📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি রাখা

📄 কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি রাখা


একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোরবানির গোশত যেন তিন দিনের বেশি রাখা না হয়। হযরত আলী রাযি., হযরত ইবনে উমর রাযি. প্রমুখ মনে করতেন, এটা স্থায়ী নির্দেশই ছিল। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি., হযরত জাবের রাযি., হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি., হযরত সালামা ইবনে আকওয়া রাযি., হযরত সওবান রাযি. এবং হযরত বুরায়দা রাযি. বর্ণনা করেছেন যে, এটা সাময়িক নির্দেশ ছিল। কিন্তু এই সাময়িক নির্দেশের কারণটি হযরত আয়েশা রাযি.-ই আমাদের জানিয়েছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, তিন দিন পর কোরবানির গোশত খাওয়া আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি হারাম করে দিয়েছিলেন? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন,
لَا وَ لَكِنْ قَلَّ مَنْ كَانَ يُضَحِّي مِنَ النَّاسِ فَأَحَبَّ أَنْ يُطْعَمَ مَنْ لَّمْ يَكُنْ يُضَحي
অর্থ: না, নিষেধ নয়; আসলে তখন কোরবানি-করা লোকের সংখ্যা খুব কম ছিল। এজন্য তিনি চাইতেন, যেই লোকগুলো কোরবানি দিতে পারেনি, তাদেরও খাওয়ানো হোক।'
হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসটিকে ইমাম মুসলিম রহ. সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন; অর্থাৎ কোনো এক বছর মদীনায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরের বছর দুর্ভিক্ষ কেটে গেলে নির্দেশটি রহিত হয়।
হযরত সালামা ইবনে আকওয়া রাযি. থেকেও এ ধরনের একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।'

টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০২।
১. পূর্বোক্ত হাদীসটি-সহ উভয় বর্ণনা দেখুন সহীহ মুসলিম, কিতাবুয যাবাইহ।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 কাবা-নির্মাণ

📄 কাবা-নির্মাণ


কাবার এক পাশের দেয়ালের পর কিছু জায়গা ছাড়া পড়েছে। এটিকে হাতিম বলা হয়। তাওয়াফে হাতিমও ভেতরে গণ্য করা হয়। যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যা কাবার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা কেন তাওয়াফের মধ্যে শামিল করতে হবে? হতে পারে, অন্যান্য সাহাবীও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ প্রশ্নটি করেছিলেন; কিন্তু বর্তমানে হাদীসের বিদ্যমান নীরব দরস-মজলিসগুলোতে হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়া আর কাউকেই এ ব্যাপারে বলতে শোনা যায় না। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল, এই দেয়ালগুলোও কি ক্বাবা শরীফের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বলেছিলেন, হাঁ। আমি আরজ করলাম, তা হলে নির্মাণকালে লোকেরা এটাকে বাইরে রেখেছে কেন? তিনি বললেন, তোমার কওমের কাছে এত সম্পদ ছিল না, তাই এটুকু কম পড়েছে। তিনি বলেন, এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, দরজাটি এত উঁচু করা হয়েছে কেন? তিনি বললেন, এজন্য যে, তা যাকে ইচ্ছা—ঢুকতে দেবে, যাকে ইচ্ছা—ঢুকতে দেবে না。
হযরত ইবনে উমর রাযি. বলেন, যদি হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাটি সহীহ হয়, তা হলে হয়তো এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই পাশের রুকন দুটোতে চুমু দেননি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু জানতেন যে কাবা মূল কাঠামোর ওপরে নেই, সেহেতু ইবরাহিমি ধর্মের সংস্কারক হিসেবে তাঁর কর্তব্য ছিল—ক্বাবা শরীফকে মূল কাঠামোর ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। আমরা এ প্রশ্নের উত্তরটিও পাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্যে। তিনি বলেন, আয়েশা, যদি সময়টা কুফরিকালের অতি নিকটবর্তী না হতো, তা হলে অবশ্যই কাবা শরীফকে ইবরাহিমি ভিতের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতাম।' অর্থাৎ, সাধারণ আরবরা সদ্য মুসলমান হয়েছে, ভয় হয়, এতে তারা ভড়কে যাবে।
এই হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, বিশেষ কোনো কল্যাণের দিকে দৃষ্টি রেখে, যদি কোনো ধর্মীয় কাজের বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় এবং শরীয়ত তার তৎক্ষণাৎ বাস্তবায়ন দাবি না করে, তা হলে তা তিরস্কারযোগ্য হবে না।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসটির ওপর ভিত্তি করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. স্বীয় খেলাফত-আমলে কাবা শরীফের সংস্কার করে মূল ইবরাহিমি ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক ভেবেছিলেন, ইবনে যুবায়ের রাযি. নিজের খেয়াল-খুশি মোতাবেক এ কাজ করেছেন; তাই স্বীয় শাসনামলে কাবা শরীফকে পুনঃসংস্কার করে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। কিন্তু যখন একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর হাদীসটি নিশ্চিত হন, তখন আক্ষেপ ও অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন。

