📄 বারবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনায় ভুল কম হওয়ার একটি বিশেষ কারণ এই যে, অন্যান্য সাহাবীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একবার কোনো কথা শুনে বা দেখেই বর্ণনা করতেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর নীতি ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় ভালো করে বুঝতে না পারতেন, ততক্ষণ সেটা বর্ণনা করতেন না। যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কথা বুঝে না আসত, তা হলে বারবার জিজ্ঞেস করে সেটা স্পষ্ট করেই ক্ষান্ত হতেন।' এরকম সুযোগ অন্যদের হওয়াও কঠিন ছিল। এরকম অনেক বিষয় আছে, যেগুলোতে তাঁর বর্ণনা আর অন্যদের বর্ণনার মধ্যে ভালোমন্দ তুলে ধরার ক্ষেত্রে, কারণ উল্লেখ করার ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ব্যবধান মনে হয়। সামনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।
যেই বর্ণনাগুলো তিনি সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনতেন না, বরং অন্য কারও থেকে শুনতেন, সেই বর্ণনাগুলোর ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং ভালোভাবে জেনে নিয়ে তার পরই ভরসা করতেন। একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। এক বছর পর যখন তিনি এলেন, তখন একজনকে পাঠিয়ে পুনরায় হাদীসটি শুনতে বললেন। তিনি কোনোরকম কম-বেশি না করে হুবহু সেভাবেই বলে দিলেন। লোকটি ফিরে এসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সামনে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করল। হযরত আয়েশা রাযি. অবাক হয়ে বললেন, বাহ, আমরের বেটা ভালোই মনে রেখেছে。
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, كتاب العلم ।
৩. সহীহ বুখারী, باب ما يذكر من ذم الرأي ।
📄 হাদীস-বর্ণনায় সতর্কতা
একই রীতির ভিত্তিতে, তিনি যখন কোনো হাদীস অন্য কারও কাছে শুনতেন, এবং তাঁর কাছে কেউ ওই বিষয়ে শুনতে আসত, তখন তিনি নিজে না বলে বরং সেই বর্ণনাকারীর কাছেই পাঠিয়ে দিতেন। এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি তাঁর আরও একটি উদ্দেশ্য থাকত যে, হাদীস-বর্ণনায় মধ্যস্থতা যত কম হবে এবং সনদ যত উঁচু হবে ততই ভালো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পরে ঘরে এসে সুন্নাত পড়তেন; অথচ কঠিন নিষেধাজ্ঞা ছিল যে, আসরের পরে কোনো নামায পড়া যাবে না। কিছু লোক হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিকট প্রতিনিধি পাঠিয়ে জানতে চাইল, আপনার পক্ষ থেকে এমন কথা বর্ণনা করা হয়ে থাকে। প্রকৃত বিষয়টি কী? তিনি উত্তর দিলেন, হযরত উম্মে সালামা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করো। মূল বর্ণনাকারী তিনিই। একইভাবে এক ব্যক্তি মোজার ওপর মাসেহ সম্পর্কে জানতে চাইল। তিনি বললেন, হযরত আলী রাযি.-কে জিজ্ঞেস করো। তিনি সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থাকতেন।
ইমাম হাযেমি রহ. আল-ইতিবার গ্রন্থে (হায়দারাবাদের ছাপা) হাদীসের বিষয়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর রীতি ও অভ্যাসের প্রতি খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করেছেন।
📄 সাহাবা কেরামের বর্ণনার ভুল-সংশোধন
হযরত আয়েশা রাযি. শুধু নিজের বর্ণনাকেই ভুল-ত্রুটি-মুক্ত রাখতে চাইতেন তা নয়; বরং অন্যদের বর্ণনারও শুদ্ধ্যশুদ্ধি করে দিতেন। হাদীস-শাস্ত্রে বরং পুরো ইসলাম ধর্মে তাঁর একটি বড় অবদান এই যে, তিনি সমসাময়িকদের ত্রুটি-বিচ্যুতির কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের অপনোদন করেছেন। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এটিকে 'ইস্তিদরাক' (ভুল সংশোধন) বলে। হাদীসবিশারদগণ অনেকেই তাঁর এই সংশোধনীগুলোর সংকলন করেছেন। এগুলোর সর্বশেষ সংকলন হলো عَيْنُ الْإِصَابَةِ فِي مَا اسْتَدْرَكَتْهُ عَائِشَةُ عَلَى الصَّحَابَةِ
সংকলক অমূল্য রিসালাটিকে ফিকহশাস্ত্রের ক্রমানুসারে অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস দান করেছেন।'
টিকাঃ
১. আলোচ্য রিসালাটি আমি হায়দারাবাদ দাক্ষিণাত্বের একটি ছাপাখানায় পেয়েছিলাম। সেটিই আমার কাছে আছে।
📄 হাদীস-শাস্ত্রের মূলনীতিগুলোর প্রাথমিক ধারণা
সাহাবা কেরামের যুগে যদিও হাদীস-শাস্ত্রের মূলনীতিগুলো কোনো শাস্ত্রীয় রূপ পরিগ্রহ করেনি; তথাপি প্রাথমিক ও মৌলিক নীতিমালা বিন্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। হযরত আয়েশা রাযি. সমসাময়িকদের প্রতি যে সংশোধনীগুলো আরোপ করেছিলেন, তাতে গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা নিম্নোক্ত ধারাগুলো পাই: