📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সুনানের প্রকারভেদ

📄 সুনানের প্রকারভেদ


ফিকহের একটি অতি সূক্ষ্ম বিষয় এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে আচরণ-উচ্চারণ ও কর্মগুলো প্রকাশ পেয়েছিল, সেগুলোর কোনোটি ছিল শরীয় বিধান হিসেবে, কোনোটি নিছক অভ্যাস হিসেবে, আবার কোনোটি শুধু বিশেষ কোনো কল্যাণের দিকে লক্ষ রেখে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে কর্ম প্রকাশিত হয়েছে তাকে সুন্নাত বলে। ফিকহবিদগণ প্রথমত এই সুন্নাতকে দুটো প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন : ইবাদি ও আদি। ইবাদি সুন্নাত বলা হয় ওই সমস্ত কর্মকে যেগুলো তিনি করেছেন সওয়াবের নিয়তে ইবাদত হিসেবে। সুন্নাতে ইবাদি আবার দুই প্রকার : মুআক্কাদা ও মুসতাহাব্বা। মুআক্কাদা বলা হয় যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় করেছেন, কখনো তরক করেননি। আর মুসতাহাব্বা বলা হয় যেগুলো মাঝেমধ্যে তরকও করেছেন।
সুন্নাতে আদি হলো ওই সমস্ত কর্ম যেগুলো তিনি সওয়াবের আশায় ইবাদত হিসাবে করেননি; বরং অভ্যাসগত কারণে, কিংবা ব্যক্তিগত বা সাময়িক প্রয়োজনে করেছেন। উম্মতের ওপর সুন্নাতে আদির অনুসরণ জরুরি নয়। তবে ভালোবাসা জিনিসটা অন্যরকম। প্রিয়তমের অভ্যাসের অনুকরণও প্রেমেরই প্রকাশ। এজন্যই কবি বলেছেন:
ہر ادا محبوب کی محبوب ہی
অর্থ: প্রিয়তমের সব কিছুই প্রিয় লাগে।
বিভিন্ন হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়, হযরত আয়েশা রাযি. নিজেও ফিকহবিদগণের অনেক আগেই এই মূলনীতিটি হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলেন। তারাবীর নামাযের ব্যাপারে তিনি—এবং একমাত্র তিনিই শুধু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে তিন দিন জামাত করে তারাবী পড়িয়েছিলেন। চতুর্থ দিন তিনি আর এলেন না। সকাল বেলা সাহাবা কেরামকে বললেন, আমি এজন্য আসিনি যে, আমার ভয় হচ্ছিল, এই নামায না ফরজ করে দেওয়া হয়। এ থেকে জানা যায়, হযরত আয়েশা রাযি. অনেক আগেই জেনেছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজটি নিয়মিতভাবে করবেন, তা জরুরি হয়ে পড়বে; আর যে কাজটি কখনো ছেড়ে দেবেন, তা এত গুরুতরতা ও আবশ্যকতার পর্যায়ে পৌঁছবে না।
সাহাবা কেরামের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. সুনানে আদি ও ইবাদির পার্থক্য করতেন না। তাঁর দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজটি করেছেন-যখনই করুন, আর যে কারণেই করুন-সুন্নাত। এজন্য তিনি সফরের বিভিন্ন মনজিলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতেন। এমনকি, যদি কোনো মনজিলে তিনি ওযু করতেন তা হলে তিনিও তাঁর অনুসরণে ওযু করতেন, প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এ সকল পার্থক্য খেয়াল করতেন। হজে ওয়াদিল আবতাহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবু ফেলেছিলেন। তারা এটাকে সুন্নাত মনে করতেন না। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে আছে,
نُزُولُ الْأَبْطَحِ لَيْسَ بِسُنَّةٍ إِنَّمَا نَزَلَهُ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَنَّهُ كَانَ أَسْمَحَ لِخُرُوجِهِ إِذَا خَرَجَ
অর্থ: আবতাহে অবতরণ করা সুন্নাত নয়; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে অবতরণ করেছিলেন সফরে সুবিধা হয়, তাই।'

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, كتاب الحج، باب الغصب : ১৭৬৫। সহীহ মুসলিম, كتاب الحج، باب استحباب نزول العدو : المحصب

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সমসাময়িকদের সঙ্গে মতভেদের তালিকা

