📄 মাগরিবের ফরয তিন রাকাত কেন?
হিজরতের পর যখন দু'রাকাতবিশিষ্ট নামাযকে চার রাকাত করা হলো, তখন মাগরিবের নামায তিন রাকাত করা হলো কেন? হযরত আয়েশা রাযি. এর উত্তর দিয়েছেন:
إِلَّا الْمَغْرِبِ فَإِنَّهَا وِتْرُ النَّهَارِ
অর্থ: কিন্তু মাগরিবের নামাযকে ব্যতিক্রম রাখা হলো। কেননা সেটা দিনের বিতর।'
রাতের নামাযগুলোর জন্য যেমন বিতর নামায তিন রাকাত, তেমনই দিনের নামাযগুলোর জন্যও এটাকে বিতর হিসেবে বিবেচনা করা হলো।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।
📄 ফজর নামাযকে দুই রাকাত রাখা হলো কেন?
ফজরের নামাযে বেশি মনোযোগী হওয়া যায়, সেহেতু ফজরের নামাযের রাকাত-সংখ্যা আরও বেশি করতে হতো। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বললেন:
وَصَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُوْلِ قِرَأَتِهِمَا
অর্থ: এবং ব্যতিক্রম রাখা হলো ফজরের নামায, কেননা এ নামাযে কেরাত লম্বা করা কাম্য।'
অর্থাৎ ফজরের নামাযে শরীয়ত খুশু-খুযুর বিষয়টি আরও বিশেষভাবে দেখেছে। বারবার ওঠা-বসায় এতে বিঘ্ন ঘটতে পারে, তাই এ নামাযে পরিমাণের চাহিদা বাড়ানো হলো না; কিন্তু মানের চাহিদা বাড়ানো হলো। অর্থাৎ, রাকাতের বিবেচনায় কম হলেও কেরাতের বিবেচনায় বেশি হলো。
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।
📄 আশুরার রোযার কারণ
আশুরা অর্থাৎ দশই মহররম জাহেলি যুগের লোকেরা রোযা রাখত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জাহেলি যুগে এ দিনে রোযা রেখেছেন। ইসলাম আগমনের পরও এ রোযাকে আবশ্যক রাখা হয়।
রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোযার আবশ্যকতা রহিত হয়। হযরত আব্বাস রাযি. থেকেও এ ধরনের বর্ণনা হাদীস গ্রন্থগুলোতে আছে। কিন্তু তিনি এটা বর্ণনা করেননি যে, জাহেলি যুগে এই দিন কেন রোযা রাখা হতো? হযরত আয়েশা রাযি. এর উত্তর দিয়েছেন:
كَانَ يَصُوْمُوْنَ يَوْمَ عَاشُوْرَاء قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ رَمَضَانُ وَ كَانَ يَوْمٌ تُسْتَرُ فِيْهِ الْكَعْبَةُ
অর্থ: রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পূর্বে কুরাইশরা আশুরার রোযা রাখত। কেননা এই দিনে তারা কাবাকে গেলাফ পড়াত।'
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও ইবনে মাজা-য় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে অন্য একটি বর্ণনা আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাশরীফ আনলেন। তিনি ইহুদিদেরকে দেখলেন তারা এই দিনে রোযা রাখে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ মুসা আ.-কে ফেরাউনের ওপর বিজয় দান করেছিলেন। এর স্মরণেই আমরা আজকে রোযা রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে এ রোযা রাখার অধিকার আমারই বেশি। এরপর তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং সাহাবীগণকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। আবু মুসা আশআরি রাযি. থেকে সহীহ বুখারীতে এরকমই একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীস মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ-এ আছে। আবু দাউদ ও ইবনে মাজা-য় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.- এর একটি বর্ণনা হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাকে সমর্থন করে। তাবারানি মুজামে কাবীর-এ হযরত যায়েদ রাযি. থেকে যে হাদীসটি এসেছে, তাও হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাকে সমর্থন করে। আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইহুদিদের সঙ্গে আমরা মিল রাখব না, তারা দশ তারিখে রোযা রাখে, আমরা সামনে থেকে নয় তারিখে রোযা রাখব। