📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রসঙ্গ

📄 আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রসঙ্গ


হিজরী দ্বিতীয় শতকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মৃত্যুর অনেক পরে-আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রসঙ্গটি সারা ইসলামী জাহানে আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহর হাত, পা, চোখ ইত্যাদি বিভিন্ন অঙ্গের উল্লেখ এসেছে। প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়াল-এগুলো কি মূল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, না রূপক অর্থে? আরও স্পষ্ট করে, আল্লাহর হাত বলতে কি আল্লাহর হাতই বুঝব, না আল্লাহর কুদরত? অনুরূপ, আল্লাহর চোখ বলতে কি আল্লাহর চোখই বুঝব, না আল্লাহর জ্ঞান ইত্যাদি? সাহাবা কেরام রাযি. থেকে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। তবে সালাফে সালিহীন—আমাদের অনুসরণীয় পূর্বসূরিগণ—বিশ্বাস করতেন, কিতাব ও সুন্নাহয় বিধৃত মহান আল্লাহর যাবতীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইয়াকীন রাখতে হবে, এগুলোর মূল ও আভিধানিক অর্থের প্রতিও ঈমান রাখতে হবে; তবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে যাওয়া যাবে না। ধারণা করা হয়, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিশ্বাসও এমনই হবে। কেননা সহীহ বুখারীতে তাঁর সম্পর্কে একটি বাক্য এমন পাওয়া যায়:
الْحَمْدُ لِلهِ الَّذِي وَسِعَ سَمْعَ الْأَصْوَاتِ
অর্থ: প্রশংসা ওই আল্লাহর, যাঁর শ্রবণ-শক্তি সকল স্বর ও শব্দকে ধারণ করেছে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আল্লাহর দর্শন-লাভ