📄 সমসাময়িকদের সঙ্গে মতভেদের তালিকা


হযরত আয়েশা রাযি. অসংখ্য ফিকহী মাসআলায় সমসাময়িকদের সঙ্গে মতভেদ করেছেন এবং সত্য তাঁকে সঙ্গ দিয়েছে। হেজাজের ফিকহবিদগণ অধিকাংশ বিষয়ে সে অনুযায়ীই আমল করেছেন। আমরা এ ধরনের উল্লেখযোগ্য কিছু মাসআলার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা জামে তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছি:
| ক্রম | হযরত আয়েশা রাযি.-এর অভিমত | অন্যান্য সাহাবা কেরাম রাযি.-এর অভিমত |
|---|---|---|
| ১ | থুথুতে ওযু ভাঙে না। | ইবনে উমর রাযি. ভাঙে। |
| ২ | জানাযা-বহনে ওযু ভাঙে না। | আবু হুরায়রা রাযি. ভাঙে। |
| ৩ | গোসলে নারীর খোঁপা খোলা জরুরি নয়। | ইবনে উমর রাযি. জরুরি। |
| ৪ | শুধু মিলনেই গোসল ওয়াজিব হয়। | জাবের রাযি. : স্খলন শর্ত। |
| ৫ | 'কুরু' অর্থ তুহুর-পবিত্রতা। | অন্যান্য-হায়েয (ঋতু/মাসিক)। |
| ৬ | মাইয়েতকে গোসল করালে গোসল ওয়াজিব হয় না | আবু হুরায়রা রাযি.-ওয়াজিব হয়। |
| ৭ | নারী-মাইয়েতের চুল আঁচড়ানো যাবে না।' | উম্মে আতিয়‍্যা রাযি.-যাবে। |
| ৮ | নামাযে নারী সামনে এলে নামায নষ্ট হয় না। | আবু হুরায়রা রাযি. নামায নষ্ট হয়। |
| ৯ | ফজরের নামায অন্ধকার থাকতে পড়া উচিত। | রাফে ইবনে খাদিজ রাযি.-ফরসা হলে পড়া উচিত। |
| ১০ | আসরের নামায তাড়াতাড়ি পড়তে হবে। | উম্মে সালামা রাযি. বিলম্বে পড়তে হবে। |
| ১১ | মাগরিবের নামায তাড়াতাড়ি পড়তে হবে। | আবু মুসা রাযি. বিলম্বে পড়তে হবে। |
| ১২ | নাপাক অবস্থায় সকাল করলে রোযা নষ্ট হয় না। | আবু হুরায়রা রাযি. নষ্ট হয়। |
| ১৩ | ইফতার তাড়াতাড়ি করতে হবে। | আবু মুসা রাযি. বিলম্বে করতে হবে। |
| ১৪ | কুরবানির গোশত তিন দিনের বেশিও খাওয়া যাবে। | আলী রাযি. ও ইবনে উমর রায়.-না। |
| ১৫ | হজে ওয়াদিয়ে মাহসাবে অবতরণ সুন্নাত নয়। | ইবনে উমর রাযি.-সুন্নাত। |
| ১৬ | হজে মাথা মুণ্ডানোর পর সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে। | ইবনে উমর রাযি.-যাবে না। |
| ১৭ | কাবায় কোরবানি পাঠালে প্রেরণকারীর ওপর হজের বিধান আরোপিত হয় না। | ইবনে আব্বাস রাযি.-হয়। |
| ১৮ | হজে ঋতুবতী নারীকে বিদায়ি তাওয়াফের অপেক্ষা করতে হবে না। | উমর রাযি.-অপেক্ষা করতে হবে।' |
| ১৯ | হজে নারী জাফরানি কাপড় পরতে পারবে। | উমর রাযি.-মাকরূহ হবে।' |
| ২০ | হজে নারীর জন্য সামান্য চুল ছাঁটাই যথেষ্ট। | ইবনে যুবায়ের রাযি.-কমপক্ষে চার আঙ্গুল কাটা জরুরি। |
| ২১ | অলঙ্কারে যাকাত নেই (একটি বর্ণনা অনুযায়ী)। | যাকাত আছে। |
| ২২ | এতিম ও নাবালেগের মালেও যাকাত আছে। | ইবনে মাসউদ রাযি.-নেই। |
| ২৩ | গর্ভবতী বিধবা হলে ইদ্দতের সময়কাল হলো গর্ভপাতের সময়কাল। | ইবনে আব্বাস রাযি.-গর্ভপাত ও বৈধব্যের যে সময়টি বেশি হবে সেটিই হবে ইদ্দতের সময়কাল। |
| ২৪ | তালাকের ইচ্ছাধিকার প্রাপ্ত স্ত্রী তালাক না নিলে কোনো তালাকই হবে না। | আলী রাযি. ও ইবনে সাবেত রাযি.-এক তালাক হবে। |
| ২৫ | বালেগ মানুষও কারও দুধ পান করলে মাহরাম হবে। | অন্য উম্মাহাতুল মুমিনীন- হবে না।' |
| ২৬ | রেযাআত হবে কমপক্ষে পাঁচ ফোঁটা দুধ পান করলে। | অন্যান্য'-এক ফোঁটা দুধও যথেষ্ট। |
| ২৭ | গোলামের ওপর যদি একটি দানাও ধার্য হয় তবু মুকাতাব হবে। | যায়দ ইবনে সাবেত রাযি.- এক দিরহামের কম হলে মুকাতাব হবে না। |
| ২৮ | চোরাই মালের মূল্য তিন দিরহামের কম হলেও চোরের হাত কাটা যাবে।' | ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি.-কমপক্ষে দশ দিরহাম হতে হবে।' |
| ২৯ | যদি জোরপূর্বক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ানো, কিংবা গোলাম আজাদ করানো হয়, তা হলে স্ত্রীও তালাক হবে না; গোলামও আজাদ হবে না। | হানাফী ইমামগণ বলেন— তালাক ও আজাদ হয়ে যাবে। |
| ৩০ | তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীও ইদ্দতের সময় স্বামীর ঘরে থাকবে। | ফাতেমা বিনতে কায়স রাযি.-স্বামীর ঘরে থাকবে না। |
| ৩১ | মিরাসে দুই মেয়ে, এক নাতনী ও এক নাতী থাকলে এক তৃতীয়াংশ মেয়েরা ও একতৃতীয়াংশ নাতী-নাতনী মিলে পাবে। | ইবনে মাসউদ রাযি.- অবশিষ্টাংশ শুধু নাতী পাবে, নাতনী পাবে না। |
যাই হোক, ফিকহের জগতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবদান অপরিসীম। সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেগুলোর প্রতি পূর্ণাঙ্গ আলোকপাত সম্ভব নয়। ইমাম মালেক রহ. উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর রেখে যাওয়া ফিকহী মাসআলাগুলোর একটি বিরাট অংশ সংরক্ষণ করতে পেরেছেন অনবদ্য মুয়াত্তায়। মদীনাবাসী মুসলমানদের পক্ষে এই মহামূল্যবান বর্ণনাগুলোই ফিকহের মূল ভিত্তি।

