📄 মদীনায় ইসলামের সফলতার প্রকৃত কারণ
মদীনায় ইসলামের এই অভাবনীয় সফলতা লাভের প্রকৃত কারণ কী ছিল? এ এমন একটি প্রশ্ন, বিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসে এত উন্নতি ঘটেনি যে, একই মহিমায় এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আজকের লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীগণ যখন এ বিষয়ে কলম ধরেন, তখন সামান্য সময়ের জন্য হলেও ধরে নেন যে, তারা কোনো অসম্ভবকে সম্ভব করছেন। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, যাঁর ইঙ্গিতে সব কিছু ঘটছিল, তাঁর কৃপা-দৃষ্টিই নিয়ন্ত্রণ করছিল সবকিছু। প্রকৃত প্রস্তাবে, শত-সহস্র বাধা-বিরোধের বিপরীতে ইসলামের অভাবনীয় সাফল্য লাভ মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ—একটি মুজিযা মাত্র। আসলে এমনটা জরুরি নয় যে, মুজিযা হতে হলে সাধারণ নিয়মের বাইরে অতিপ্রাকৃতিক কিছু হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আপন অনুগ্রহে কোনো কিছু ঘটার যাবতীয় উপকরণ যথাসময়ে একত্রিত করে দেওয়াও মুজিযা—যা পৃথিবীর সব কাজে সম্ভব হয় না। তা ছাড়া, অনেক দুর্বল উদ্যোগও সফল হয়; আবার অফুরন্ত সম্ভাবনা সত্ত্বেও অনেক আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মদীনার গোত্রগুলো ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এইসব রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অধিকাংশ গোত্রেরই পালের গোদাদের বধ হয়ে যায়। আর এরাই ছিল যত বিগ্রহের মূল হোতা। গর্বে-অহঙ্কারে যে কোনো বিপ্লবে এদের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগত। তাই হয়তো বাধা হতো, নয়তো যুদ্ধ বাধাত।
আনসার গোত্রগুলো একের পর এক অবাঞ্ছিত যুদ্ধের দাবানলে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা এতটাই বিপর্যয় বোধ করেছিল যে, ইসলামের আবির্ভাবকে মোক্ষ লাভের উপায় জ্ঞান করেই এর ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। আর হোমরাচোমরার দল মরে সাফ হওয়ায় ইসলামের বিপ্লবকে বাধাগ্রস্ত করার কার্যকরী কোনো শক্তি ছিল না। এই ছিল মহান আল্লাহর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এভাবেই তিনি ইসলামের উন্নতির পথকে সুগম করেছিলেন অনেক আগ থেকেই। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন,
كَانَ يَوْمُ بُعَاثَ يَوْمًا قَدَّمَهُ اللهُ لِرَسُوْلِهِ فَقَدِمَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدِ افْتَرَقَ مَلَكُهُمْ وَقُتِلَتْ سَرَوَاتُهُمْ وَ جُرِّحُوْا قَدَّمَهُ اللَّهُ لِرَسُوْلِهِ فِي دُخُولِهِمْ فِي الْإِسْلَامِ
অর্থ: বুআস যুদ্ধের দিনটিই সেই যুগান্তকারী ঘটনা ছিল, যাতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের অনুকূলে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে গোত্রগুলোর শক্তি-সামর্থ্য ভেঙে গিয়েছিল। নেতা-নেত্রী নিহত হয়েছিল। তারা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় রাসূলের আগমন হলো। এভাবেই আল্লাহ তাঁর রাসূলের অনুকূলে তাদের ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: كتاب مناقب الأنصار، باب القسامة في الجاهلة হাদীস নং ৩৮৪৬।
📄 জুমআর দিন গোসল করা
জুমআর দিন গোসল করাকে আবশ্যক করা হয়েছিল। কেন করা হয়েছিল তার কারণ হযরত আয়েশা রাযি. বলে দিয়েছিলেন:
قَالَتْ كَانَ النَّاسُ يَنْتَابُوْنَ مِنْ مَنَازِهِمْ وَ الْعَوَالِي فَيَأْتُوْنَ فِي الْغُبَارِ تُصِيبُهُمُ الْغُبَارُ وَالْعَرَقِ فَيَخْرُجُ مِنْهُمُ الْعَرَقُ فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنْسَانٌ مِنْهُمْ وَ هُوَ عِنْدِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ أَنَّكُمْ تَطَهَّرْتُمْ لِيَوْمِكُمْ هَذَا.
