📄 বসে নামায পড়া
হাদীস থেকে বোঝা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল নামায বসে থেকেও পড়েছেন। এজন্য অনেকে বসে নফল নামায আদায় করাকেই মুস্তাহাব মনে করত। অথচ বসে নামায পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক। একজন হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বসে নামায পড়তেন? হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিলেন,
حِيْنَ حَطَمَهُ النَّاسُ
অর্থ: যখন লোকেরা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল (অর্থাৎ তিনি যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন)।
আর একটি বর্ণনায় আছে,
مَا رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي شَيْءٍ مِّنْ صَلَوةِ اللَّيْلِ جَالِسًا قَطُّ حَتَّى دَخَلَ فِي السِّنِّ
অর্থ: আমি কখনোই তাঁকে তাহাজ্জুদ নামায বসে পড়তে দেখিনি। কিন্তু যখন বয়স হয়ে গিয়েছিল, তখন পড়তেন।
দুটো বর্ণনাই আবু দাউদের বাবু সালাতিল কায়িদ অংশে আছে। সহীহ মুসলিমেও এ ধরনের কয়েকটি বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনায় আছে:
قَالَتْ لَمَّا بَدَّنَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ ثَقُلَ كَانَ أَكْثَرُ صَلَاتِهِ جَالِسًا
অর্থ: যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল, তখন অধিকাংশ নফল নামাযই বসে পড়তেন।
আলোচ্য বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপারগতায় অর্ধেক সওয়াবেই খুশি থেকেছেন। যারা সওয়াবের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন, তারা তো দাঁড়িয়েই পড়বেন। কিন্তু যারা প্রেমের পতঙ্গ, তাঁরা প্রিয়তমের নকল করাকেই শ্রেয় মনে করেন, করতে পারেন। যদি হৃদয়ের আবেগ এমনই হয়, তা হলে আশা করা যায়, বসে পড়ার কারণে সওয়াব কম হলেও, প্রেমের প্রতিদান সে ঘাটতি পূরণ করে দেবে। ইনশাআল্লাহ।
📄 মাগরিবের ফরয তিন রাকাত কেন?
হিজরতের পর যখন দু'রাকাতবিশিষ্ট নামাযকে চার রাকাত করা হলো, তখন মাগরিবের নামায তিন রাকাত করা হলো কেন? হযরত আয়েশা রাযি. এর উত্তর দিয়েছেন:
إِلَّا الْمَغْرِبِ فَإِنَّهَا وِتْرُ النَّهَارِ
অর্থ: কিন্তু মাগরিবের নামাযকে ব্যতিক্রম রাখা হলো। কেননা সেটা দিনের বিতর।'
রাতের নামাযগুলোর জন্য যেমন বিতর নামায তিন রাকাত, তেমনই দিনের নামাযগুলোর জন্যও এটাকে বিতর হিসেবে বিবেচনা করা হলো।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।
📄 ফজর নামাযকে দুই রাকাত রাখা হলো কেন?
