📄 হাদীস শরীফ থেকে উস্দাতন
কুরআন মাজীদের পর হাদীস শরীফের অবস্থান। একবার একটি মাসআলা দেখা দিল, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দেয়, আর স্ত্রী সেই ইচ্ছাধিকার গ্রহণ না করে স্বামীকেই গ্রহণ করে, তা হলে স্ত্রীর ওপর কোনো তালাক আপতিত হবে কি না? হযরত আলী রাযি. এবং হযরত যায়েদ রাযি.-এর দৃষ্টিতে এক তালাক আপতিত হবে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এ অবস্থায় কোনো তালাকই আপতিত হবে না। তিনি তাঁর সমাধানের পক্ষে তাখঈরের ঘটনাটি তুলে ধরেন। মহান আল্লাহ পবিত্র স্ত্রীগণকে ইচ্ছাধিকার দিয়েছিলেন—তাঁরা ইচ্ছা করলে পার্থিব সুখ-শান্তি গ্রহণ করতে পারেন, ইচ্ছা করলে নবীপরিবারের অভাব-অনটন বরণ করতে পারেন। পবিত্র স্ত্রীগণ সকলে দ্বিতীয় বিকল্পটিই গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের কারও ওপর এক তালাকও আপতিত হয়নি।'
মনিব যদি গোলামকে আজাদ করে দেন, তা হলে মনিব ও গোলামের মধ্যে এক ধরনের অভিভাবকত্ব স্থাপিত হয়। এই অভিভাবকত্বের ফলে উত্তরাধিকারও সাব্যস্ত হয়। এমনকি, গোলামকে মনিবের বংশীয় বিবেচনা করে আইনি সম্মানও প্রদান করা হয়। এ কারণে গোলাম ও মনিবের অভিভাবকত্বের বিষয়টি তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাই হোক, এক গোলাম এসে বলল, আমি উতবা ইবনে আবু লাহাবের গোলাম ছিলাম। তারা স্বামী-স্ত্রী আমাকে বেচে দিয়েছিল। কিন্তু শর্ত করেছিল, আমার অভিভাবকত্ব-সম্বন্ধ থাকবে তাদের সঙ্গে। এখন আমার সম্বন্ধটি কার সঙ্গে হবে? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, বারীরাহ রাযি.-এর ঘটনাটা এমনই ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, বারীরা রাযি.-কে খরিদ করে আজাদ করে দাও। অভিভাবকত্ব তোমারই থাকবে। ক্রেতা-বিক্রেতা যত অবৈধ শর্তই আরোপ করুক না কেন।'
হযরত বারীরাহ রাযি. একজন দাসী ছিলেন। তার আগের মনিব এই শর্তে তাকে বিক্রি করতে রাজি হয়েছিল যে, অভিভাবকত্ব-সম্বন্ধ থাকবে তার সঙ্গে। বারীরাহ রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে আসেন এবং বিষয়টি ব্যক্ত করেন। তিনি কিনতে রাজি হন; কিন্তু শর্তটা মেনে নিতে পারছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলে বিষয়টি উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, নির্দ্বিধায় কিনে ফ্যালো এবং আজাদ করে দাও। অবৈধ শর্ত আপনা-আপনি হাওয়া হয়ে যাবে। হযরত বারীরাহ রাযি. আজাদ হয়ে গেলেন। এরপর দাসী অবস্থায় যে স্বামীর অধীনে ছিলেন তাকে ত্যাগ করলেন। লোকে তাকে সদকা করত, তিনি সেগুলো গ্রহণ করতেন। কখনো কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও কিছু খেতে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই খাবার ফেরত দিতেন না।
এ বিষয়গুলো থেকে হযরত আয়েশা রাযি. কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, বারীরাহ রাযি.-এর ওসিলায় ইসলামে তিনটি বিধান সুবিদিত হয়েছে:'
১. অভিভাবকত্ব থাকবে আজাদকারীর সঙ্গে।
২. দাসী থাকাকালে যদি কোনো বাঁদির বিবাহ হয় এবং পরে বাঁদি আজাদ হয় তা হলে দাস স্বামীর অধীনে থাকা না থাকার ইচ্ছাধিকার তার হাতে।
৩. যদি সদকার হকদার ব্যক্তি কোথাও থেকে সদকা পেয়ে সদকার হকদার নয় এমন কাউকে সেটা হাদিয়া দেয়, তা হলে সেটা গ্রহণ করা সেই ব্যক্তির জন্য বৈধ হবে; অর্থাৎ মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বস্তুটির গুণগত পরিবর্তনও ঘটবে।
হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক কিছু কিছু ইসতিমবাত বা উদ্ঘাটন এমন আছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা বা বিশদ বিবরণ তিনি নিজে দেননি। কিন্তু তাঁর ফতোয়ার ধারাবাহিকতায় সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত হয়ে গেছে। ধর্মতত্ত্ববিদ ও গবেষকগণ সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বড় বড় ইমারত গড়ে তুলেছেন। বিদায় হজে প্রায় এক লাখ মুসলমান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। বড় বড় সাহাবা কেরামও ছিলেন। এই সফরে যত কিছু ঘটেছিল সকলে সবই মনে রেখেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও নিজের ঘটনাগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন। হাদীসগ্রন্থগুলোতে সবই আগাগোড়া স্থান পেয়েছে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন সেগুলো ফিকাহ-শাস্ত্রের মূলনীতিমালার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। হযরত আয়েশা রাযি. হজের সফরে বিশেষ কারণে (মেয়েলি ওজরে) অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশে তিনি তানঈমে গিয়ে নতুন করে ইহরাম বাঁধেন এবং তাওয়াফ করেন।' হাফেজ ইবনে কাইয়ুম রহ. এই ঘটনাটি বর্ণনা করে লিখেছেন,
وَ حَدِيثُ عَائِشَةَ هَذَا يُؤْخَذُ مِنْهُ أُصُولٌ عَظِيمَةٌ مِّنْ أُصُولِ الْمَنَاسِكِ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসটি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার উদ্ঘাটন হয়। যেমন:
১. যে ব্যক্তি এক সঙ্গে হজ ও উমরা দুটোই করবেন (কেরান হজ), তার জন্য হজ ও উমরার মাঝখানে একটি তাওয়াফ ও একটি সাঈ-ই যথেষ্ট হবে।
২. মাসিকের কারণে নারীদের থেকে তাওয়াফুল কুদুম রহিত হয়ে যায়।
৩. ঋতুবতী নারীর জন্য হজের পর উমরার নিয়ত করা জায়েয আছে।
৪. ঋতুবতী নারী কাবা শরীফের তাওয়াফ ছাড়া হজের সকল বিধান পালন করতে পারবে।
৫. তানঈম হেরেমের অন্তর্ভুক্ত নয়। হিল্লের অন্তর্ভুক্ত।
৬. উমরা এক বছরে দুটো, বরং এক মাসেও দুটো করা যেতে পারে।
৭. তামাত্তু হজকারী (অর্থাৎ যিনি হজ ও উমরার আলাদা আলাদা নিয়ত করেছেন) যদি উমরা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করেন, তা হলে হজের পর উমরা আদায় করে নিতে পারেন।
৮. উমরায়ে মাক্কিয়্যাহর বৈধতার প্রমাণ শুধুমাত্র এই হাদীসটিই।
হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর একটি ঘটনা আছে। তিনি হজে আখেরি তাওয়াফে অপারগ হয়ে পড়লেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর পূর্বে তাওয়াফ করোনি? হযরত আয়েশা রাযি. এই ঘটনা থেকে উদ্ঘাটন করেছেন, বিদায়ি তাওয়াফ জরুরি নয়, এবং মাজুর নারীগণ এ নির্দেশের বাইরে। এ কারণে যেসব মহিলা হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে হজে যেতেন, তারা এই মাসআলা অনুযায়ীই আমল করতেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : باب من خير نسائه ا
২. সুনানে বাইহাকী : كتاب البيوع ا
১. সহীহ বুখারী : ا باب الحرة تكون تحت العبد
১. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক রহ: ا إفاضة الحائض
📄 কিয়াসে আকলী বা বিবেচনাকে কাজে লাগানো
