📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর ফিকহের মূলনীতিমালা
কুরআন মাজীদ থেকে উদ্ঘাটন
হযরত আয়েশা রাযি. যে কোনো বিষয়ে ধর্মীয় অনুশাসন-উদ্ঘাটনে সর্বপ্রথম কুরআন মাজীদে মনোনিবেশ করতেন। যদি এতে ব্যর্থ হতেন তা হলে হাদীসে মনোযোগী হতেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে কিয়াস ও বিবেচনার আশ্রয় নিতেন। হাদীসসংক্রান্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি,
📄 কুরআন মাজীদ থেকে উম্দাতন
হযরত আয়েশা রাযি. যে কোনো বিষয়ে ধর্মীয় অনুশাসন-উদ্ঘাটনে সর্বপ্রথম কুরআন মাজীদে মনোনিবেশ করতেন। যদি এতে ব্যর্থ হতেন তা হলে হাদীসে মনোযোগী হতেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে কিয়াস ও বিবেচনার আশ্রয় নিতেন। হাদীসসংক্রান্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি, জনৈক শাগরেদ মুতা বিবাহ সম্পর্কে জানতে চাইলে হযরত আয়েশা রাযি. নিম্নোক্ত আয়াতের আলোকে এর নিষিদ্ধতা প্রমাণিত করেন:'
... وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ ...
অর্থ: ...যারা আপন স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী ছাড়া অন্যদের থেকে লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে... (সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৫-৬) অর্থাৎ মুতা-কৃত নারী না-স্ত্রী, না-দাসী।
জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, অনারবরা তাদের ধর্মীয় উৎসবের দিনে যে জন্তু জবেহ করে তা খাওয়া কি বৈধ হবে? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, শুধু সেই দিনই যে জন্তু জবেহ করা হয়, তা খাওয়া বৈধ হবে না। খুব সম্ভব, নিম্নোক্ত আয়াতটির ভিত্তিতে তিনি এ সমাধান দিয়েছিলেন।
وَمَا أُهِلَّ بِهِ لِغَيْرِ اللَّهِ
অর্থ: আর যে জন্তু গায়রুল্লাহর নামে জবেহ করা হয়, তা তোমাদের আহার করা হারাম। (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৭৩)
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি. জনৈকা মহিলার কাছ থেকে আটশো মুদ্রায় বাকিতে একটি বাঁদি খরিদ করেন, সঙ্গে সঙ্গে শর্ত করেন, ওযিফা পেলে মূল্য পরিশোধ করে দেব। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি ওই মহিলার কাছেই ওই বাঁদিই নগদ ছয়শো মুদ্রায় বিক্রি করেন। মহিলাটি এই লেনদেনের কথা হযরত আয়েশা রাযি.-কে অবগত করেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, তুমিও অন্যায় করেছ, যায়েদ ইবনে আরকাম রাযি.-ও অন্যায় করেছেন। তাকে গিয়ে বলো, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করে যে সওয়াব অর্জন করেছিলেন, সবই বরবাদ হয়ে যাবে—যদি তওবা না করেন।
তাৎপর্য এই যে, হযরত আয়েশা রাযি. আলোচ্য সমস্যায় অতিরিক্ত দুইশো মুদ্রাকে সুদ বিবেচনা করেছেন। কিছু কিছু হাদীসে ঘটনাটি এটুকুই বিবৃত হওয়ায় একটু দ্বিধান্বিত হতে হয় যে, ঠিক কীভাবে তিনি এই সিদ্ধান্তটি দিলেন। কিন্তু মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ও সুনানে দারাকুতনীর অন্য একটি বর্ণনায় বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। তিনি মূলত নিম্নোক্ত আয়াতটির ভিত্তিতে' এই সিদ্ধান্তটি দিয়েছিলেন-যা সুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে অবতীর্ণ হয়:
فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ
অর্থ: সুতরাং যে আপন প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশপ্রাপ্ত হলো এবং (এ গর্হিত কাজ থেকে) ফিরে এল, সে ততটুকুই পাবে যতটুকু সে দিয়েছে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৭৫)
কুরআন মাজীদে আছে, তালাকের পর নারী তিন 'কুরু' পর্যন্ত অপেক্ষা করবে; অর্থাৎ তার ইদ্দতের মেয়াদ তিন কুরু। কুরু অর্থ কী এ নিয়ে মতভেদ আছে। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাতিজিকে তার স্বামী তালাক দিয়েছিলেন। তিনি ভাতিজিকে স্বামীর ঘর থেকে ফেরত আনলেন তিনটি পবিত্রতা-কাল পার হওয়ার পরই। এ নিয়ে অনেকে আপত্তি করল। তারা বলল, এটা কুরআনের পরিপন্থী। তারা 'তিন কুরু'-র আয়াতটিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করল। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, 'তিন কুরু'-র আয়াত ঠিকই আছে; কিন্তু 'কুরু' অর্থ কী, সেটা তোমরা জানো না। 'কুরু' অর্থ হলো তুহুর-অর্থাৎ দুই ঋতুর মধ্যবর্তী পবিত্রতা-কাল। ইমাম মালেক রহ. তাঁর শায়খগণের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আলোচ্য মাসআলায় মদীনার সকল ফকীহ হযরত আয়েশা রাযি.-এর অনুসরণ করতেন। পক্ষান্তরে ইরাকের লোকেরা 'কুরু' বলতে বুঝতেন হায়েয-অর্থাৎ ঋতু-কাল。
টিকাঃ
১. আইনুল ইসাবা, সুয়ূতি রহ., হাকেমের উদ্ধৃতিতে।
২. তাফসীর ইবনে কাসির রহ. (কুরতুবির উদ্ধৃতিতে)।
১. মুসনাদে আহমাদ, মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, সুনানে বাইহাকী, সুনানে দারাকুতনী: কিতাবুল বুয়ু। অনেকে হাদীসটি প্রথম রাবী-কে মাজহুল (অজ্ঞাত) বলেছেন; কিন্তু দাবিটি সঠিক নয়।
২. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক রহ.। কিতাবুত তালাক দ্রষ্টব্য।
📄 হাদীস শরীফ থেকে উস্দাতন
কুরআন মাজীদের পর হাদীস শরীফের অবস্থান। একবার একটি মাসআলা দেখা দিল, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের ইচ্ছাধিকার দেয়, আর স্ত্রী সেই ইচ্ছাধিকার গ্রহণ না করে স্বামীকেই গ্রহণ করে, তা হলে স্ত্রীর ওপর কোনো তালাক আপতিত হবে কি না? হযরত আলী রাযি. এবং হযরত যায়েদ রাযি.-এর দৃষ্টিতে এক তালাক আপতিত হবে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এ অবস্থায় কোনো তালাকই আপতিত হবে না। তিনি তাঁর সমাধানের পক্ষে তাখঈরের ঘটনাটি তুলে ধরেন। মহান আল্লাহ পবিত্র স্ত্রীগণকে ইচ্ছাধিকার দিয়েছিলেন—তাঁরা ইচ্ছা করলে পার্থিব সুখ-শান্তি গ্রহণ করতে পারেন, ইচ্ছা করলে নবীপরিবারের অভাব-অনটন বরণ করতে পারেন। পবিত্র স্ত্রীগণ সকলে দ্বিতীয় বিকল্পটিই গ্রহণ করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের কারও ওপর এক তালাকও আপতিত হয়নি।'