📄 আল্লাহর দর্শন-লাভ


মুতাযিলা সম্প্রদায় ও তাদের ভাবধারার লোকেরা বিশ্বাস করেন, না এই পৃথিবীতে কেউ আল্লাহর দর্শন লাভ করতে পারে, না আখেরাতে। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমান শুধু এর সম্ভাবনারই নন, বরং বাস্তবতারও প্রবক্তা। সত্যান্বেষী মুসলিমসম্প্রদায় বিশ্বাস করেন, আল্লাহর দর্শন লাভ মায়ার পৃথিবীতে চর্মচোখে সম্ভব না হলেও আখেরাতে পূর্ণিমার চাঁদ যেভাবে সকলে একসঙ্গে দেখতে পারে, সেভাবেই আল্লাহর দর্শন লাভ করা যাবে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. থেকে খুবই সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। তিনি তাঁর শিক্ষানবিশদের বলেছিলেন, যদি কেউ বলে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে দেখেছেন, তা হলে সে অবশ্যই মিথ্যা বলে। এই দাবির স্বপক্ষে তিনি কুরআন মাজীদের দুটো আয়াত প্রমাণস্বরূপ পেশ করেন। মুতাযিলা সম্প্রদায় আজ পর্যন্ত এরচেয়ে শক্তিশালী আর কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। প্রথম আয়াতটি হলো:
لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
অর্থ: দৃষ্টি-শক্তি তাঁকে ধরতে পারে না; কিন্তু তিনি দৃষ্টি- শক্তিকে ধরতে পারেন। তিনি চিরসূক্ষ্ম, চিরজ্ঞাত। (সূরা আনআম, আয়াত: ১০৩)
অর্থাৎ তিনি যেহেতু চিরসূক্ষ্ম, এজন্য কোনো দৃষ্টিশক্তিই তাঁকে ধরতে পারে না; আবার তিনি যেহেতু চিরজ্ঞাত, এজন্য সবকিছুই তিনি ধরতে পারেন।
দ্বিতীয় আয়াতটি হলো:
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيَا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
অর্থ: কোনো মানুষেরই এই শক্তি নেই যে, সে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলবে; তবে ওহীর মাধ্যমে, কিংবা পর্দার অন্তরালে। (সূরা শুরা, আয়াত: ৫১)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলতেন, রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের রজনীতে আল্লাহর দিদার (দর্শন) লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর দাবির স্বপক্ষে সূরা নাজমের কয়েকটি আয়াত তুলে ধরেন:
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى
অর্থ: তিনি তাঁকে আরও একবার প্রকট হতে দেখেছেন। (সূরা নাজম, আয়াত: ১৩)
لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
অর্থ: তিনি তাঁর রবের সবচেয়ে বড় নিদর্শনগুলো প্রত্যক্ষ করলেন। (সূরা নাজম, আয়াত: ১৮)
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এখানে আল্লাহকে দেখার কথা বলা হয়নি; বরং জিবরীল আ.-কে দেখার কথা বলা হয়েছে। কুরআন মাজীদের বাণীসমূহের ধারাপ্রবাহে মনোনিবেশ করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়:
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى
অর্থ: তাকে তা শিখিয়েছেন-যিনি প্রবল শক্তির অধিকারী, সহজাত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী; একদিন তিনি প্রকট হলেন, তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ দিগন্তে; অতঃপর তিনি কাছে এলেন, এবং আরও কাছে এলেন-দুই ধনুকের সমান কাছে; বরং তারচেয়ে কাছে। তখন তিনি তার বান্দার অন্তরে প্রক্ষেপণ করলেন, যা করার ছিল। তিনি মনের চোখে যা দেখেছেন, তাতে মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি যা প্রত্যক্ষ করেন, সে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ কর? তিনি তাকে আরও একবার প্রকট হতে দেখেছেন-'সিদরাতুল মুস্তাহা'-র নিকটে। (সূরা নাজম, আয়াত: ৫-১৪)
এই বর্ণনাগুলোর ভিত্তিতে মুতাযিলা সম্প্রদায় মনে করেন, হযরত আয়েশা রাযি. আল্লাহর দর্শন লাভের প্রবক্তা ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হযরত আয়েশা রাযি. পৃথিবীতে আল্লাহর দর্শনলাভকে অস্বীকার করলেও আখেরাতে আল্লাহর দর্শনলাভকে অস্বীকার করেননি। কেননা তাঁর বক্তব্য ছিল এই:'
مَنْ حَدَّثَكَ أَنَّ مُحَمَّدًا رَأَى رَبَّهُ فَقَدْ كَذَبَ
অর্থ: যে বলেছে, মুহাম্মাদ তাঁর রবকে দেখেছে, সে মিথ্যা বলেছে।
তিনি ইহকালে মেরাজের রজনীতে আল্লাহর দর্শনলাভকে অস্বীকার করলেন, কিন্তু পরকালে আল্লাহর দর্শনলাভকে কোথায় অস্বীকার করলেন? হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্য থেকে আল্লাহর দর্শনলাভের বিষয়টি একেবারে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত হয় না।

টিকাঃ
১. আলোচ্য বর্ণনাগুলোর জন্য সহীহ বুখারী ও জামে তিরমিযী: তাফসীর সূরা নাজম, এবং মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪১ দ্রষ্টব্য।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 গায়ে জানা প্রসঙ্গ

