📄 ব্যক্তিগত অগ্রগতি
স্বীকৃত বিষয়, বন্ধুমহল মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় যতটা অবগত হন ঘরের লোকেরা তার চেয়ে বেশি অবগত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপাদমস্তক আদর্শ ছিলেন। তাঁর প্রতিটি কর্মই আইনের উৎস। কিন্তু পবিত্র স্ত্রীগণ তাঁর সম্পর্কে যতটা ব্যক্তিগত অবগতি লাভ করেছিলেন, অন্য কারও পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। এজন্যই অনেক বিষয়ে সাহাবা কেরাম রাযি. নিজ নিজ জ্ঞান ও বুঝ অনুযায়ী অথবা অন্য কোনো বর্ণনার আলোকে কিছু বলতেন আর হযরত আয়েশা রাযি. ব্যক্তিগত অবগতির কল্যাণে সেগুলোর সংশোধন করে দিতেন। আজ পর্যন্ত এ ধরনের বিষয়গুলোতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর কথাই প্রামাণ্য হয়ে আছে।
১. প্রথম উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. ফতোয়া দিয়েছিলেন, মেয়েদেরকে গোসল করার সময় খোঁপা খুলে চুল ভেজাতে হবে। হযরত আয়েশা রাযি. এ কথা শুনে বললেন, সে এ কথাই বলে দিত যে, মেয়েদেরকে চুলের খোঁপা চেঁছে ফেলতে হবে। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনেই গোসল করতাম। আমি খোঁপা খুলতাম না।'
২. দ্বিতীয় উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলতেন, চুমু খেলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। হযরত আয়েশা রাযি. এ কথা জানতে পেরে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুমু খাওয়ার পর নতুন করে ওযু করতেন না।' এ কথা বলে তিনি মৃদু হেসেছিলেন।
৩. তৃতীয় উদাহরণ
একবার তিনি জানতে পারলেন যে, হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেছেন, নামাযের মধ্যে পুরুষের সামনে দিয়ে যদি কোনো মহিলা, গাধা বা কুকুর অতিক্রম করে তা হলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। এ কথা শুনে তিনি খুব রেগে গেলেন এবং বললেন, তোমরা আমাদের নারীদেরকে কুকুর আর গাধার সমান করে দিলে! আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতাম, ঘুমিয়ে থাকতাম (ঘরে জায়গা ছিল না) আর তিনি নামায পড়তে থাকতেন। যখন সেজদায় যেতেন, হাত দিয়ে টোকা দিতেন আর আমি পা সরিয়ে নিতাম। তিনি উঠে গেলে আবার পা ছড়িয়ে দিতাম। অনেক সময় প্রয়োজন হলে শরীর কাত করে সামনে দিয়ে বের হয়ে যেতাম。
৪. চতুর্থ উদাহরণ
হযরত আবু দারদা রাযি. একদিন ওয়াজের মধ্যে মাসআলা বর্ণনা করলেন, যদি সকাল হয়ে যায় আর বিতর পড়া না হয়, তা হলে এই বিতর আর পড়া যাবে না। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আবু দারদা রাযি. ঠিক বলেনি। সকাল হয়ে গেলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর পড়ে নিতেন।'
৫. পঞ্চম উদাহরণ
কিছু কিছু লোক বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইয়েমেনি চাদরে কাফন দেওয়া হয়েছিল। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, এটা ঠিক আছে যে তাঁকে কাফন দেওয়ার জন্য ইয়েমেনি চাদর আনা হয়েছিল; কিন্তু সেটা তাঁর কাফনের কাপড় হিসেবে গৃহীত হয়নি।'
৬. ষষ্ঠ উদাহরণ
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. একদিন ওয়াজের মধ্যে বললেন, যদি কারও রোযার সময় সকালে গোসল করার প্রয়োজন হয় তা হলে সেদিন আর রোযা রাখবে না। লোকেরা হযরত আয়েশা রাযি. (এবং হযরত উম্মে সালামা রাযি.)-এর কাছে গিয়ে কথাটা সত্য কি না জানতে চাইল। তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল এমন ছিল না। লোকেরা গিয়ে হযরত আবু হুরায়রা রাযি.-কে আবার জিজ্ঞেস করল। তিনি তখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীস শুনে নিজের কথা ফিরিয়ে নিলেন।'
