📄 সাহাবা কেরামের বর্ণনার ভুল-সংশোধন
হযরত আয়েশা রাযি. শুধু নিজের বর্ণনাকেই ভুল-ত্রুটি-মুক্ত রাখতে চাইতেন তা নয়; বরং অন্যদের বর্ণনারও শুদ্ধ্যশুদ্ধি করে দিতেন। হাদীস-শাস্ত্রে বরং পুরো ইসলাম ধর্মে তাঁর একটি বড় অবদান এই যে, তিনি সমসাময়িকদের ত্রুটি-বিচ্যুতির কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের অপনোদন করেছেন। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এটিকে 'ইস্তিদরাক' (ভুল সংশোধন) বলে। হাদীসবিশারদগণ অনেকেই তাঁর এই সংশোধনীগুলোর সংকলন করেছেন। এগুলোর সর্বশেষ সংকলন হলো عَيْنُ الْإِصَابَةِ فِي مَا اسْتَدْرَكَتْهُ عَائِشَةُ عَلَى الصَّحَابَةِ
সংকলক অমূল্য রিসালাটিকে ফিকহশাস্ত্রের ক্রমানুসারে অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস দান করেছেন।'
টিকাঃ
১. আলোচ্য রিসালাটি আমি হায়দারাবাদ দাক্ষিণাত্বের একটি ছাপাখানায় পেয়েছিলাম। সেটিই আমার কাছে আছে।
📄 হাদীস-শাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর প্রাথমিক ধারণা
সাহাবা কেরামের যুগে যদিও হাদীস-শাস্ত্রের মূলনীতিগুলো কোনো শাস্ত্রীয় রূপ পরিগ্রহ করেনি; তথাপি প্রাথমিক ও মৌলিক নীতিমালা বিন্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। হযরত আয়েশা রাযি. সমসাময়িকদের প্রতি যে সংশোধনীগুলো আরোপ করেছিলেন, তাতে গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা নিম্নোক্ত ধারাগুলো পাই:
📄 কুরআনবিরোধী বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য
হাদীস-শাস্ত্রে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সর্বপ্রথম নীতি মনে করা হয়—বর্ণনা কুরআন মাজীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না।
১. প্রথম উদাহরণ
এই মূলনীতির আলোকে তিনি কয়েকটি বর্ণনার বিশুদ্ধতা অস্বীকার করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই বর্ণনাগুলোর মূল কথা ও প্রকৃত মর্ম নিজের জ্ঞান ও বুঝ মোতাবেক ব্যাখ্যা করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-সহ বিভিন্ন সাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذِّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ
অর্থ: মাইয়েতকে তার পরিবারের লোকদের কান্নাকাটির জন্য শাস্তি দেওয়া হয়।
হযরত আয়েশা রাযি. যখন বর্ণনাটি শুনলেন, তখন তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই এ কথা বলতে পারেন না। প্রকৃত ঘটনা এই যে, একবার তিনি এক ইহুদি মহিলার মৃতদেহের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করলেন। মাইয়েতের কোনো এক আত্মীয় কান্নাকাটি করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ এখানে কাঁদছে, আর ওখানে ওকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। হযরত আয়েশা রাযি.-এর কথার অর্থ হলো, যেমনটি সহীহ বুখারীতে বদর যুদ্ধের আলোচনায় আছে, আত্মীয়ের কান্না মাইয়েতের শাস্তির কারণ নয়। দুটো আলাদা আলাদা বিষয়। অর্থাৎ আত্মীয় কাঁদছে মাইয়েতের মৃত্যুর কারণে, আর তার আজাব হচ্ছে জীবনে কৃত পাপের কারণে। কেননা কান্না অন্যের কাজ। এর আজাব যে কাঁদছে সেই ভোগ করবে।' মাইয়েত কেন সেজন্য দায়ী হবে? সবাইকে নিজের আমলেরই সাজা ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. একটি আয়াতও উল্লেখ করেন,
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
অর্থ: কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। (সূরা ইসরা, আয়াত: ১৫)
বর্ণনাকারী বলেন, হযরত ইবনে উমর রাযি. যখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর ব্যাখ্যাটি শুনেছেন, তখন কোনো উত্তর দেননি।'
ইমাম বুখারী রহ. হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত ইবনে উমর রাযি.-এর মতভেদের মধ্যস্থতা করেছেন এভাবে: যদি বিলাপ করা স্বয়ং মাইয়েতেরও রীতি হয়ে থাকে এবং সে তার আত্মীয়-স্বজনদের এসব করার নির্দেশ দিয়ে যায়, তা হলে তাদের বিলাপের কারণে তার আজাব হবে। কেননা সে তাদের শেখানোর দায়িত্বটি পালন করেনি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। (সূরা তাহরীম, আয়াত: ৫)
যদি শেখানো সত্ত্বেও পরিবারের লোকেরা বিলাপ করে, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর কথাই ঠিক। যেমনটি কুরআনে এসেছে:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
অর্থ: কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। (সূরা ইসরা, আয়াত: ১৫)
এমনকি, অন্যত্র এর পর বলা হয়েছে':
وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٍ
অর্থ: এমনকি, যদি কেউ ভার বহন করতে না পেরে সাহায্যের জন্য ডাকে, তবুও তার বোঝা থেকে কিছু বহন করা হবে না। (সূরা ফাতির, আয়াত: ১৮)
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-এর সিদ্ধান্তও এটিই।'
কিন্তু শালিসি ফায়সালার সঙ্গে আমরা একমত নই। প্রথম অবস্থায় মাইয়েত নিজের পাপের কারনেই শান্তি পাবে। কেননা পরিবারকে না শেখানোর অপরাধটা তার নিজের। আর এই অপরাধের শাস্তিই সে পাবে। পরিবারের বিলাপ করার অপরাধে সে অপরাধী নয়। এজন্য প্রথম অবস্থায়ও হযরত আয়েশা রাযি.-এর সিদ্ধান্তই ঠিক। ইমাম শাফেঈ রহ. ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এবং ইমাম আবু হানীফা রহ. আলোচ্য মাসআলায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর অনুসরণ করেছেন。
টিকাঃ
১. এখানে একটি মাসআলা বুঝতে হবে, তা এই যে, প্রিয়জনের মৃত্যুতে স্বভাবতই যে কান্না আসার কথা তাতে গুনাহ নেই। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই পুত্র কাসিমের মৃত্যুতে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে মৃত্যুশোকে কাঁদা, বিলাপ করা, কাপড়চোপড় ছেঁড়া, শরিয়তবিরোধী বাক্য মুখে আনা, মাথায় মাটিতে হাত চাপড়ানো ইত্যাদি বাড়াবাড়িগুলো শরীয়তে নিষিদ্ধ। এজন্য বেশ কিছু হাদীসে স্পষ্টভাবেই এসেছে, যে ধরনের কান্নায় শরীয়তবিরোধী বিষয়গুলো এসে যায় সে ধরনের কান্না নিষিদ্ধ। সাধারণ দুঃখ, কান্না ও অশ্রুপাত নিষিদ্ধ নয়。
২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম: কিতাবুল জানাইয।
১. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয।
২. সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয।
৩. জামে তিরমিযী, কিতাবুল জানাইয।
৪. মুয়াত্তা, ইমাম মুহাম্মাদ রহ., কিতাবুল জানাইয。