কুরআন ও হাদীসের পর কিয়াসে আকলীর অবস্থান। কিয়াসে আকলীর অর্থ এই নয়, যে কেউ নিজের খেয়াল-খুশিমতো শরীয়তের বিধান রচনা করবে; বরং কিয়াসে আকলীর অর্থ এই যে, বিদগ্ধ আলেমগণ, যারা শরীয়তের মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধে অগাধ পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, কিতাব ও সুন্নাহর চর্চা ও গবেষণা করতে করতে তাঁদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা হয়ে যায় যে, তাঁদের সামনে যখন কোনো নতুন সমস্যা উত্থাপিত হয়, তখন তাঁরা কিতাব ও সুন্নাহর পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করতে পারেন যে, যদি শরীয়ত-প্রণেতা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেঁচে থাকতেন, তা হলে কী সমাধান দিতেন। এর একটি সুন্দর উদাহরণ হলো, কোনো যোগ্য ও অভিজ্ঞ উকিল কোনো বিশেষ আদালতের মামলা-মোকদ্দমায় এত কাজ করেছেন যে, পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কোনো নতুন মোকদ্দমার ব্যাপারে তিনি আগেই সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন যে, যদি এই আদালতে এই মোকদ্দমা পেশ হয়, তা হলে এই রায় আসবে। শরীয়তের এরকম হাজারও মোকদ্দমায় হযরত আয়েশা রাযি. ওকালতি করেছেন এবং কখন কোন রায় কেন এসেছে সবই নখদর্পণে রেখেছেন। তাই তাঁর কিয়াসে আকলী তথা বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত খুব কমই ভ্রান্তির শিকার হয়েছে।
১. প্রথম উদাহরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় নারীগণ সাধারণত মসজিদে আসতেন এবং জামাতের নামাযে অংশগ্রহণ করতেন। পুরুষদের পেছনে শিশুদের, এবং শিশুদের পেছনে নারীদের কাতার হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, কেউ যেন নারীদের মসজিদে আসতে বাধা না দেয়। তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত বাণীটি ছিল:
لَا تَمْنَعُوْا إِمَاءَ اللَّهِ مِنْ مَسَاجِدِ اللَّهِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর ঘরে আসা থেকে বাধা দিয়ো না।
কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুরআনিক যুগটি অতিবাহিত হওয়ার পর বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মেলামেশা, সাংস্কৃতিক প্রসার এবং অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে নারীসমাজে ব্যাপক সাজ-সজ্জা ও আড়ম্বরতার প্রচলন ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ বেঁচে থাকতেন তা হলে নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিতেন। তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত বাণীটি এই:
عَنْ عُمْرَةَ عَنْ عَائِشَةَ رَض قَالَتْ لَوْ أَدْرَكَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءِ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ
অর্থ: উমরাহ হযরত আয়েশা রাযি. সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, নারীরা আজ যা শুরু করেছে, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই যুগটি পেতেন, তা হলে অবশ্যই তাদের মসজিদে যেতে বারণ করে দিতেন; যেমন করে বনী ইসরাইলের নারীদের বারণ করা হয়েছিল।'
ওই সময় যদিও উম্মুল মুমিনীনদের এই রায় অনুয়ায়ী ফায়সালা হয়নি; কিন্তু রায়টির মূল উৎস ছিল কিয়াসে আক্বলী।
২. দ্বিতীয় উদাহরণ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর ফতোয়া ছিল, যদি কেউ কোনো মুরদাকে গোসল করায় তা হলে তাকে গোসল করতে হবে। যদি কেউ জানাযা বহন করে তা হলে তাকে ওযু করতে হবে। হযরত আয়েশা রাযি. ফতোয়াটি শুনে বললেন,
أَ وَّ يُنَحِّسُ مَوْتَى الْمُسْلِمِيْنَ وَ مَا عَلَى رَجُلٍ لَوْ حَمَلَ غُوْذًا
অর্থ : মুসলমান মরে যদি নাপাক হয়ে যায়, তা হলে কেউ কোনো কাঠের খড়ি বহন করলে কী হবে?
