📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বর্ণিত হাদীস-সংখ্যা

📄 বর্ণিত হাদীস-সংখ্যা


উপর্যুক্ত ছক থেকে আমরা জানতে পেরেছি, হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস-সংখ্যা সর্বসাকুল্যে দুই হাজার দুইশো দশটি। এর মধ্যে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে দুইশো ছিয়াশিটি। একশো চুয়াত্তরটি হাদীস উভয় গ্রন্থে এসেছে। চুয়ান্নটি হাদীস এসেছে শুধু সহীহ বুখারীতে এবং আটান্নটি হাদীস এসেছে শুধু সহীহ মুসলিমে। এই হিসেবে সহীহ বুখারীতে তাঁর দুইশো আটাশটি এবং সহীহ মুসলিমে দুইশো বত্রিশটি হাদীস আছে। অবশিষ্ট হাদীসগুলো আছে অন্যান্য গ্রন্থে। ইমাম আহমাদ রহ. তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ মুসনাদ-এর ষষ্ঠ খণ্ডে শুধু হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসগুলোই এনেছেন, যা মিশরের ছাপা এই সুবিশাল গ্রন্থটির দুইশো তেপ্পান্নটি পৃষ্ঠা বিস্তৃত। যদি হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসগুলোকে আলাদা করা যায়, তা হলে একটি স্বতন্ত্র-সুবিশাল গ্রন্থে পরিণত হবে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হাদীস : রেওয়ায়েত ও দিরায়াত

📄 হাদীস : রেওয়ায়েত ও দিরায়াত


শুধু বর্ণনার সংখ্যাধিক্যই হযরত আয়েশা রাযি.-কে হাদীসের জগতে বিশিষ্ট করেনি। এ জগতে তাঁর বিশিষ্টতার মূল কারণ হলো বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণিত বিষয়ের বুঝ ও গভীর উপলব্ধি অর্থাৎ এর সূক্ষ্মতা, নিগূঢ়তা, তাৎপর্য-অনুধাবন এবং সে আলোকে শরঈ বিধান-উদ্ঘাটন। যে সকল সাহাবী 'মুকিললীন'- অর্থাৎ সবচেয়ে কম হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে বড় বড় ফকীহ ও মুজতাহিদ ছিলেন। কিন্তু যাঁরা নিছক সংখ্যাধিক্যে এগিয়ে গেছেন, তাদের অধিকাংশই হাদীসের গভীরে পৌঁছতে ছিলেন অক্ষম। সর্বাধিক বর্ণনাকারী সাতজন সাহাবীর মধ্যে পাঁচজনই শাস্ত্রীয় মূলনীতিবিদগণের দৃষ্টিতে নিছক রাবী হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছেন; ফকীহ ও মুজতাহিদ সাহাবী হিসেবে তাঁদের মূল্যায়ন নেই। কেননা হাদীসের রেওয়ায়েত ও বর্ণনার যে একটি বিশাল ভাণ্ডার আমাদের আছে, তাতে হযরত আবু হুরায়রা রাযি., হযরত ইবনে উমর রাযি., হযরত আনাস রাযি., হযরত জাবের রাযি. এবং হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাযি. থেকে দিরায়াত তথা ফিকহী ইজতিহাদ তেমন পাওয়া যায় না। এই বিশেষত্বটুকু হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. লাভ করেছেন। তাঁরা বর্ণনার সংখ্যাধিক্যে যেমন এগিয়ে, তেমনি বর্ণিত বিষয়ের গভীর বুঝ ও উপলব্ধিতেও এগিয়ে, ফিকহ ও ইজতিহাদের দিক থেকেও এগিয়ে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বর্ণিত বিষয়ের কল্যাণ ও ইতিবাচকতা-অনুধান

