📄 চিকিৎসা
উরওয়াহ বলেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় অভিজ্ঞ কাউকে দেখিনি। এ কথা সুস্পষ্ট, ওই সময় আরবে চিকিৎসাচর্চার নিয়মতান্ত্রিক রেওয়াজ ছিল না। তখন আরবের সবচেয়ে বড় হেকিম ছিলেন হারেস ইবনে কিলদাহ নামক জনৈক বৃদ্ধ। তিনি ছাড়া আরও ছোট ছোট অনেক হেকিম ও চিকিৎসক ছিলেন। চিকিৎসাবিদ্যা বলতে তখন সেটুকুই ছিল, যেটুকু একটি অশিক্ষিত-সমাজে থাকতে পারে : কিছু লতা-পাতার গুণাগুণ, কিছু ছোটখাটো রোগের পরীক্ষিত ওষুধপথ্য।
এক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাব্য বোঝেন, কবিতা বলেন; মেনে নিলাম, কারণ আপনি আবু বকর রাযি.-এর মেয়ে; কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যায় এত জ্ঞান লাভ করলেন কোত্থেকে? তিনি বললেন, আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ বয়সে প্রায় সবসময়ই অসুস্থ থাকতেন। আরবের বিজ্ঞ হেকিম ও চিকিৎসকগণ আসতেন। তারা চিকিৎসা-বিষয়ক অনেক কিছু বলতেন, আমি সেগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিতাম।'
আমরা মনে করি, হযরত আয়েশা রাযি.-এর চিকিৎসা-জ্ঞান বলতে আহামরি কিছু ছিল না। আমাদের কয়েক প্রজন্ম আগের বুড়ো-বুড়িরা যেমন বাচ্চাকাচ্চার ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা করত, দু-একটা হেকিমি পুঁথি ও নকশা মুখস্থ রাখত-সেরকমই কিছু। তবে আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এগুলো মূল্যহীন হলেও, ওই সময় ও সমাজের কাছে এও কম ছিল না।
যাই হোক, মুসলিম নারীগণ সাধারণত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করতেন এবং আহত সৈনিকদের চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষা করতেন। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-ও উহুদের যুদ্ধে এ দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ছিলেন。
মোটকথা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোবারক যুগে মুসলিম নারীগণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-জ্ঞান রাখতেন এবং অনেকে এর চর্চাও করতেন。
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ, যাহাবি, তরজমাতু আয়েশা রাযি.।
১. মুসতাদরাকে হাকেম: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৭।
২. আবু দাউদ: কিতাবুল জিহাদ।
📄 ইতিহাস
আরবদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন কথা, জাহেলি যুগের রীতি-প্রথা, আন্তঃগোত্রীয় বংশসূত্র-ইত্যাদি জ্ঞানে হযরত আবু বকর রাযি. একজন বড় পণ্ডিত ছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সুযোগ্য কন্যা ছিলেন। তাই এই জ্ঞানগুলো তাঁর উত্তরাধিকারের মতোই ছিল।' উরওয়াহ বলতেন, আমি আরবদের ইতিহাস ও বংশবিদ্যায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।২
জাহেলি আরবের রীতি-প্রথা ও সামাজিক জীবন-বৈচিত্র বিষয়ে হাদীসগ্রন্থগুলোতে অনেক অমূল্য তথ্য উঠে এসেছে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাষ্যে। আরবে কত ধরনের বিবাহের প্রচলন ছিল, বিবাহ-বিচ্ছেদের কী কী পদ্ধতি ছিল, বিবাহে কোন গীতগুলো গাওয়া হতো; রোযা কেমন ও কখন ছিল, হজ কিভাবে পালিত হতো, কেউ মারা গেলে কি করতে ও বলতে হতো'-ইত্যাকার প্রাচীন আরবের অনেক ধারণাই পাই তাঁর বিবৃতিতে।
হাদীসের সভায় বুআস যুদ্ধের আলোচনা আমরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতে পাই। আনসারীদের পূর্ব ধর্ম-জীবন এবং জীবন-ধর্ম জানি তাঁর ভাষ্যে। মুশালালের অবস্থান নিয়ে তাদের যে জিজ্ঞাসা ছিল, সেটাও আমাদের শুনিয়েছেন তিনি।১০ ইসলামের আবির্ভাবের ঘটনাগুলোর নবুওয়াতপ্রাপ্তি, ওহী অবতরণের সূচনা,” হিজরতের প্রেক্ষাপট-বিস্তারিত ইতিহাস রচিত হয়েছে তাঁরই বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে। ইফকের ঘটনার আগাগোড়া ইতিহাস শুনিয়েছেন তিনি নিজে।১৩
আশ্চর্যের বিষয়, বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এক একটি হাদীস যেখানে দুই লাইন-তিন লাইন, সেখানে তাঁর এক একটি বিবৃতি দুই পৃষ্ঠা-তিন পৃষ্ঠা লাগাতার। কুরআন কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হলো, নামাযের কী কী পদ্ধতি ইসলামে প্রদত্ত হলো তিনিই বলেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুরোগের আদ্যোপান্ত সারা পৃথিবী জেনেছে তাঁর কাছেই।
