📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ওহী গোপন করা প্রসঙ্গ

📄 ওহী গোপন করা প্রসঙ্গ


নবী-রাসূলের ব্যাপারে এমনটা কল্পনাও করা যায় না যে, তাঁরা কোনো ওহী গোপন করেছেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি কেউ কখনো বলে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কোনো বিধান থেকে সামান্য কিছুও গোপন করেছেন, তা হলে তাকে বিশ্বাস কোরো না। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ২
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ
অর্থ: হে রাসূল, আপনি পৌঁছে দিন যা আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। যদি না করেন, তা হলে আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করলেন না। (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭)
হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর দাবির স্বপক্ষে একটি বিশেষ ঘটনার আলোকেও প্রমাণ পেশ করেছেন। পৃথিবীর কেউই চায় না, তার ছোট থেকে ছোট কোনো দুর্বলতাও মানুষের সামনে প্রকাশ পাক। অথচ কুরআনে কারীমে এমন অনেক আয়াত আছে যেগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো চিন্তাগত ত্রুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তা ছাড়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ-করা জাহেলি আরবদের পক্ষে ছিল খুবই আপত্তিকর ও কটূক্তি করার মতো। কিন্তু এ ঘটনাটিও কুরআন কারীমে খোলামেলাভাবে আলোচিত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন কারীমের কোনো আয়াত গোপন করতে পারতেন, তা হলে অবশ্যই এই আয়াতটি গোপন করতেন':
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ
অর্থ: আর স্মরণ করুন, যখন আপনি বলছিলেন তাকে (পালকপুত্র যায়েদ রাযি.) যাকে করুণা করেছেন আল্লাহ, এবং করুণা করেছেন আপনি—তুমি তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। অথচ, আপনি মনের মধ্যে চাপিয়ে রাখছিলেন যা আল্লাহ শীঘ্রই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। আপনি ভয় করছিলেন মানুষকে, অথচ ভয় পাওয়ার প্রকৃত হকদার আল্লাহ। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭)
অথচ এ রকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপন করেননি। এ থেকেই বোঝা যায়, তাঁর প্রতি যত ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, সবই অক্ষরে অক্ষরে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী : .... ا باب قول الله : يا أيها الرسل بلغ ما
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩৩।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 নবী-রাসুল নিষ্পাপ

📄 নবী-রাসুল নিষ্পাপ


সূরা ইউসুফে একটি আয়াত আছে, যার কেরাতে হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর মধ্যে দ্বিমত ছিল। আয়াতটি ইবনে আব্বাস রাযি. পড়তেন এভাবে :
وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كَذِبُوا
অর্থ : নবী-রাসূল ধারণা করলেন, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ একপর্যায়ে তাদের এমন ধারণাও হয়ে গেল যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছেন এবং তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
একজন শাগরেদ হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করল, বিষয়টা কি ঠিক? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন,
مَعَاذَ اللَّهِ لَمْ تَكُنِ الرُّسُلُ تَظُنُّ ذَلِكَ بِرَبِّهَا
অর্থ : আল্লাহর পানাহ! রাসূলগণ কখনোই এমন হতে পারেন না যে তাঁরা আপন প্রতিপালক সম্পর্কে এমন ধারণা করে বসবেন।
হযরত আয়েশা রাযি. كُذِبُوا পড়তেন। এর অর্থ হলো তাঁরা কওমের লোকদের পক্ষ থেকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন হয়েছেন। অর্থাৎ—যখন আল্লাহর আজাব আসতে বিলম্ব হচ্ছিল তখন তাদের ভয় হলো যে, আজাব আসার ব্যাপারে তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রেও বুঝি এবার তাঁরা মিথ্যাপ্রতিপন্ন হবেন। কিন্তু নিরাশ হওয়ার উপক্রম হতেই আল্লাহর আজাব এসে যায়, কাফেররা ধ্বংস হয় এবং আম্বিয়া কেরাম সাহায্যপ্রাপ্ত হন。