৭. সপ্তম উদাহরণ
হজে রমঈ (কঙ্কর নিক্ষেপ) ও হালাক (মাথা মুণ্ডানো) করার পর সুগন্ধি ও স্ত্রী-সহবাস ছাড়া সবকিছু বৈধ। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, সুগন্ধি লাগাতেও কোনো সমস্যা নেই। আমি নিজ হাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুগন্ধি লাগিয়ে দিয়েছি।'
৮. অষ্টম উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ফতোয়া দিতেন, যদি কোনো ব্যক্তি হজ না করে শুধু নিজ কুরবানি হেরেমে পাঠিয়ে দেয়, তা হলে যতক্ষণ তা হেরেমে জবেহ না হবে ততক্ষণ সে ব্যক্তির ওপর হজের বিধানসমূহ আরোপিত থাকবে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমি নিজ হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোরবানির জন্তুগুলোকে কিলাদা পরিয়েছি, তিনি তাঁর পবিত্র হাতে সেগুলোকে কোরবানির পশুপালে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং স্বয়ং আমার পিতা সেগুলোকে মক্কায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো সবকিছুই হালাল ছিল। কোনো কিছুই তো কোরবানি পর্যন্ত হারাম ছিল না।'
৯. নবম উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলতেন, যেদিন সকালে হজের ইহরাম বাঁধা হবে, সেদিন সকালে আমি সুগন্ধি লাগানো পছন্দ করি না। বিষয়টি হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি নিজ হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুগন্ধি লাগিয়ে দিয়েছি। কখনো তিনি বলতেন, আমার খুব ভালো করে মনে আছে, ইহরামের সকালে তাঁর জামার কলারে সুগন্ধির চমক ছিল। আমার খুব ভালো করে মনে আছে।'
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম ও সুনানে নাসাঈ। শেষোক্ত বাক্যটি শুধু নাসাঈ-তে আছে।
২. সহীহ বুখারী ও অন্যান্য।
৩. সহীহ বুখারী: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩، ا باب التطوع خلف المرأة
৪. সহীহ বুখারী : ا باب لا يقطع الصلوة شيء وباب السرير
১. সুনানে বাইহাকী ও মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪৩।
২. সহীহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ : كتاب الجنائز।
৩. সহীহ মুসলিম ও মুয়াত্তা : كتاب الصوم।
৪. সহীহ বুখারী: কিতাবুল হজ।
১. সহীহ বুখারী: কিতাবুল হজ।
২. সহীহ বুখারী: কিতাবুল হজ। ফাতহুল বারী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৫।
📄 স্মৃতি-শক্তির প্রখরতা
স্মৃতিশক্তির প্রখরতা আল্লাহপ্রদত্ত একটি বিশেষ গুণ। হযরত আয়েশা রাযি.-কে মহান আল্লাহ এ গুণেও গুণান্বিত করেছিলেন বিশেষভাবে। আমরা জেনেছি, ছোটবেলা সখীদের সঙ্গে খেলার সময়ও যে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল সেটিও তাঁর স্মরণ ছিল। হাদীস-শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভে মুখ্যত স্মৃতিশক্তির প্রখরতারই প্রয়োজন হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকালের দৈনন্দিন ঘটনাগুলো স্মরণ রাখা, সেগুলো সর্বদা একই রকম বিবৃত করা, তাঁর পবিত্র জবানে যে শব্দগুলো যেভাবে উচ্চারিত হয়েছে হুবহু সেভাবেই উল্লেখ করা—একজন মুহাদ্দিসের সবচেয়ে বড় গুণ। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. সমসাময়িকদের বর্ণনার যে সমালোচনাগুলো করতেন তাতে স্মৃতিশক্তির পার্থক্যভেদ ও প্রভাবকের কাজ করেছে।
১. প্রথম উদাহরণ