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাটি হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনা থেকে তিনটি দিক থেকে অগ্রাধিকার পেতে পারে: বর্ণনার আধিক্য, ইবনে উমর রাযি.-এর সমর্থন ও বিবেচনার দাবি; অর্থাৎ যদি আশুরা বা দশ মহররমের রোযা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের অনুসরণেই রাখেন তা হলে বিরোধ প্রকাশের দরকার কী ছিল? যাই হোক, বর্ণনা দুটোর সমন্বয় করা যেতে পারে এভাবে যে, মক্কায় জাহেলি যুগের লোকেরা এই দিন রোযা রাখত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও রেখে থাকবেন; এদিকে মদীনার ইহুদিরাও এই দিনে রোযা রাখে; ঘটনাক্রমে উভয় পক্ষেরই অনেক ইতিহাস ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় এলেন, তখন ইহুদিদেরকেও এদিনে রোযা রাখতে দেখলেন এবং নিজ রীতি অনুসারে রোযা রাখা অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু ইহুদিদের অনুসরণ যেহেতু কাম্য নয়, এজন্য মুসলিম ও আবু দাউদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু এই দিন রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন তখন সাহাবা কেরাম রাযি. আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ইহুদি নাসারা এই দিনটিকে বড় সম্মানের সঙ্গে পালন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে সামনে থেকে আমরা নয় তারিখে রোযা রাখব। কিন্তু পরের বছর আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত ছিলেন না। এই শেষোক্ত বাক্যটি থেকে বোঝা যায়, এটা হিজরী দশম বছরের কথা। অথচ অধিকাংশ বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম হিজরীতেই আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং নয় তারিখে রোযার নির্দেশের অর্থ এই যে, সামনে থেকে এর সঙ্গে নয় তারিখেও রোযা রাখব। অর্থাৎ নয় এবং দশ দুই দিনই রোযা রাখব।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৪।
📄 রাসুল পুরো রমযান তারাভীহ্ পড়েননি কেন?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে যে নামাযগুলো পড়তেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলতেন, সে সম্পর্কে হযরত আয়েশা রাযি.-ই সবচেয়ে নিশ্চিত জ্ঞান রাখতেন।' তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান এবং রমযানের বাইরে তেরো রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি রমযান মাসে একদিন মসজিদে নববীতে তারাবীহ পড়লেন। তাঁকে নামায পড়তে দেখে আরও কিছু লোক এসে নামাযে শরীক হলো। দ্বিতীয় দিন আরও বেশি লোক হলো। তৃতীয় দিন আরও বেশি লোক হলো। চতুর্থ দিন এত বেশি লোক হলো যে, মসজিদে নববীতে জায়গা হচ্ছিল না। কিন্তু সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর বাইরে গেলেন না। সাহাবা কেরام অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে ফিরে গেলেন। সকালবেলা তিনি সাহাবা কেরামকে বললেন,
أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّهُ لَمْ يَخَفْ عَلَيَّ مَكَانُكُمْ لَكِنِّي خَشِيْتُ أَنْ تُفْرَضَ عَلَيْكُمْ صَلَاةُ اللَّيْلِ فَتَعْجِزُوا
অর্থ : রাতে তোমাদের অবস্থানের কথা আমার জানা ছিল; কিন্তু আমার ভয় হলো যে, তোমাদের ওপর এটাকে ফরজ করে দেওয়া হতে পারে, কিন্তু তখন তোমরা পারবে না।'
কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর যেহেতু ফরজ হওয়ার আশঙ্কা কেটে গেল, তখন সাহাবা কেরাম নিয়মিতভাবে নামাযটি শুরু করলেন। যাদের ভ্রুক্ষেপ শুধু মূল হাদীসের প্রতি, তারা এটাকে মুস্তাহাব মনে করেন। আর যারা সাহাবা কেরামের অনুসরণ করতে চান, তারা এটাকে সুন্নতে মুআক্কাদা মনে করেন।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: বাবু সালাতুল লাইল।
২. সহীহ বুখারী: ....كتاب الجمعة ، باب من قال في الخطبة : أما بعد : হাদীস নং ৯২৪।