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা ইউসুফ。
২. সহীহ বুখারী : তাফসীর-সূরা ইউসুফ。

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 রুহানী মে'রাজ বা আত্মিক উর্ধ্বগমন

📄 রুহানী মে'রাজ বা আত্মিক উর্ধ্বগমন


কিছু কিছু বর্ণনা অনুযায়ী এ বিষয়ে মতভেদ হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমন কি রুহানী ছিল, না জিসমানী ছিল? অর্থাৎ—আত্মায় হয়েছিল, না শরীরে হয়েছিল? স্বপ্নে হয়েছিল, না জেগে হয়েছিল?
কুরআন মাজীদ বিষয়টিকে স্বপ্ন অভিহিত করেছে। সূরা বনী ইসরাঈলে এসেছে:
وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِلنَّاسِ
অর্থ: আর আমি আপনাকে যে স্বপ্নটি দেখিয়েছি, তা শুধুই মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য দেখিয়েছি। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৬০)
কুরআন মাজীদ আরও একটি আয়াতে এটিকে বলেছে-রুইয়াতে কলবী বা মনের চোখে দেখা। সূরা নাজমে বলা হয়েছে:
مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى
অর্থ: তিনি মনের চোখে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাতে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেননি। (সূরা নাজম, আয়াত: ১১)
বিশুদ্ধ বর্ণনাগুলোতে স্পষ্টত এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সময় بَيْنَ الْقَائِمِ وَ النَّائِمِ ঘুমন্ত ও চেতন-এ দুয়ের মধ্যবর্তী' অবস্থায় ছিলেন। একটি বর্ণনায় মেরাজের ঘটনার আগাগোড়া বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার পর فَاسْتَيْقَظْتُ 'অতঃপর আমি জাগ্রত হলাম'-কথাটি এসেছে।
কিন্তু ইবনে ইসহাকের একটি বর্ণনায় পাই, হযরত আয়েশা রাযি. রুহানি মেরাজ তথা আত্মিক ঊর্ধ্বগমনের কথা বলতেন। অর্থাৎ তাঁর ভাষ্যমতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বর্ণিত বর্ণনাটির আরবী ভাষ্য এরূপ:
قَالَ ابْنُ إِسْحَاقَ وَ حَدَّثَنِي بَعْضُ آلِ أَبِي بَكْرٍ رَض أَنَّ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَتْ تَقُوْلُ مَا فُقِدَ جَسَدُ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ لَكِنْ أُسْرِيَ بِرُوْحِهِ
অর্থ: ইবনে ইসহাক বলেছেন, আমাকে আবু বকর রাযি.-এর পরিবারের একজন জানিয়েছেন, হযরত আয়েশা রাযি. -নবীপত্নী- বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ ঠিকই ছিল; কিন্তু তাঁর আত্মাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়।'
কাজি ইয়ায রহ. শিফা গ্রন্থে আলোচ্য বর্ণনাটির ওপর আপত্তি করেছেন।' আল্লামা কাসতালানি রহ. হুবহু তাঁর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সমালোচনার সারকথা- মেরাজ হযরত আয়েশা রাযি.-এর একদমই ছোটবেলার কথা; বরং একটি বর্ণনা অনুযায়ী তখন তাঁর জন্মই হয়নি। এজন্য এ বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য হবে না।
আমরা কাজি ইয়ায রহ.-এর এই সমালোচনা-নীতির সঙ্গে একমত হতে পারছি না। কারণ হযরত আয়েশা রাযি. থেকে এমন অনেক বর্ণনা আছে যেগুলো সকল মুহাদ্দিসের নিকটই গ্রহণযোগ্য; এমনকি তার নিকটও গ্রহণযোগ্য। অথচ বর্ণনাগুলো এমন সময়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত যখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্মই হয়নি। যেমন বলা যায়, ওহীর প্রাথমিক পর্যায়গুলো বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলোতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সূত্র ধরেই এসেছে সর্বাধিক। বরং তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলোই এ বিষয়ে বিশদ জানতে মূল ভূমিকা পালন করে। সুতরাং কাজি ইয়ায রহ.-এর সমালোচনা-নীতিটি গৃহীত হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর শুধু এই হাদীসটিই নয়; ওহী সংক্রান্ত সবগুলো হাদীসই সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। কেননা মেরাজের তুলনায় এগুলো তাঁর জন্মের আরও আগের ঘটনা।
প্রকৃতপক্ষে, যেমনটি আল্লামা যুরকানী, ইবনে ওয়াহাব ও ইবনে সারিহ স্পষ্ট করেছেন, আলোচ্য বর্ণনাটি হযরত আয়েশা রাযি. থেকে প্রমাণিতই নয়।' কেননা এর বিবরক হলেন ইবনে ইসহাক। তিনি নিজেই কতিপয় মুহাদ্দিসের নিকট যঈফ (দুর্বল)। আবার মূল বিবরকের নামটিও উল্লেখ করেননি। শুধু বলেছেন, আবু বকর রাযি.-এর পরিবারের একজন সদস্য। আবার সেই বিবরকও সরাসরি হযরত আয়েশা রাযি.-এর নাম উল্লেখ করে বসেছেন। অথচ ইবনে ইসহাকের সমসাময়িক হতে হলে তার এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাঝখানে আরও একজন বিবরণের প্রয়োজন হবে। এ কারণেই মূলত, আলোচ্য হাদীসটি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

