📄 ফজর ও আসরের পর নামায পড়ার নিষেধাজ্ঞা
বিভিন্ন হাদীসে হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ফজর ও আসরের নামায পড়ে ফেলার পর সুন্নত নফল আর কোনো নামায পড়া যাবে না। স্বাভাবিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো কারণ বুঝে আসে না। আল্লাহ তো সবসময়ই ইবাদত করতে বলেছেন। এই আশ্চর্যবোধ হযরত আয়েশা রাযি. দূর করেছেন:
وَهَمَ عُمَرُ إِنَّمَا نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الصَّلَوةِ أَنْ يَتَحَرَّى طُلُوْعَ الشَّمْسِ وَغُرُوْبَهَا
অর্থ: হযরত উমর রাযি. ভুল বুঝেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় নামায পড়তে নিষেধ করেছেন যেন লোকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখে নামায পড়ে।'
অর্থাৎ যেন সূর্যপূজার ভ্রম না হয়। অথবা সূর্যপূজারীদের উপাসনার সময় আর আমাদের ইবাদতের সময় একই—এমন ধারণার সুযোগ না থাকে। এই ধরনের আরও কিছু বর্ণনা অন্যান্য সাহাবী রাযি. থেকে সহীহ বুখারীতে বিবৃত হয়েছে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে, যদি কারও ফজরের সুন্নাত ছুটে যায়, তা হলে ফরজের পর পড়ে নেবে।' আহলে মক্কা এর ওপরই আমল করেন। আরও কিছু হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর দু'রাকাত নামায পড়তেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, তিনি কখনোই আমার ঘরে এ নামায ছাড়েননি। কতিপয় সাহাবী ও তাবেঈ এই নামাযটি পড়তেন। আবার অনেক সাহাবী বলতেন, আসলে এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব। আমরা পড়তে পারব না। হযরত উম্মে সালামা রাযি. বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসরের পরে নামায পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কীসের নামায? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যোহরের সুন্নত পড়া হয়নি, এটা সেটার কাযা।
যাই হোক, যুক্তি এবং উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের আলোকে বলা চলে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনা অধিক বোধগম্য ও ইতিবাচক। কিন্তু হযরত উমর রাযি. অবশ্যই এমন পর্যায়ের কোনো সাহাবী ছিলেন না, যিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতো শরীয়তের দাবি ও তাৎপর্য-অনুধাবনে ব্যর্থ হবেন। প্রকৃতপক্ষে, শরীয়তের একটি মূলনীতি এই যে, যখন একটি বিষয় নিষিদ্ধ হয়, তখন সতর্কতামূলকভাবে আগা-গোড়া-অনুষঙ্গ সবই নিষিদ্ধ হয়। আসলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মুহূর্তটাই মূল নিষিদ্ধ সময়; কিন্তু সতর্কতামূলকভাবে ফজর ও আসরের নামায-পরবর্তী একটি অনির্দিষ্ট সময়কালের ওপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৪।
১. তিরমিযী, কিতাবুস সালাম।
📄 বসে নামায পড়া
হাদীস থেকে বোঝা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল নামায বসে থেকেও পড়েছেন। এজন্য অনেকে বসে নফল নামায আদায় করাকেই মুস্তাহাব মনে করত। অথচ বসে নামায পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক। একজন হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বসে নামায পড়তেন? হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিলেন,
حِيْنَ حَطَمَهُ النَّاسُ
অর্থ: যখন লোকেরা তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল (অর্থাৎ তিনি যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন)।
আর একটি বর্ণনায় আছে,
مَا رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَأُ فِي شَيْءٍ مِّنْ صَلَوةِ اللَّيْلِ جَالِسًا قَطُّ حَتَّى دَخَلَ فِي السِّنِّ
অর্থ: আমি কখনোই তাঁকে তাহাজ্জুদ নামায বসে পড়তে দেখিনি। কিন্তু যখন বয়স হয়ে গিয়েছিল, তখন পড়তেন।
দুটো বর্ণনাই আবু দাউদের বাবু সালাতিল কায়িদ অংশে আছে। সহীহ মুসলিমেও এ ধরনের কয়েকটি বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনায় আছে:
قَالَتْ لَمَّا بَدَّنَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ ثَقُلَ كَانَ أَكْثَرُ صَلَاتِهِ جَالِسًا
অর্থ: যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল, তখন অধিকাংশ নফল নামাযই বসে পড়তেন।
আলোচ্য বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপারগতায় অর্ধেক সওয়াবেই খুশি থেকেছেন। যারা সওয়াবের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেন, তারা তো দাঁড়িয়েই পড়বেন। কিন্তু যারা প্রেমের পতঙ্গ, তাঁরা প্রিয়তমের নকল করাকেই শ্রেয় মনে করেন, করতে পারেন। যদি হৃদয়ের আবেগ এমনই হয়, তা হলে আশা করা যায়, বসে পড়ার কারণে সওয়াব কম হলেও, প্রেমের প্রতিদান সে ঘাটতি পূরণ করে দেবে। ইনশাআল্লাহ।
📄 মাগরিবের ফরয তিন রাকাত কেন?
হিজরতের পর যখন দু'রাকাতবিশিষ্ট নামাযকে চার রাকাত করা হলো, তখন মাগরিবের নামায তিন রাকাত করা হলো কেন? হযরত আয়েশা রাযি. এর উত্তর দিয়েছেন:
إِلَّا الْمَغْرِبِ فَإِنَّهَا وِتْرُ النَّهَارِ
অর্থ: কিন্তু মাগরিবের নামাযকে ব্যতিক্রম রাখা হলো। কেননা সেটা দিনের বিতর।'
রাতের নামাযগুলোর জন্য যেমন বিতর নামায তিন রাকাত, তেমনই দিনের নামাযগুলোর জন্যও এটাকে বিতর হিসেবে বিবেচনা করা হলো।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।
📄 ফজর নামাযকে দুই রাকাত রাখা হলো কেন?
ফজরের নামাযে বেশি মনোযোগী হওয়া যায়, সেহেতু ফজরের নামাযের রাকাত-সংখ্যা আরও বেশি করতে হতো। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বললেন:
وَصَلَاةُ الْفَجْرِ لِطُوْلِ قِرَأَتِهِمَا
অর্থ: এবং ব্যতিক্রম রাখা হলো ফজরের নামায, কেননা এ নামাযে কেরাত লম্বা করা কাম্য।'
অর্থাৎ ফজরের নামাযে শরীয়ত খুশু-খুযুর বিষয়টি আরও বিশেষভাবে দেখেছে। বারবার ওঠা-বসায় এতে বিঘ্ন ঘটতে পারে, তাই এ নামাযে পরিমাণের চাহিদা বাড়ানো হলো না; কিন্তু মানের চাহিদা বাড়ানো হলো। অর্থাৎ, রাকাতের বিবেচনায় কম হলেও কেরাতের বিবেচনায় বেশি হলো。
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১।