৩. তৃতীয় উদাহরণ
শৰঈ গোসল ফরজ হওয়ার জন্য স্খলন জরুরি কি না—এ ব্যাপারে হযরত যাবেব রাযি. বলতেন—জরুরি। কেননা اَلْمَاءُ بِالْمَاءِ—পানির পরে পানি। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর এ ফতোয়া শুনে বিপরীতে আর একটি হাদীস পেশ করলেন; এরপর বললেন, যদি কেউ ব্যাভিচার করে, কিন্তু স্खলন না হয়, তা হলেও তাকে পাথর মেরে হত্যা করতে হয়; অথচ গোসল করা জরুরি হবে না? এ কেমন কথা!
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : ১/২৫৬/৮৩১, باب خروج النساء إلى المساجد
📄 সুনানের প্রকারভেদ
ফিকহের একটি অতি সূক্ষ্ম বিষয় এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে আচরণ-উচ্চারণ ও কর্মগুলো প্রকাশ পেয়েছিল, সেগুলোর কোনোটি ছিল শরীয় বিধান হিসেবে, কোনোটি নিছক অভ্যাস হিসেবে, আবার কোনোটি শুধু বিশেষ কোনো কল্যাণের দিকে লক্ষ রেখে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে কর্ম প্রকাশিত হয়েছে তাকে সুন্নাত বলে। ফিকহবিদগণ প্রথমত এই সুন্নাতকে দুটো প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন : ইবাদি ও আদি। ইবাদি সুন্নাত বলা হয় ওই সমস্ত কর্মকে যেগুলো তিনি করেছেন সওয়াবের নিয়তে ইবাদত হিসেবে। সুন্নাতে ইবাদি আবার দুই প্রকার : মুআক্কাদা ও মুসতাহাব্বা। মুআক্কাদা বলা হয় যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় করেছেন, কখনো তরক করেননি। আর মুসতাহাব্বা বলা হয় যেগুলো মাঝেমধ্যে তরকও করেছেন।
সুন্নাতে আদি হলো ওই সমস্ত কর্ম যেগুলো তিনি সওয়াবের আশায় ইবাদত হিসাবে করেননি; বরং অভ্যাসগত কারণে, কিংবা ব্যক্তিগত বা সাময়িক প্রয়োজনে করেছেন। উম্মতের ওপর সুন্নাতে আদির অনুসরণ জরুরি নয়। তবে ভালোবাসা জিনিসটা অন্যরকম। প্রিয়তমের অভ্যাসের অনুকরণও প্রেমেরই প্রকাশ। এজন্যই কবি বলেছেন:
ہر ادا محبوب کی محبوب ہی
অর্থ: প্রিয়তমের সব কিছুই প্রিয় লাগে।
বিভিন্ন হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়, হযরত আয়েশা রাযি. নিজেও ফিকহবিদগণের অনেক আগেই এই মূলনীতিটি হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলেন। তারাবীর নামাযের ব্যাপারে তিনি—এবং একমাত্র তিনিই শুধু বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে তিন দিন জামাত করে তারাবী পড়িয়েছিলেন। চতুর্থ দিন তিনি আর এলেন না। সকাল বেলা সাহাবা কেরামকে বললেন, আমি এজন্য আসিনি যে, আমার ভয় হচ্ছিল, এই নামায না ফরজ করে দেওয়া হয়। এ থেকে জানা যায়, হযরত আয়েশা রাযি. অনেক আগেই জেনেছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজটি নিয়মিতভাবে করবেন, তা জরুরি হয়ে পড়বে; আর যে কাজটি কখনো ছেড়ে দেবেন, তা এত গুরুতরতা ও আবশ্যকতার পর্যায়ে পৌঁছবে না।