📄 গায়ে জানা প্রসঙ্গ


অদৃশ্য-জগতের কথা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। গায়েব জানা বা অদৃশ্যে জ্ঞাত হওয়া একমাত্র আল্লাহর শান। কুরআন মাজীদে আছে :
عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ
অর্থ : তিনি দৃশ্য-অদৃশ্যের জ্ঞানী। (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৯৩)
আরও একটি আয়াতে আছে:
لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ
অর্থ : আকাশমণ্ডলীতে এবং পৃথিবীতে (যত কিছু এবং) যত কেউ আছে, কেউই অদৃশ্যে জ্ঞাত নয়। শুধুমাত্র আল্লাহ অদৃশ্যে জ্ঞাত। (সূরা নামল, আয়াত: ৬৫)
অনেকে মনে করেন, গায়েব জানা বা অদৃশ্যের অবগতি নবী- রাসূলেরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হযরত আয়েশা রাযি. এ বিষয়টিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, যদি কেউ বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব জানতেন তা হলে সে মিথ্যাবাদী। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর স্বপক্ষে কুরআন মাজীদের আয়াত উপস্থাপন করতেন:'
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَا ذَا تَكْسِبُ غَدًا
অর্থ : কেউই জানে না কাল সে কি করবে? (সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪)
যদি কেউই না জানে, তা হলে রাসূল জানবেন কীভাবে? এই আয়াত থেকে গায়বের ইলম বা অদৃশ্যের জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে নাকচ করা হচ্ছে।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে, কয়েকটি শিশুকন্যা গান গাইছিল, তাদের গানের একটি কলি ছিল :
وَ فِيْنَا نَبِيٌّ يَعْلَمُ مَا فِي غَدٍ
অর্থ: আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন কাল কী হবে?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অ্যাই অ্যাই..., এসব বোলো না, আগে যা গাইছিলে তা-ই গাও।'
আলোচ্য ঘটনা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেই তাঁর পুরোপুরি গায়েব জানার দাবিটি নাকচ হয়ে যায়। তবে এ কথা অবশ্যই সত্য যে, কোনো কল্যাণ ও প্রজ্ঞার দাবিতে অনেক সময় আল্লাহ তায়ালা অদৃশ্য-জগতের অনেক বিষয় নবী-রাসূলকে অবহিত করতেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা নাজম।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুন নিকাহ।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ওহী গোপন করা প্রসঙ্গ

📄 ওহী গোপন করা প্রসঙ্গ


নবী-রাসূলের ব্যাপারে এমনটা কল্পনাও করা যায় না যে, তাঁরা কোনো ওহী গোপন করেছেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি কেউ কখনো বলে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কোনো বিধান থেকে সামান্য কিছুও গোপন করেছেন, তা হলে তাকে বিশ্বাস কোরো না। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ২
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ
অর্থ: হে রাসূল, আপনি পৌঁছে দিন যা আপনার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। যদি না করেন, তা হলে আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করলেন না। (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭)
হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর দাবির স্বপক্ষে একটি বিশেষ ঘটনার আলোকেও প্রমাণ পেশ করেছেন। পৃথিবীর কেউই চায় না, তার ছোট থেকে ছোট কোনো দুর্বলতাও মানুষের সামনে প্রকাশ পাক। অথচ কুরআনে কারীমে এমন অনেক আয়াত আছে যেগুলোতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো চিন্তাগত ত্রুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তা ছাড়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিবাহ-করা জাহেলি আরবদের পক্ষে ছিল খুবই আপত্তিকর ও কটূক্তি করার মতো। কিন্তু এ ঘটনাটিও কুরআন কারীমে খোলামেলাভাবে আলোচিত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন কারীমের কোনো আয়াত গোপন করতে পারতেন, তা হলে অবশ্যই এই আয়াতটি গোপন করতেন':
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ
অর্থ: আর স্মরণ করুন, যখন আপনি বলছিলেন তাকে (পালকপুত্র যায়েদ রাযি.) যাকে করুণা করেছেন আল্লাহ, এবং করুণা করেছেন আপনি—তুমি তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। অথচ, আপনি মনের মধ্যে চাপিয়ে রাখছিলেন যা আল্লাহ শীঘ্রই প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। আপনি ভয় করছিলেন মানুষকে, অথচ ভয় পাওয়ার প্রকৃত হকদার আল্লাহ। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭)
অথচ এ রকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপন করেননি। এ থেকেই বোঝা যায়, তাঁর প্রতি যত ওহী অবতীর্ণ হয়েছে, সবই অক্ষরে অক্ষরে উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী : .... ا باب قول الله : يا أيها الرسل بلغ ما
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00