টিকাঃ
১. সীরাতে ইবনে হিশাম : ا ذكر الإسراء
2. خفاجي على الشفاء : ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩০৪।
৩. যুরকানী: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ন্যায়নিষ্ঠ সাহাবা কেরাম

📄 ন্যায়নিষ্ঠ সাহাবা কেরাম


আহলুস সুন্নাহ মনে করেন, সাহাবা কেরام রাযি. সকলে সর্ব দিক থেকে ন্যায়নিষ্ঠ ছিলেন। বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন। তাঁদের প্রতি উম্মতের কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। হযরত উসমান রাযি.-এর হৃদয়বিদারক ঘটনার পর হযরত আলী রাযি. এবং হযরত মুআবিয়া রাযি.-এর রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে মিশর, ইরাক ও সিরিয়ার লোকেরা একে অপরের পক্ষাবলম্বী ও হিতাকাঙ্ক্ষী সাহাবা কেরামের সমালোচনা করত, গাল-মন্দ ও অভিশাপ-অভিশম্পাত করত। হযরত আয়েশা রাযি. এটাকে কুরআন মাজীদের নির্দেশের পরিপন্থী মনে করতেন, সেই সঙ্গে প্রমাণ পেশ করতেন। তিনি বলেন,
يَا ابْنَ أُخْتِي، أُمِرُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِأَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَبُّوا
অর্থ: ভাগ্নে, তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল যে, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে; অথচ তারা তাঁদের গালাগালি শুরু করেছে।'
হযরত আয়েশা রাযি. পবিত্র কুরআনের যে আয়াত থেকে এই নির্দেশটি উদ্ঘাটন করেছিলেন, তা আনসারি ও মুহাজির সাহাবীগণের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আয়াতটি এই:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
অর্থ: আর তাদের (সাহাবীদের) পরে যে প্রজন্মটি আসবে তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন এবং (ক্ষমা করুন) আমাদের ওই সব ভাইদের যারা আমাদের পূর্বে বিগত হয়েছেন। হে আমাদের প্রতিপালক, যারা ঈমান এনেছেন তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। নিঃসন্দেহে আপনি পরম করুণাময়, চির দয়ালু। (সূরা হাশর, আয়াত: ১০)

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: কিতাবুত তাফসীর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00