মনিব যদি গোলামকে আজাদ করে দেন, তা হলে মনিব ও গোলামের মধ্যে এক ধরনের অভিভাবকত্ব স্থাপিত হয়। এই অভিভাবকত্বের ফলে উত্তরাধিকারও সাব্যস্ত হয়। এমনকি, গোলামকে মনিবের বংশীয় বিবেচনা করে আইনি সম্মানও প্রদান করা হয়। এ কারণে গোলাম ও মনিবের অভিভাবকত্বের বিষয়টি তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাই হোক, এক গোলাম এসে বলল, আমি উতবা ইবনে আবু লাহাবের গোলাম ছিলাম। তারা স্বামী-স্ত্রী আমাকে বেচে দিয়েছিল। কিন্তু শর্ত করেছিল, আমার অভিভাবকত্ব-সম্বন্ধ থাকবে তাদের সঙ্গে। এখন আমার সম্বন্ধটি কার সঙ্গে হবে? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, বারীরাহ রাযি.-এর ঘটনাটা এমনই ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, বারীরা রাযি.-কে খরিদ করে আজাদ করে দাও। অভিভাবকত্ব তোমারই থাকবে। ক্রেতা-বিক্রেতা যত অবৈধ শর্তই আরোপ করুক না কেন।'
হযরত বারীরাহ রাযি. একজন দাসী ছিলেন। তার আগের মনিব এই শর্তে তাকে বিক্রি করতে রাজি হয়েছিল যে, অভিভাবকত্ব-সম্বন্ধ থাকবে তার সঙ্গে। বারীরাহ রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে আসেন এবং বিষয়টি ব্যক্ত করেন। তিনি কিনতে রাজি হন; কিন্তু শর্তটা মেনে নিতে পারছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলে বিষয়টি উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, নির্দ্বিধায় কিনে ফ্যালো এবং আজাদ করে দাও। অবৈধ শর্ত আপনা-আপনি হাওয়া হয়ে যাবে। হযরত বারীরাহ রাযি. আজাদ হয়ে গেলেন। এরপর দাসী অবস্থায় যে স্বামীর অধীনে ছিলেন তাকে ত্যাগ করলেন। লোকে তাকে সদকা করত, তিনি সেগুলো গ্রহণ করতেন। কখনো কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও কিছু খেতে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই খাবার ফেরত দিতেন না।
এ বিষয়গুলো থেকে হযরত আয়েশা রাযি. কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, বারীরাহ রাযি.-এর ওসিলায় ইসলামে তিনটি বিধান সুবিদিত হয়েছে:'
১. অভিভাবকত্ব থাকবে আজাদকারীর সঙ্গে।
২. দাসী থাকাকালে যদি কোনো বাঁদির বিবাহ হয় এবং পরে বাঁদি আজাদ হয় তা হলে দাস স্বামীর অধীনে থাকা না থাকার ইচ্ছাধিকার তার হাতে।
৩. যদি সদকার হকদার ব্যক্তি কোথাও থেকে সদকা পেয়ে সদকার হকদার নয় এমন কাউকে সেটা হাদিয়া দেয়, তা হলে সেটা গ্রহণ করা সেই ব্যক্তির জন্য বৈধ হবে; অর্থাৎ মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বস্তুটির গুণগত পরিবর্তনও ঘটবে।
হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক কিছু কিছু ইসতিমবাত বা উদ্ঘাটন এমন আছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা বা বিশদ বিবরণ তিনি নিজে দেননি। কিন্তু তাঁর ফতোয়ার ধারাবাহিকতায় সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত হয়ে গেছে। ধর্মতত্ত্ববিদ ও গবেষকগণ সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বড় বড় ইমারত গড়ে তুলেছেন। বিদায় হজে প্রায় এক লাখ মুসলমান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। বড় বড় সাহাবা কেরামও ছিলেন। এই সফরে যত কিছু ঘটেছিল সকলে সবই মনে রেখেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-ও নিজের ঘটনাগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন। হাদীসগ্রন্থগুলোতে সবই আগাগোড়া স্থান পেয়েছে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন সেগুলো ফিকাহ-শাস্ত্রের মূলনীতিমালার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। হযরত আয়েশা রাযি. হজের সফরে বিশেষ কারণে (মেয়েলি ওজরে) অপারগ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশে তিনি তানঈমে গিয়ে নতুন করে ইহরাম বাঁধেন এবং তাওয়াফ করেন।' হাফেজ ইবনে কাইয়ুম রহ. এই ঘটনাটি বর্ণনা করে লিখেছেন,