টিকাঃ
১. আহনাফের ফতোয়া হযরত আয়েশা রাযি.-এর কওলের ওপর। হেদায়া : কিতাবুল জানাইয, আবদুর রাযযাকের উদ্ধৃতিতে। হযরত উম্মে আতিয়া রাযি.-এর হাদীসটি অধিকাংশ সিহাহগ্রন্থেই আছে।
১. মুয়াত্তা ও যুরকানী। باب ما يلبس المحرم من الثياب :۱
১. ঘটনা এই যে, সাহাবী হযরত আবু হুযায়ফা রাযি.-এর সালেম নামক একটি নাবালেগ গোলাম ছিলেন, যিনি ইসলামের ইতিহাসে মাওলায়ে আবি হুযায়ফা রাযি. (হুযায়ফা রাযি.-এর আজাদকৃত গোলাম) নামে পরিচিত। তিনি ছোটবেলা থেকেই তার মনিবের ঘরেই থাকতেন এবং অন্দরেও তার অবাধ বিচরণ ছিল। হযরত হুযায়ফা রাযি.-এর স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল তার সাথে পর্দা করতেন না। কিন্তু যখন হযরত সালেম রাযি. বড় হয়ে গেলেন তখন তার সঙ্গে স্ত্রীর পর্দা না করার বিষয়ে হযরত আবু হুযায়ফা রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হতেন। এক পর্যায়ে হযরত সাহলা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার সালেম বড় হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি, তার সঙ্গে পর্দা না করার বিষয়ে আবু হুযায়ফা রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হচ্ছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সালেমকে দুধ খাইয়ে দাও, তা হলে আবু হুযায়ফার অসন্তোষ কেটে যাবে। হযরত সাহলা রাযি. তা-ই করলেন। এবং বাস্তবেও হযরত আবু হুযায়ফা রাযি. ঠিক হয়ে গেলেন। এই ঘটনার ভিত্তিতেই হযরত আয়েশা রাযি. মনে করতেন, বালেগ শিশুকেও যদি কোনো মহিলা দুধ পান করায় তা হলে হুরমতে রেযাআত অর্থাৎ মাহরামের সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। কিন্তু পবিত্র স্ত্রীগণ অন্য সকলে এটাকে হযরত সাহলা রাযি. ও সালেম রাযি.-এর জন্য বিশেষ ছাড় বলে মনে করতেন। তাঁদের দৃষ্টিতে অন্য কারও জন্য এ অনুমতি নেই। ইমাম দাউদ যাহিরি রহ. ছাড়া সকল ইমাম আলোচ্য মাসআলায় পবিত্র স্ত্রীগণের মতকেই গ্রহণ করেছেন। অন্যান্য সহীহ হাদীসের আলোকেও প্রমাণিত যে, হুরমত সাব্যস্ত হবে শুধু শিশু অবস্থায় দুধ পান করলে। কুরআনেও দুধপানের মেয়াদ আছে দু-বছর। এ জন্য জমহুর ফুকাহা কেরাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ মতটিকে সমর্থন করেননি (শরহে সহীহ মুসলিম, নববী: বাবু রিযাআতিল কাবির)।
২. সহীহ বুখারী : ا كتاب العنق
৩. নাসাঈ-তে আছে হযরত আলী রাযি. এবং হযরত ইবনে মাসউদ রাযি.-এর মাযহাবও এটি।
১. সহীহ বুখারী : السرفة والحدود
২. দারাকুতনী, كتاب الحدود। মুসনাদে আহমাদ : اكتاب الجنائز
৩. و لا إعتاق في إغلاق ৩ অর্থ: জোরপূর্বক তালাক ও ইতাক হয় না [আবু দাউদ: كتاب الطلاق ২১৯৩]।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00