সাহাবা কেরামের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. সুনানে আদি ও ইবাদির পার্থক্য করতেন না। তাঁর দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজটি করেছেন-যখনই করুন, আর যে কারণেই করুন-সুন্নাত। এজন্য তিনি সফরের বিভিন্ন মনজিলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতেন। এমনকি, যদি কোনো মনজিলে তিনি ওযু করতেন তা হলে তিনিও তাঁর অনুসরণে ওযু করতেন, প্রয়োজন থাকুক আর না থাকুক। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এ সকল পার্থক্য খেয়াল করতেন। হজে ওয়াদিল আবতাহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবু ফেলেছিলেন। তারা এটাকে সুন্নাত মনে করতেন না। সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে আছে,
نُزُولُ الْأَبْطَحِ لَيْسَ بِسُنَّةٍ إِنَّمَا نَزَلَهُ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَنَّهُ كَانَ أَسْمَحَ لِخُرُوجِهِ إِذَا خَرَجَ
অর্থ: আবতাহে অবতরণ করা সুন্নাত নয়; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে অবতরণ করেছিলেন সফরে সুবিধা হয়, তাই।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, كتاب الحج، باب الغصب : ১৭৬৫। সহীহ মুসলিম, كتاب الحج، باب استحباب نزول العدو : المحصب
📄 সমসাময়িকদের সঙ্গে মতভেদের তালিকা
হযরত আয়েশা রাযি. অসংখ্য ফিকহী মাসআলায় সমসাময়িকদের সঙ্গে মতভেদ করেছেন এবং সত্য তাঁকে সঙ্গ দিয়েছে। হেজাজের ফিকহবিদগণ অধিকাংশ বিষয়ে সে অনুযায়ীই আমল করেছেন। আমরা এ ধরনের উল্লেখযোগ্য কিছু মাসআলার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা জামে তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করেছি:
| ক্রম | হযরত আয়েশা রাযি.-এর অভিমত | অন্যান্য সাহাবা কেরাম রাযি.-এর অভিমত |
|---|---|---|
| ১ | থুথুতে ওযু ভাঙে না। | ইবনে উমর রাযি. ভাঙে। |
| ২ | জানাযা-বহনে ওযু ভাঙে না। | আবু হুরায়রা রাযি. ভাঙে। |
| ৩ | গোসলে নারীর খোঁপা খোলা জরুরি নয়। | ইবনে উমর রাযি. জরুরি। |
| ৪ | শুধু মিলনেই গোসল ওয়াজিব হয়। | জাবের রাযি. : স্খলন শর্ত। |
| ৫ | 'কুরু' অর্থ তুহুর-পবিত্রতা। | অন্যান্য-হায়েয (ঋতু/মাসিক)। |
| ৬ | মাইয়েতকে গোসল করালে গোসল ওয়াজিব হয় না | আবু হুরায়রা রাযি.-ওয়াজিব হয়। |
| ৭ | নারী-মাইয়েতের চুল আঁচড়ানো যাবে না।' | উম্মে আতিয়্যা রাযি.-যাবে। |
| ৮ | নামাযে নারী সামনে এলে নামায নষ্ট হয় না। | আবু হুরায়রা রাযি. নামায নষ্ট হয়। |
| ৯ | ফজরের নামায অন্ধকার থাকতে পড়া উচিত। | রাফে ইবনে খাদিজ রাযি.-ফরসা হলে পড়া উচিত। |
| ১০ | আসরের নামায তাড়াতাড়ি পড়তে হবে। | উম্মে সালামা রাযি. বিলম্বে পড়তে হবে। |
| ১১ | মাগরিবের নামায তাড়াতাড়ি পড়তে হবে। | আবু মুসা রাযি. বিলম্বে পড়তে হবে। |
| ১২ | নাপাক অবস্থায় সকাল করলে রোযা নষ্ট হয় না। | আবু হুরায়রা রাযি. নষ্ট হয়। |
