজনেরাও তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. তাঁর খুবই প্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁকে আপন সন্তানের মতো বড় করেছিলেন। তিনিও বড় হয়ে সম্মানিতা খালার এক খুদে শিক্ষার্থী আসওয়াদকে ঈর্ষা করতেন। তিনি আসওয়াদকে বলেছিলেন, উম্মুল মুমিনীন তোমাকে যা যা শেখাবে, সব আমাকে জানাবে। শিক্ষার্থীরাও তাঁর আপনজনদেরকে সেরকম সম্মানই করতেন। উমরাহ এক আনসারি মেয়ে ছিলেন। কিন্তু উম্মুল মুমিনীনকে খালা বলতেন। তাবেঈ মাসরুক ইবনে আজদাকে তিনি পোষ্যরূপে গ্রহণ করেছিলেন।' তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর নাম নিতেন বড় আজমত আর মহব্বতের সঙ্গে। তিনি বলতেন, الصِّدِّيقة ، بِئْتُ الصِّدِّيقِ ، حَبِيْبَةُ حَبِيْبِ اللَّهِ ، الْمُبَرَّأَةُ مِنَ السَّمَاءِ সিদ্দীকা (সত্যবাদিনী), বিনতুস-সিদ্দীক (সিদ্দীকের কন্যা), হাবিবাতু হাবিবিল্লাহ (আল্লাহর প্রিয়তমের প্রিয়তমা), আল-মুবাররআ মিনাস-সামা (আসমান হতে যার পবিত্রতা ঘোষিত হয়েছে)।
টিকাঃ
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২।
১. ইবনে সাদ : جزء المدينيين ২১৮ পৃষ্ঠায় কোহে হেরা ও ওয়াদি সাবিরের মাঝামাঝি জায়গার উল্লেখ এসেছে; কিন্তু সহীহ বুখারী ১ম খণ্ড ২১৯ পৃষ্ঠায় ওয়াদি সাবিরের মধ্যস্থলের কথা এসেছে।
২. ইবনে সাদ: জুযউ আহলিল মাদীনা, ২১৮ পৃষ্ঠা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০। সহীহ বুখারী: /২১৯।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯০।
৪. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক : باب الغسل |
৫. মুসনাদে আবু দাউদ, তয়ালিসি /১৯৭।
৬. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি।
১. তাযকিরা, ইমাম যাহাবি। তাহযিব, ইবনে হাজার তরজমায়ে মাসরুক।