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. মৃত্যুবরণ করলে হযরত আয়েশা রাযি. চাইলেন, জানাযা মসজিদে করা হোক, তা হলে তিনিও জানাযা পড়তে পারবেন। লোকজন আপত্তি করলেন। তিনি বললেন, মানুষ কত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহল ইবনে বায়যা রাযি.-এর জানাযা মসজিদেই পড়েছিলেন।'
২. দ্বিতীয় উদাহরণ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-কে লোকেরা জিজ্ঞেস করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতবার উমরা করেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, চারবার, এর মধ্যে একটি ছিল রজব মাসে। উরওয়াহ ডাক দিয়ে বললেন, খালাজান, আপনি শুনেছেন ইনি কী বলেন? জিজ্ঞেস করলেন, কী বলেন? তিনি আরজ করলেন, ইনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকি চারবার উমরা করেছিলেন এবং এর মধ্যে একটি করেছিলেন রজব মাসে। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, আল্লাহ আবু আবদির রহমানকে (ইবনে উমর রাযি.-এর কুনিয়ত) রহম করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো উমরা করেননি, যাতে তিনি সঙ্গে ছিলেন না; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই রজব মাসে উমরা করেননি।'
৩. তৃতীয় উদাহরণ
হযরত ইবনে উমর রাযি. হাদীসের দরসে বললেন, আরবী মাস ঊনত্রিশ দিনে হয়। আলোচনা প্রসঙ্গে কথাটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরসেও উঠল। লোকেরা হযরত ইবনে উমর রাযি.-এর বর্ণনাটি উল্লেখ করলেন। তখন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-কে রহম করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি এভাবে বলেছিলেন যে, চন্দ্রমাস কখনো উনত্রিশ দিনেও হয়।'
৪. চতুর্থ উদাহরণ
কয়েকজন সাহাবী রাযি. বর্ণনা করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বজনদের কান্নাকাটিতে মৃতের শান্তি হয়। লোকেরা হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বললেন,
إِنَّكُمْ لَتُحَدِّثُوْنَ مِنْ غَيْرِ كَاذِبِيْنَ وَ لَا مُكَذِّبِيْنَ وَ لَكِنَّ السَّمْعَ يُخْطِئُ
অর্থ: তোমরা যাদের থেকে বর্ণনা করছ, তারা না মিথ্যা বলেছেন, আর না তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা যায়; কিন্তু মানুষ শুনতে ভুল করে।
অন্য একটি বর্ণনায় আছে,
رَحِمَ اللهُ أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ سَمِعَ شَيْئًا فَلَمْ يَحْفَظُ
অর্থ: আল্লাহ আবু আবদির রহমানকে রহম করুন, তিনি হাদীসটি শুনেছেন, কিন্তু ধরে রাখতে পারেননি।
আরও একটি হাদীসে এ রকম বাক্য পাওয়া যায়:
يَغْفِرُ اللهُ لِأَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَمَا إِنَّهُ لَمْ يَكْذِبْ وَ لَكِنَّهُ نَسِيَ أَوْ أَخْطَاً
অর্থ: আল্লাহ আবু আবদির রহমানকে ক্ষমা করুন। শোনো, তিনি মিথ্যা বলেননি; কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন, অথবা ভুল করেছেন।
এরপর তিনি বললেন, প্রকৃত ঘটনা এই যে, একবার এক ইহুদি মহিলা মারা গেল, লাশ সামনে নিয়ে স্বজনরা বিলাপ করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখে বললেন, এদিকে এরা কাঁদছে, ওদিকে মহিলাটির আজাব হচ্ছে。
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: কিতাবুল জানাইয।
২. সহীহ বুখারী : ا كتاب العمرة
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৩।
২. সবগুলো হাদীস সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয অংশে আছে।