টিকাঃ
১. এই বর্ণনাটি অধিকাংশ হাদীসের কিতাবেই আছে। কিন্তু আমি এখানে সহীহ মুসলিম: বাবু নাকযিল কাবা সামনে রেখেছি。
২. সহীহ মুসলিম: বাবু নাকযিল কাবা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৩, ২৫৭।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা

📄 সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা


বিদায় হজে সওয়ারিতে আরোহণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ করেছিলেন। এজন্য অনেকে ভেবেছেন, সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করা সুন্নাত। এমনকি, কিছু মুজতাহিদও এমনটা ভেবেছেন। কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বিশেষ কারণে সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করেছিলেন। তিনজন সাহাবী রাযি. এ ব্যাপারে বিবৃতিও দিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ ছিলেন বলে এমনটি করেছিলেন। হযরত জাবের রাযি. বলেন, যেন লোকেরা তাঁকে দেখতে পারে এবং জিজ্ঞেস করতে পারে, সেজন্য সওয়ারিতে আরোহণ করেছিলেন; কেননা ভিড়ের কারণে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—তখন খুবই ভিড় ছিল, প্রত্যেকেই চাইছিল যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকবে, এজন্য ভারি টানাপোড়েন শুরু হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের জোর করে সরিয়ে দেওয়াও পছন্দ করলেন না; তাই সওয়ারিতে আরোহণ করলেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বিবৃতিটি মেনে নিতে এজন্যই দ্বিধা হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি অসুস্থ থাকতেন, তা হলে এটা এত সাধারণ বিষয় নয় যে শুধু তিনিই জানবেন; বরং এটা লোকসম্মুখে ঘোষণা করার দাবি রাখে। তাই মনে করা হয়, ঘটনার কারণ প্রত্যেকে নিজ নিজ বুঝ অনুযায়ী ব্যক্ত করেছিলেন।

টিকাঃ
৩. সহীহ মুসলিম: কিতাবুল হজ। হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত জাবের রাযি.-এর বর্ণনা আছে; আর আবু দাউদ-এ হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনা আছে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হিজরত

📄 হিজরত


আজকাল হিজরতের ব্যাপারে অনেকে মনে করছেন, নিজ ঘর-বাড়ি ছেড়ে মক্কা বা মদীনায় পার হয়ে গেলেই হিজরত হয়ে যাবে। যদিও নিজ এলাকা শান্ত ও নিরাপদ আশ্রয় হয়। আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ.-কে তাবেঈগণের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় মনে করা হয়। তিনি একবার উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, হিজরতের স্বরূপ কী? তিনি বললেন,
لَا هِجْرَةَ الْيَوْمَ، كَانَ الْمُؤْمِنُوْنَ يَفِرُّ أَحَدُهُمْ بِدِيْنِهِ إِلَى اللَّهِ وَ إِلَى رَسُولِهِ مَخَافَةِ أَنْ يُفْتَنَ عَلَيْهِ فَأَمَّا الْيَوْمَ فَقَدْ أَظْهَرَ اللهُ الْإِسْلَامَ وَ الْيَوْمَ يَعْبُدُ رَبَّهُ حَيْثُ شَاءَ وَ لَكِنْ جِهَادٌ وَ نِيَّةٌ
অর্থ: এখন আর হিজরত নেই। একটা সময় ছিল যখন মানুষ ধর্ম নিয়ে ভীত ছিল, তারা বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কাছে পালিয়ে বেড়াত। কিন্তু আজ আল্লাহ ইসলামকে বিজয়ী করেছেন। মানুষ সর্বত্র নির্বিবাদে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। তবে এখন জিহাদ আছে। নিয়ত আছে।'
হযরত আয়েশা রাযি.-এর সুস্পষ্ট ভাষ্যের পর এই রহস্যেরও ভেদ হয় যে, হযরত ইবনে উমর রাযি. কেন বলতেন, لَا هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَنْحِ (অর্থ : মক্কা বিজয়ের পর হিজরত নেই')! প্রকৃতপক্ষেই মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের প্রয়োজন ছিল না; কেননা সারা দেশে তখন ধর্মীয় শান্তি বিরাজ করছিল। তবে এখনো যদি কেউ আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশিত্ব কামনা করে, অথবা আল্লাহর নবীর রওযার প্রতিবেশিত্ব কামনা করে এবং সেই নিয়তে মাতৃভূমি ছেড়ে সেখানে চলে যায় তা হলে নিয়তের সওয়াবটুকু অবশ্যই পাবে।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: বাবু হিজরাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কিতাবু মানাকিবিল আনসার। হাদীস নং ৩৯০০।
২. এই হাদীসের আরও একটি অর্থ হতে পারে, মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে হিজরত নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00