| ১৩ | ইফতার তাড়াতাড়ি করতে হবে। | আবু মুসা রাযি. বিলম্বে করতে হবে। |
| ১৪ | কুরবানির গোশত তিন দিনের বেশিও খাওয়া যাবে। | আলী রাযি. ও ইবনে উমর রায়.-না। |
| ১৫ | হজে ওয়াদিয়ে মাহসাবে অবতরণ সুন্নাত নয়। | ইবনে উমর রাযি.-সুন্নাত। |
| ১৬ | হজে মাথা মুণ্ডানোর পর সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে। | ইবনে উমর রাযি.-যাবে না। |
| ১৭ | কাবায় কোরবানি পাঠালে প্রেরণকারীর ওপর হজের বিধান আরোপিত হয় না। | ইবনে আব্বাস রাযি.-হয়। |
| ১৮ | হজে ঋতুবতী নারীকে বিদায়ি তাওয়াফের অপেক্ষা করতে হবে না। | উমর রাযি.-অপেক্ষা করতে হবে।' |
| ১৯ | হজে নারী জাফরানি কাপড় পরতে পারবে। | উমর রাযি.-মাকরূহ হবে।' |
| ২০ | হজে নারীর জন্য সামান্য চুল ছাঁটাই যথেষ্ট। | ইবনে যুবায়ের রাযি.-কমপক্ষে চার আঙ্গুল কাটা জরুরি। |
| ২১ | অলঙ্কারে যাকাত নেই (একটি বর্ণনা অনুযায়ী)। | যাকাত আছে। |
| ২২ | এতিম ও নাবালেগের মালেও যাকাত আছে। | ইবনে মাসউদ রাযি.-নেই। |
| ২৩ | গর্ভবতী বিধবা হলে ইদ্দতের সময়কাল হলো গর্ভপাতের সময়কাল। | ইবনে আব্বাস রাযি.-গর্ভপাত ও বৈধব্যের যে সময়টি বেশি হবে সেটিই হবে ইদ্দতের সময়কাল। |
| ২৪ | তালাকের ইচ্ছাধিকার প্রাপ্ত স্ত্রী তালাক না নিলে কোনো তালাকই হবে না। | আলী রাযি. ও ইবনে সাবেত রাযি.-এক তালাক হবে। |
| ২৫ | বালেগ মানুষও কারও দুধ পান করলে মাহরাম হবে। | অন্য উম্মাহাতুল মুমিনীন- হবে না।' |
| ২৬ | রেযাআত হবে কমপক্ষে পাঁচ ফোঁটা দুধ পান করলে। | অন্যান্য'-এক ফোঁটা দুধও যথেষ্ট। |
| ২৭ | গোলামের ওপর যদি একটি দানাও ধার্য হয় তবু মুকাতাব হবে। | যায়দ ইবনে সাবেত রাযি.- এক দিরহামের কম হলে মুকাতাব হবে না। |
| ২৮ | চোরাই মালের মূল্য তিন দিরহামের কম হলেও চোরের হাত কাটা যাবে।' | ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ রাযি.-কমপক্ষে দশ দিরহাম হতে হবে।' |
| ২৯ | যদি জোরপূর্বক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ানো, কিংবা গোলাম আজাদ করানো হয়, তা হলে স্ত্রীও তালাক হবে না; গোলামও আজাদ হবে না। | হানাফী ইমামগণ বলেন— তালাক ও আজাদ হয়ে যাবে। |
| ৩০ | তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীও ইদ্দতের সময় স্বামীর ঘরে থাকবে। | ফাতেমা বিনতে কায়স রাযি.-স্বামীর ঘরে থাকবে না। |
| ৩১ | মিরাসে দুই মেয়ে, এক নাতনী ও এক নাতী থাকলে এক তৃতীয়াংশ মেয়েরা ও একতৃতীয়াংশ নাতী-নাতনী মিলে পাবে। | ইবনে মাসউদ রাযি.- অবশিষ্টাংশ শুধু নাতী পাবে, নাতনী পাবে না। |
যাই হোক, ফিকহের জগতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবদান অপরিসীম। সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেগুলোর প্রতি পূর্ণাঙ্গ আলোকপাত সম্ভব নয়। ইমাম মালেক রহ. উম্মুল মুমিনীন রাযি.-এর রেখে যাওয়া ফিকহী মাসআলাগুলোর একটি বিরাট অংশ সংরক্ষণ করতে পেরেছেন অনবদ্য মুয়াত্তায়। মদীনাবাসী মুসলমানদের পক্ষে এই মহামূল্যবান বর্ণনাগুলোই ফিকহের মূল ভিত্তি।
