📄 কাবা-নির্মাণ
কাবার এক পাশের দেয়ালের পর কিছু জায়গা ছাড়া পড়েছে। এটিকে হাতিম বলা হয়। তাওয়াফে হাতিমও ভেতরে গণ্য করা হয়। যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যা কাবার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা কেন তাওয়াফের মধ্যে শামিল করতে হবে? হতে পারে, অন্যান্য সাহাবীও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ প্রশ্নটি করেছিলেন; কিন্তু বর্তমানে হাদীসের বিদ্যমান নীরব দরস-মজলিসগুলোতে হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়া আর কাউকেই এ ব্যাপারে বলতে শোনা যায় না। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল, এই দেয়ালগুলোও কি ক্বাবা শরীফের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বলেছিলেন, হাঁ। আমি আরজ করলাম, তা হলে নির্মাণকালে লোকেরা এটাকে বাইরে রেখেছে কেন? তিনি বললেন, তোমার কওমের কাছে এত সম্পদ ছিল না, তাই এটুকু কম পড়েছে। তিনি বলেন, এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, দরজাটি এত উঁচু করা হয়েছে কেন? তিনি বললেন, এজন্য যে, তা যাকে ইচ্ছা—ঢুকতে দেবে, যাকে ইচ্ছা—ঢুকতে দেবে না。
হযরত ইবনে উমর রাযি. বলেন, যদি হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাটি সহীহ হয়, তা হলে হয়তো এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই পাশের রুকন দুটোতে চুমু দেননি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু জানতেন যে কাবা মূল কাঠামোর ওপরে নেই, সেহেতু ইবরাহিমি ধর্মের সংস্কারক হিসেবে তাঁর কর্তব্য ছিল—ক্বাবা শরীফকে মূল কাঠামোর ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। আমরা এ প্রশ্নের উত্তরটিও পাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্যে। তিনি বলেন, আয়েশা, যদি সময়টা কুফরিকালের অতি নিকটবর্তী না হতো, তা হলে অবশ্যই কাবা শরীফকে ইবরাহিমি ভিতের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতাম।' অর্থাৎ, সাধারণ আরবরা সদ্য মুসলমান হয়েছে, ভয় হয়, এতে তারা ভড়কে যাবে।
এই হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, বিশেষ কোনো কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রেখে, যদি কোনো ধর্মীয় কাজের বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় এবং শরীয়ত তার তৎক্ষণাৎ বাস্তবায়ন দাবি না করে, তা হলে তা তিরস্কারযোগ্য হবে না।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসটির ওপর ভিত্তি করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. স্বীয় খেলাফত-আমলে কাবা শরীফের সংস্কার করে মূল ইবরাহিমি ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক ভেবেছিলেন, ইবনে যুবায়ের রাযি. নিজের খেয়াল-খুশি মোতাবেক এ কাজ করেছেন; তাই স্বীয় শাসনামলে কাবা শরীফকে পুনঃসংস্কার করে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। কিন্তু যখন একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর হাদীসটি নিশ্চিত হন, তখন আক্ষেপ ও অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন。
টিকাঃ
১. এই বর্ণনাটি অধিকাংশ হাদীসের কিতাবেই আছে। কিন্তু আমি এখানে সহীহ মুসলিম: বাবু নাকযিল কাবা সামনে রেখেছি。
২. সহীহ মুসলিম: বাবু নাকযিল কাবা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৩, ২৫৭।
📄 সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা
বিদায় হজে সওয়ারিতে আরোহণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ করেছিলেন। এজন্য অনেকে ভেবেছেন, সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা সুন্নাত। এমনকি, কিছু মুজতাহিদও এমনটা ভেবেছেন। কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বিশেষ কারণে সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করেছিলেন। তিনজন সাহাবী রাযি. এ ব্যাপারে বিবৃতিও দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ছিলেন বলে এমনটি করেছিলেন। হযরত জাবের রাযি. বলেন, যেন লোকেরা তাঁকে দেখতে পারে এবং জিজ্ঞেস করতে পারে, সেজন্য সওয়ারিতে আরোহণ করেছিলেন; কেননা ভিড়ের কারণে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—তখন খুবই ভিড় ছিল, প্রত্যেকেই চাইছিল যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকবে, এজন্য ভারি টানাপোড়েন শুরু হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের জোর করে সরিয়ে দেওয়াও পছন্দ করলেন না; তাই সওয়ারিতে আরোহণ করলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বিবৃতিটি মেনে নিতে এজন্যই দ্বিধা হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি অসুস্থ থাকতেন, তা হলে এটা এত সাধারণ বিষয় নয় যে শুধু তিনিই জানবেন; বরং এটা লোকসম্মুখে ঘোষণা করার দাবি রাখে। তাই মনে করা হয়, ঘটনার কারণ প্রত্যেকে নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী ব্যক্ত করেছিলেন।