ফজরের নামাযে বেশি মনোযোগী হওয়া যায়, সেহেতু ফজরের নামাযের রাকাত-সংখ্যা আরও বেশি করতে হতো। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বললেন:
وَصَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُوْلِ قِرَأَتِهِمَا
অর্থ: এবং ব্যতিক্রম রাখা হলো ফজরের নামায, কেননা এ নামাযে কেরাত লম্বা করা কাম্য।'
অর্থাৎ ফজরের নামাযে শরীয়ত খুশু-খুযুর বিষয়টি আরও বিশেষভাবে দেখেছে। বারবার ওঠা-বসায় এতে বিঘ্ন ঘটতে পারে, তাই এ নামাযে পরিমাণের চাহিদা বাড়ানো হলো না; কিন্তু মানের চাহিদা বাড়ানো হলো। অর্থাৎ, রাকাতের বিবেচনায় কম হলেও কেরাতের বিবেচনায় বেশি হলো。
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।
📄 আশুরার রোযার কারণ
আশুরা অর্থাৎ দশই মহররম জাহেলি যুগের লোকেরা রোযা রাখত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জাহেলি যুগে এ দিনে রোযা রেখেছেন। ইসলাম আগমনের পরও এ রোযাকে আবশ্যক রাখা হয়।
রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোযার আবশ্যকতা রহিত হয়। হযরত আব্বাস রাযি. থেকেও এ ধরনের বর্ণনা হাদীস গ্রন্থগুলোতে আছে। কিন্তু তিনি এটা বর্ণনা করেননি যে, জাহেলি যুগে এই দিন কেন রোযা রাখা হতো? হযরত আয়েশা রাযি. এর উত্তর দিয়েছেন:
كَانَ يَصُوْمُوْنَ يَوْمَ عَاشُوْرَاء قَبْلَ أَنْ يُفْرَضَ رَمَضَانُ وَ كَانَ يَوْمٌ تُسْتَرُ فِيْهِ الْكَعْبَةُ
অর্থ: রমযানের রোযা ফরজ হওয়ার পূর্বে কুরাইশরা আশুরার রোযা রাখত। কেননা এই দিনে তারা কাবাকে গেলাফ পড়াত।'
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও ইবনে মাজা-য় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে অন্য একটি বর্ণনা আছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাশরীফ আনলেন। তিনি ইহুদিদেরকে দেখলেন তারা এই দিনে রোযা রাখে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ মুসা আ.-কে ফেরাউনের ওপর বিজয় দান করেছিলেন। এর স্মরণেই আমরা আজকে রোযা রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে এ রোযা রাখার অধিকার আমারই বেশি। এরপর তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং সাহাবীগণকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। আবু মুসা আশআরি রাযি. থেকে সহীহ বুখারীতে এরকমই একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীস মুয়াত্তা, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ-এ আছে। আবু দাউদ ও ইবনে মাজা-য় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.- এর একটি বর্ণনা হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাকে সমর্থন করে। তাবারানি মুজামে কাবীর-এ হযরত যায়েদ রাযি. থেকে যে হাদীসটি এসেছে, তাও হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাকে সমর্থন করে। আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইহুদিদের সঙ্গে আমরা মিল রাখব না, তারা দশ তারিখে রোযা রাখে, আমরা সামনে থেকে নয় তারিখে রোযা রাখব। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনাটি হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বর্ণনা থেকে তিনটি দিক থেকে অগ্রাধিকার পেতে পারে: বর্ণনার আধিক্য, ইবনে উমর রাযি.-এর সমর্থন ও বিবেচনার দাবি; অর্থাৎ যদি আশুরা বা দশ মহররমের রোযা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের অনুসরণেই রাখেন তা হলে বিরোধ প্রকাশের দরকার কী ছিল? যাই হোক, বর্ণনা দুটোর সমন্বয় করা যেতে পারে এভাবে যে, মক্কায় জাহেলি যুগের লোকেরা এই দিন রোযা রাখত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও রেখে থাকবেন; এদিকে মদীনার ইহুদিরাও এই দিনে রোযা রাখে; ঘটনাক্রমে উভয় পক্ষেরই অনেক ইতিহাস ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় এলেন, তখন ইহুদিদেরকেও এদিনে রোযা রাখতে দেখলেন এবং নিজ রীতি অনুসারে রোযা রাখা অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু ইহুদিদের অনুসরণ যেহেতু কাম্য নয়, এজন্য মুসলিম ও আবু দাউদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু এই দিন রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন তখন সাহাবা কেরাম রাযি. আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, ইহুদি নাসারা এই দিনটিকে বড় সম্মানের সঙ্গে পালন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে সামনে থেকে আমরা নয় তারিখে রোযা রাখব। কিন্তু পরের বছর আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত ছিলেন না। এই শেষোক্ত বাক্যটি থেকে বোঝা যায়, এটা হিজরী দশম বছরের কথা। অথচ অধিকাংশ বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম হিজরীতেই আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং নয় তারিখে রোযার নির্দেশের অর্থ এই যে, সামনে থেকে এর সঙ্গে নয় তারিখেও রোযা রাখব। অর্থাৎ নয় এবং দশ দুই দিনই রোযা রাখব।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৪।