وَ حَدِيثُ عَائِشَةَ هَذَا يُؤْخَذُ مِنْهُ أُصُولٌ عَظِيمَةٌ مِّنْ أُصُولِ الْمَنَاسِكِ
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসটি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার উদ্ঘাটন হয়। যেমন:
১. যে ব্যক্তি এক সঙ্গে হজ ও উমরা দুটোই করবেন (কেরান হজ), তার জন্য হজ ও উমরার মাঝখানে একটি তাওয়াফ ও একটি সাঈ-ই যথেষ্ট হবে।
২. মাসিকের কারণে নারীদের থেকে তাওয়াফুল কুদুম রহিত হয়ে যায়।
৩. ঋতুবতী নারীর জন্য হজের পর উমরার নিয়ত করা জায়েয আছে।
৪. ঋতুবতী নারী কাবা শরীফের তাওয়াফ ছাড়া হজের সকল বিধান পালন করতে পারবে।
৫. তানঈম হেরেমের অন্তর্ভুক্ত নয়। হিল্লের অন্তর্ভুক্ত।
৬. উমরা এক বছরে দুটো, বরং এক মাসেও দুটো করা যেতে পারে।
৭. তামাত্তু হজকারী (অর্থাৎ যিনি হজ ও উমরার আলাদা আলাদা নিয়ত করেছেন) যদি উমরা ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করেন, তা হলে হজের পর উমরা আদায় করে নিতে পারেন।
৮. উমরায়ে মাক্কিয়্যাহর বৈধতার প্রমাণ শুধুমাত্র এই হাদীসটিই।
হযরত সাফিয়্যা রাযি.-এর একটি ঘটনা আছে। তিনি হজে আখেরি তাওয়াফে অপারগ হয়ে পড়লেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এর পূর্বে তাওয়াফ করোনি? হযরত আয়েশা রাযি. এই ঘটনা থেকে উদ্ঘাটন করেছেন, বিদায়ি তাওয়াফ জরুরি নয়, এবং মাজুর নারীগণ এ নির্দেশের বাইরে। এ কারণে যেসব মহিলা হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে হজে যেতেন, তারা এই মাসআলা অনুযায়ীই আমল করতেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : باب من خير نسائه ا
২. সুনানে বাইহাকী : كتاب البيوع ا
১. সহীহ বুখারী : ا باب الحرة تكون تحت العبد
১. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক রহ: ا إفاضة الحائض
📄 কিয়াসে আকলী বা বিবেচনাকে কাজে লাগানো
কুরআন ও হাদীসের পর কিয়াসে আকলীর অবস্থান। কিয়াসে আকলীর অর্থ এই নয়, যে কেউ নিজের খেয়াল-খুশিমতো শরীয়তের বিধান রচনা করবে; বরং কিয়াসে আকলীর অর্থ এই যে, বিদগ্ধ আলেমগণ, যারা শরীয়তের মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধে অগাধ পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন, কিতাব ও সুন্নাহর চর্চা ও গবেষণা করতে করতে তাঁদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা হয়ে যায় যে, তাঁদের সামনে যখন কোনো নতুন সমস্যা উত্থাপিত হয়, তখন তাঁরা কিতাব ও সুন্নাহর পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করতে পারেন যে, যদি শরীয়ত-প্রণেতা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেঁচে থাকতেন, তা হলে কী সমাধান দিতেন। এর একটি সুন্দর উদাহরণ হলো, কোনো যোগ্য ও অভিজ্ঞ উকিল কোনো বিশেষ আদালতের মামলা-মোকদ্দমায় এত কাজ করেছেন যে, পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কোনো নতুন মোকদ্দমার ব্যাপারে তিনি আগেই সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন যে, যদি এই আদালতে এই মোকদ্দমা পেশ হয়, তা হলে এই রায় আসবে। শরীয়তের এরকম হাজারও মোকদ্দমায় হযরত আয়েশা রাযি. ওকালতি করেছেন এবং কখন কোন রায় কেন এসেছে সবই নখদর্পণে রেখেছেন। তাই তাঁর কিয়াসে আকলী তথা বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত খুব কমই ভ্রান্তির শিকার হয়েছে।