শুধু ঘরোয়া বিষয়গুলোই নয়; অসংখ্য যুদ্ধের ঘটনাও তিনিই আমাদের শুনিয়েছেন। বদর যুদ্ধের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, উহুদ যুদ্ধের পরিস্থিতি, পরিখার যুদ্ধের বেশ কিছু বিবরণ, বনু কুরায়যা অভিযানের কিছু অনুষঙ্গ, যাতুর রিকা যুদ্ধে 'ভীতির নামায'-এর পদ্ধতি, মক্কা বিজয়ের পর নারীদের বাইয়াত প্রসঙ্গ'-ইত্যাদি বিষয়গুলো তাঁর কল্যাণেই মুসলিম ঐতিহাসিকগণ হাতে পেয়েছেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন-চরিত সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো দিয়েছেন তিনিই। ওহী, নবুওয়াত, হিজরত ইত্যাদি ছাড়াও তাঁর ইবাদত-বন্দেগী, পারিবারিক জীবন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির একটি সুস্পষ্ট চিত্র তিনিই আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর বিবরণও দিয়েছেন তিনিই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর হযরত আবু বকর রাযি.-এর খেলাফত, হযরত ফাতেমা রাযি.-সহ উম্মাহাতুল মুমিনীনের দাবি, হযরত আলী রাযি.-এর খেলাফত, বাইয়াত ইত্যাদি বিষয়গুলোর সুবিশদ বর্ণনা বিশুদ্ধ সূত্রে তিনিই আমাদের দান করেছেন।'
টিকাঃ
৩. ইসাবা ও ইসতিআব-এ হযরত আবু বকর রাযি. এবং হযরত হাসান রাযি.-এর জীবনী দেখুন। আরও দেখুন মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬৭।
১. মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড।
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ: তরজমাতু আয়েশা রাযি.।
৩. সহীহ বুখারী: কিতাবুন নিকাহ।
৪. তিরমিযী: কিতাবুত তালাক।
৫. মুজামে সগীর, তাবরানি : باب الحاء
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৪।
৭. সহীহ বুখারী: তাফসীর: ا ثم أفيضوا من .....।
৮. সহীহ বুখারী: বাবু আইয়ামিল জাহিলিয়্যাহ।
৯. সহীহ বুখারী: বাবু আইয়ামিল জাহিলিয়্যাহ।
১০. সহীহ বুখারী: কিতাবুল হজ।
১১. সহীহ বুখারী : ا بدء الوحي
১২. সহীহ বুখারী : ا باب الهجرة
১৩. সহীহ বুখারী: হাদীসুল ইফক।
১. সহীহ বুখারী: বাবু তালিফিল কুরআন।
২. সহীহ বুখারী: বাবু ওয়াফাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫০, ২৭২।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড।
৫. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪১।
৬. সহীহ বুখারী: যিকরু কুরাইযাহ।
৭. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭৫।
৮. সহীহ বুখারী: কিতাবুল হজ।
৯. সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও অন্যান্য: কিতাবু সালাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
১০. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮২। সহীহ বুখারী : باب كيف يكون الرجل في أهله
১১. সহীহ বুখারী, আবু দাউদ ও অন্যান্য: কিতাবুল আদব।
১২. باب أشد ما لقي رسول الله صلى الله عليه وسلم
১. সহীহ বুখারী: ওয়াফাতুন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কিতাবুল ফারায়েয, গাযওয়াতু খাইরাব। মুসলিম : باب قوله صلى الله عليه وسلم : ما تركنا صدقة। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৬৭। মুসতাদরাকে হাকেম।
📄 সাহিত্য
সাহিত্য বলতে আমরা সাধারণ কথোপকথনের সৌন্দর্য ও বাক্যালাপের রুচিশীলতাকে বোঝাচ্ছি। অসংখ্য বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত আয়েশা রাযি. কথাসৌন্দর্যে খুবই পারঙ্গম ছিলেন। তাঁর মিষ্টভাষিতা ও শুদ্ধভাষিতা ছিল অবাক করার মতো। তাঁর একজন শিষ্য হযরত মুসা ইবনে তালহা বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَفْصَحُ مِنْ عَائِشَةَ
অর্থ: আমার দেখা হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে বিশুদ্ধভাষী আর কেউ ছিল না।'
আহনাফ ইবনে কায়স লিখেন,
টিকাঃ
২. মুসতাদরাকে হাকেম। তিরমিযী: কিতাবুল মানাকিব।
📄 বক্তৃতা
তালহা থেকেও বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে বিশুদ্ধভাষী কাউকে দেখিনি।'
একজন ভালো বক্তার জন্য সুন্দর বাচনভঙ্গি ও বিশুদ্ধ ভাষাপ্রয়োগ- সহ সুউচ্চ কণ্ঠস্বর, ওজস্বী শব্দচয়ন ও তেজস্বী উচ্চারণেরও প্রয়োজন আছে। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তৃতায় সবগুলো গুণই বিদ্যমান। তারীখে তাবারীতে আছে:
فَتَكَلَّمَتْ عَائِشَةُ وَ كَانَتْ جَهْوَرِيَّةً يَعْلُوْ صَوْتُهَا كَثِيرَةً كَأَنَّهُ صَوْتُ امْرَأَةٍ جَلِيلَةٍ
অর্থ: তারপর হযরত আয়েশা রাযি. বক্তৃতা শুরু করলেন, তাঁর সুউচ্চ কণ্ঠস্বর সমবেত জনসমুদ্রের তরঙ্গবিক্ষুব্ধ শব্দঢেউকে ছাপিয়ে উঠল; সত্যিই এ ছিল এক ওজস্বিনী নারীর তেজোদীপ্ত ভাষণ।
জঙ্গে জামালের আলোচনায় আমরা তাঁর অল্প কয়েকটি বক্তৃতা উল্লেখ করেছি। যদিও অনুবাদে সেই প্রকৃত মহিমাটি প্রকাশ পায় না; কিন্তু ভাব ও ভাষার তেজ ও শক্তি কিছুটা অনুভব করা যায়。
টিকাঃ
১. যুরকানী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৭ (তাবরানির উদ্ধৃতিতে)।