টিকাঃ
১. আহনাফের ফতোয়া হযরত আয়েশা রাযি.-এর কওলের ওপর। হেদায়া : কিতাবুল জানাইয, আবদুর রাযযাকের উদ্ধৃতিতে। হযরত উম্মে আতিয়া রাযি.-এর হাদীসটি অধিকাংশ সিহাহগ্রন্থেই আছে।
১. মুয়াত্তা ও যুরকানী। باب ما يلبس المحرم من الثياب :۱
১. ঘটনা এই যে, সাহাবী হযরত আবু হুযায়ফা রাযি.-এর সালেম নামক একটি নাবালেগ গোলাম ছিলেন, যিনি ইসলামের ইতিহাসে মাওলায়ে আবি হুযায়ফা রাযি. (হুযায়ফা রাযি.-এর আজাদকৃত গোলাম) নামে পরিচিত। তিনি ছোটবেলা থেকেই তার মনিবের ঘরেই থাকতেন এবং অন্দরেও তার অবাধ বিচরণ ছিল। হযরত হুযায়ফা রাযি.-এর স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল তার সাথে পর্দা করতেন না। কিন্তু যখন হযরত সালেম রাযি. বড় হয়ে গেলেন তখন তার সঙ্গে স্ত্রীর পর্দা না করার বিষয়ে হযরত আবু হুযায়ফা রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হতেন। এক পর্যায়ে হযরত সাহলা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার সালেম বড় হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি, তার সঙ্গে পর্দা না করার বিষয়ে আবু হুযায়ফা রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হচ্ছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সালেমকে দুধ খাইয়ে দাও, তা হলে আবু হুযায়ফার অসন্তোষ কেটে যাবে। হযরত সাহলা রাযি. তা-ই করলেন। এবং বাস্তবেও হযরত আবু হুযায়ফা রাযি. ঠিক হয়ে গেলেন। এই ঘটনার ভিত্তিতেই হযরত আয়েশা রাযি. মনে করতেন, বালেগ শিশুকেও যদি কোনো মহিলা দুধ পান করায় তা হলে হুরমতে রেযাআত অর্থাৎ মাহরামের সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে। কিন্তু পবিত্র স্ত্রীগণ অন্য সকলে এটাকে হযরত সাহলা রাযি. ও সালেম রাযি.-এর জন্য বিশেষ ছাড় বলে মনে করতেন। তাঁদের দৃষ্টিতে অন্য কারও জন্য এ অনুমতি নেই। ইমাম দাউদ যাহিরি রহ. ছাড়া সকল ইমাম আলোচ্য মাসআলায় পবিত্র স্ত্রীগণের মতকেই গ্রহণ করেছেন। অন্যান্য সহীহ হাদীসের আলোকেও প্রমাণিত যে, হুরমত সাব্যস্ত হবে শুধু শিশু অবস্থায় দুধ পান করলে। কুরআনেও দুধপানের মেয়াদ আছে দু-বছর। এ জন্য জমহুর ফুকাহা কেরাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ মতটিকে সমর্থন করেননি (শরহে সহীহ মুসলিম, নববী: বাবু রিযাআতিল কাবির)।
২. সহীহ বুখারী : ا كتاب العنق
৩. নাসাঈ-তে আছে হযরত আলী রাযি. এবং হযরত ইবনে মাসউদ রাযি.-এর মাযহাবও এটি।
১. সহীহ বুখারী : السرفة والحدود
২. দারাকুতনী, كتاب الحدود। মুসনাদে আহমাদ : اكتاب الجنائز
৩. و لا إعتاق في إغلاق ৩ অর্থ: জোরপূর্বক তালাক ও ইতাক হয় না [আবু দাউদ: كتاب الطلاق ২১৯৩]।