টিকাঃ
৩. সহীহ মুসলিম: কিতাবুল হজ। হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত জাবের রাযি.-এর বর্ণনা আছে; আর আবু দাউদ-এ হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনা আছে।
📄 হিজরত
আজকাল হিজরতের ব্যাপারে অনেকে মনে করছেন, নিজ ঘর-বাড়ি ছেড়ে মক্কা বা মদীনায় পার হয়ে গেলেই হিজরত হয়ে যাবে। যদিও নিজ এলাকা শান্ত ও নিরাপদ আশ্রয় হয়। আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ.-কে তাবেঈগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় মনে করা হয়। তিনি একবার উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, হিজরতের স্বরূপ কী? তিনি বললেন,
لَا هِجْرَةَ الْيَوْمَ، كَانَ الْمُؤْمِنُوْنَ يَفِرُّ أَحَدُهُمْ بِدِيْنِهِ إِلَى اللَّهِ وَ إِلَى رَسُولِهِ مَخَافَةِ أَنْ يُفْتَنَ عَلَيْهِ فَأَمَّا الْيَوْمَ فَقَدْ أَظْهَرَ اللهُ الْإِسْلَامَ وَ الْيَوْمَ يَعْبُدُ رَبَّهُ حَيْثُ شَاءَ وَ لَكِنْ جِهَادٌ وَ نِيَّةٌ
অর্থ: এখন আর হিজরত নেই। একটা সময় ছিল যখন মানুষ ধর্ম নিয়ে ভীত ছিল, তারা বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কাছে পালিয়ে বেড়াত। কিন্তু আজ আল্লাহ ইসলামকে বিজয়ী করেছেন। মানুষ সর্বত্র নির্বিবাদে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। তবে এখন জিহাদ আছে। নিয়ত আছে।'
হযরত আয়েশা রাযি.-এর সুস্পষ্ট ভাষ্যের পর এই রহস্যেরও ভেদ হয় যে, হযরত ইবনে উমর রাযি. কেন বলতেন, لَا هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَنْحِ (অর্থ : মক্কা বিজয়ের পর হিজরত নেই')! প্রকৃতপক্ষেই মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের প্রয়োজন ছিল না; কেননা সারা দেশে তখন ধর্মীয় শান্তি বিরাজ করছিল। তবে এখনো যদি কেউ আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশিত্ব কামনা করে, অথবা আল্লাহর নবীর রওযার প্রতিবেশিত্ব কামনা করে এবং সেই নিয়তে মাতৃভূমি ছেড়ে সেখানে চলে যায় তা হলে নিয়তের সওয়াবটুকু অবশ্যই পাবে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: বাবু হিজরাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কিতাবু মানাকিবিল আনসার। হাদীস নং ৩৯০০।
২. এই হাদীসের আরও একটি অর্থ হতে পারে, মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে হিজরত নেই।
📄 রাসুলকে ঘরে সমাহিত করা হলো কেন?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইন্তেকাল করলেন, তখন সাহাবা কেরাম রাযি.-এর মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ হলো যে তাঁকে কোথায় দাফন করা হবে। একটি বর্ণনায় আছে, হযরত আবু বকর রাযি. বললেন, নবী-রাসূলগণ যেখানে মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই সমাহিত হন। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে সমাহিত করা হলো। কেননা তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
হতে পারে, হযরত আবু বকর রাযি. কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু এটি একটি ঐতিহাসিক বিষয়। মজবুত প্রমাণের প্রয়োজন আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেন কোনো ঘরের ভেতর সমাহিত করা হয়েছিল এর প্রকৃত কারণটি ব্যাখ্যা করেছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনি বলেন,
قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَرَضِهِ الَّذِي لَمْ يَقُمْ مِنْهُ لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَ النَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِياءِ هِمْ مَسَاجِدَ، لَوْلَا ذَلِكَ أَبْرَزَ قَبْرَهُ غَيْرَ أَنَّهُ خَشِيَ أَنْ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ ইহুদি ও নাসারাদের অভিশপ্ত করুন, এরা এদের নবী-রাসূলের সমাধিগুলোকে সেজদার জায়গা বানিয়ে ছেড়েছিল। (হযরত আয়েশা রাযি. বলেন,) যদি এমনটা না হতো তা হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমাধি খোলা ময়দানে হতে পারত। কিন্তু তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে, তাঁর সমাধিও হয়তো মসজিদে পরিণত হবে' (এজন্যই তাঁকে কোনো ঘরে সুরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়)।
এই হাদীসটি থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা মোবারক এখনো ছাদ ও দেয়ালের সুরক্ষিত ক্ষেত্রেই থাকতে হবে।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুল জানাইয, হাদীস নং ১৩৯০। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২১।