অর্থ: লোকেরা নিজ নিজ বাড়ি থেকে এবং মদীনার বিভিন্ন বসতি থেকে আসত। তারা ধুলা ও ঘামে একাকার হয়ে থাকত। এভাবে একদিন একজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তিনি আমার কাছেই বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যদি তোমরা আজকে গোসল করে আসতে, তা হলে ভালো হতো।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : ا كتاب الغسل
📄 সফরে দু’রাকাত নামায
সফরে চার রাকাতবিশিষ্ট নামাযগুলো 'কসর' হিসেবে দু'রাকাত করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে মনে হয়, হয়তো সহজতা করার জন্য এমনটা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত রহস্যটি প্রকাশ করেছেন হযরত আয়েশা রাযি. :
فُرِضَتِ الصَّلَوةُ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ هَاجَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَفُرِضَتْ أَرْبَعًا وَ ترِكَتْ صَلَوةُ السَّفَرِ عَلَى الْأَوْلَى
অর্থ: মক্কায় নামায মূলত দু'রাকাতই ফরজ করা হয়েছিল। পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদীনায় চলে এলেন। তখন চার রাকাত ফরজ করা হলো। কিন্তু সফরের নামায আগের অবস্থায়ই বহাল রাখা হলো।
📄 ফজর ও আসরের পর নামায পড়ার নিষেধাজ্ঞা
বিভিন্ন হাদীসে হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, ফজর ও আসরের নামায পড়ে ফেলার পর সুন্নত নফল আর কোনো নামায পড়া যাবে না। স্বাভাবিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞার কোনো কারণ বুঝে আসে না। আল্লাহ তো সবসময়ই ইবাদত করতে বলেছেন। এই আশ্চর্যবোধ হযরত আয়েশা রাযি. দূর করেছেন:
وَهَمَ عُمَرُ إِنَّمَا نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الصَّلَوةِ أَنْ يَتَحَرَّى طُلُوْعَ الشَّمْسِ وَغُرُوْبَهَا
অর্থ: হযরত উমর রাযি. ভুল বুঝেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় নামায পড়তে নিষেধ করেছেন যেন লোকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখে নামায পড়ে।'
অর্থাৎ যেন সূর্যপূজার ভ্রম না হয়। অথবা সূর্যপূজারীদের উপাসনার সময় আর আমাদের ইবাদতের সময় একই—এমন ধারণার সুযোগ না থাকে। এই ধরনের আরও কিছু বর্ণনা অন্যান্য সাহাবী রাযি. থেকে সহীহ বুখারীতে বিবৃত হয়েছে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে, যদি কারও ফজরের সুন্নাত ছুটে যায়, তা হলে ফরজের পর পড়ে নেবে।' আহলে মক্কা এর ওপরই আমল করেন। আরও কিছু হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পর দু'রাকাত নামায পড়তেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, তিনি কখনোই আমার ঘরে এ নামায ছাড়েননি। কতিপয় সাহাবী ও তাবেঈ এই নামাযটি পড়তেন। আবার অনেক সাহাবী বলতেন, আসলে এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব। আমরা পড়তে পারব না। হযরত উম্মে সালামা রাযি. বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসরের পরে নামায পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কীসের নামায? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যোহরের সুন্নত পড়া হয়নি, এটা সেটার কাযা।
যাই হোক, যুক্তি এবং উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের আলোকে বলা চলে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনা অধিক বোধগম্য ও ইতিবাচক। কিন্তু হযরত উমর রাযি. অবশ্যই এমন পর্যায়ের কোনো সাহাবী ছিলেন না, যিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতো শরীয়তের দাবি ও তাৎপর্য-অনুধাবনে ব্যর্থ হবেন। প্রকৃতপক্ষে, শরীয়তের একটি মূলনীতি এই যে, যখন একটি বিষয় নিষিদ্ধ হয়, তখন সতর্কতামূলকভাবে আগা-গোড়া-অনুষঙ্গ সবই নিষিদ্ধ হয়। আসলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মুহূর্তটাই মূল নিষিদ্ধ সময়; কিন্তু সতর্কতামূলকভাবে ফজর ও আসরের নামায-পরবর্তী একটি অনির্দিষ্ট সময়কালের ওপরই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৪।
১. তিরমিযী, কিতাবুস সালাম।