১. প্রথম উদাহরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় নারীগণ সাধারণত মসজিদে আসতেন এবং জামাতের নামাযে অংশগ্রহণ করতেন। পুরুষদের পেছনে শিশুদের, এবং শিশুদের পেছনে নারীদের কাতার হতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, কেউ যেন নারীদের মসজিদে আসতে বাধা না দেয়। তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত বাণীটি ছিল:
لَا تَمْنَعُوْا إِمَاءَ اللَّهِ مِنْ مَسَاجِدِ اللَّهِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর ঘরে আসা থেকে বাধা দিয়ো না।
কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুরআনিক যুগটি অতিবাহিত হওয়ার পর বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মেলামেশা, সাংস্কৃতিক প্রসার এবং অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে নারীসমাজে ব্যাপক সাজ-সজ্জা ও আড়ম্বরতার প্রচলন ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ বেঁচে থাকতেন তা হলে নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করে দিতেন। তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত বাণীটি এই:
عَنْ عُمْرَةَ عَنْ عَائِشَةَ رَض قَالَتْ لَوْ أَدْرَكَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءِ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ
অর্থ: উমরাহ হযরত আয়েশা রাযি. সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, নারীরা আজ যা শুরু করেছে, যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই যুগটি পেতেন, তা হলে অবশ্যই তাদের মসজিদে যেতে বারণ করে দিতেন; যেমন করে বনী ইসরাইলের নারীদের বারণ করা হয়েছিল।'
ওই সময় যদিও উম্মুল মুমিনীনদের এই রায় অনুয়ায়ী ফায়সালা হয়নি; কিন্তু রায়টির মূল উৎস ছিল কিয়াসে আক্বলী।
২. দ্বিতীয় উদাহরণ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর ফতোয়া ছিল, যদি কেউ কোনো মুরদাকে গোসল করায় তা হলে তাকে গোসল করতে হবে। যদি কেউ জানাযা বহন করে তা হলে তাকে ওযু করতে হবে। হযরত আয়েশা রাযি. ফতোয়াটি শুনে বললেন,
أَ وَّ يُنَحِّسُ مَوْتَى الْمُسْلِمِيْنَ وَ مَا عَلَى رَجُلٍ لَوْ حَمَلَ غُوْذًا
অর্থ : মুসলমান মরে যদি নাপাক হয়ে যায়, তা হলে কেউ কোনো কাঠের খড়ি বহন করলে কী হবে?
৩. তৃতীয় উদাহরণ
শৰঈ গোসল ফরজ হওয়ার জন্য স্খলন জরুরি কি না—এ ব্যাপারে হযরত যাবেব রাযি. বলতেন—জরুরি। কেননা اَلْمَاءُ بِالْمَاءِ—পানির পরে পানি। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর এ ফতোয়া শুনে বিপরীতে আর একটি হাদীস পেশ করলেন; এরপর বললেন, যদি কেউ ব্যাভিচার করে, কিন্তু স্खলন না হয়, তা হলেও তাকে পাথর মেরে হত্যা করতে হয়; অথচ গোসল করা জরুরি হবে না? এ কেমন কথা!
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : ১/২৫৬/৮৩১, باب خروج النساء إلى المساجد