📄 বর্ণিত বিষয়ের কল্যাণ ও ইতিবাচকতা-অনুধান


তবে হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাদীসের জগতের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সীমা এখানেই শেষ নয়। বর্ণনার সংখ্যাধিক্য ও বর্ণিত বিষয়ের গভীর উপলব্ধির পাশাপাশি তাঁর আরও একটি বিশেষত্ব এই-তিনি যে বিধি-নিষেধ ও ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করতেন, তা যেই কল্যাণ ও ইতিবাচকতাকে লক্ষ্য করে, তাও স্পষ্ট করতেন। সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি., হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.-তিনজন থেকেই একই বিষয়ের বর্ণনা আছে যে, জুমআর দিন গোসল করতে হবে। আমরা তিনজনের বর্ণনাই উদ্ধৃত করছি:
হযরত ইবনে উমর রাযি.-এর বর্ণনা:
سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ مَنْ جَاءَ مِنْكُمُ الْجُمْعَةَ فَلْيَغْتَسِلْ
অর্থ: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জুমআর নামাযে আসবে, সে যেন গোসল করে।
হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাযি.-এর বর্ণনা:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ غُسْلُ يَوْمِ الْجُمْعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জুমার দিন গোসল করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব।
এই বিষয়টিকে হযরত আয়েশা রাযি. এভাবে বর্ণনা করছেন:
قَالَتْ كَانَ النَّاسُ يَنْتَابُوْنَ مِنْ مَّنَازِلِهِمْ وَ الْعَوَالِي فَيَأْتُوْنَ فِي الْغُبَارِ تُصِيبُهُمُ الْغُبَارُ وَالْعَرَقِ فَيَخْرُجُ مِنْهُمُ الْعَرَقُ فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنْسَانٌ مِّنْهُمْ وَ هُوَ عِنْدِي فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَو أَنَّكُمْ تَطَهَّرْتُمْ لِيَوْمِكُمْ هَذَا.
অর্থ: লোকেরা নিজ নিজ বাড়ি থেকে এবং মদীনার বিভিন্ন বসতি থেকে আসত। তারা ধুলা ও ঘামে একাকার হয়ে থাকত। এভাবে একদিন একজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তিনি আমার কাছেই বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যদি তোমরা আজকে গোসল করে আসতে তা হলে ভালো হতো।
এই একই বিষয়ে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়:
قَالَتْ عَائِشَةُ كَانَ النَّاسُ مَهَنَةَ أَنْفُسِهِمْ كَانُوْا إِذَا رَاحُوْا إِلَى الْجُمْعَةِ رَاحُوْا فِي هَيْئَتِهِمْ فَقِيلَ لَهُمْ لَوِ اغْتَسَلْتُمْ
অর্থ: অনেক শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ ছিল। তারা কাজের শরীর নিয়েই জুমার নামাযে চলে আসত। এজন্য তাদের বলা হলো, তোমরা গোসল করে এলে ভালো হতো।'
কোনো এক বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন, কোরবানির গোশত তিন দিনের মধ্যেই খেয়ে ফেলতে হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. এবং হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাযি.-সহ অনেকে এই নির্দেশটিকে স্থায়ী মনে করেছেন।' এজন্য তারা এরকম দিক-নির্দেশনাই দিতেন। পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা রাযি. মনে করতেন, এটা জরুরি নয়; করলে ভালো, না করলে সমস্যা নেই। এজন্যই এ বিষয়টিকে তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছিলেন,
الصَّحِيَّةُ كُنَّا نُمَلِّحُ مِنْهَا فَنُقَدِّمُ بِهِ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ فَقَالَ لَا تَأْكُلُوْا إِلَّا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَ لَيْسَتْ بِعَزِيمَةٍ وَ لَكِنْ أَرَادَ أَنْ نُّطْعِمَ مِنْهُ وَ اللَّهُ أَعْلَمُ
অর্থ: আমরা কোরবানির গোশত লবণ দিয়ে মেখে রেখে দিতাম। মদীনায় আমরা এগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থাপন করতাম। একদিন তিনি বললেন, তোমরা তিন দিনের বেশি খেয়ো না। তবে এটা জরুরি নয়। তিনি আসলে চাইতেন যে, আমরা অন্যদেরও খাওয়াই।'
অতঃপর অন্য একটি বর্ণনায় এর মূল কারণই তিনি বলে দিলেন। একজন লোক জিজ্ঞেস করল, উম্মুল মুমিনীন, কোরবানির গোশত কি তিনদিনের বেশি খাওয়া নিষেধ? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন,
لَا وَ لَكِنْ قَلَّ مَنْ كَانَ يُضَحِّي مِنَ النَّاسِ فَأَحَبَّ أَنْ يُطْعَمَ مَنْ لَّمْ يَكُنْ يُضَحِّي
অর্থ: না, নিষেধ নয়; আসলে তখন কোরবানি-করা লোকের সংখ্যা খুব কম ছিল। এজন্য তিনি চাইতেন, যেই লোকগুলো কোরবানি দিতে পারেনি, তাদেরকেও খাওয়ানো হোক।'
আবু দাউদ ছাড়া সিহাহ-র সবগুলো কিতাবেই এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরির গোশত খুব পছন্দ করতেন; কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে এটা খুব পছন্দ করতেন তা নয়; বরং ওই সময় গোশত পাওয়াই যেত না, আর এটা তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি রান্না করা যেত, তাই তিনি এটাই খেতেন।
বিভিন্ন হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর কাউকে না কাউকে খায়বারে পাঠিয়ে দিতেন। সে গিয়ে ফসলের ধারণা নিয়ে আসত। বর্ণনাকারীগণ শুধু এটুকু বলেই রেখে দিয়েছেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. এই বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,
وَ إِنَّمَا كَانَ أَمْرُ النَّبِيِّ بِالْخَرَصِ لِكَيْ يُحْصِيَ الزَّكَوةَ قَبْلَ أَنْ تُؤْكَلَ الثَّمَرَةُ وَ تُفَرَّقَ
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফসলের আন্দাজ করতে পাঠাতেন এজন্য যে, এতে করে খাদ্য বণ্টনের পূর্বে যাকাতের ধারণা নেওয়া সহজ হতো।'

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, كتاب الجمعة، باب وقت الجمعة إذا زالت الشمس হাদীস নং ৯০৩। আবু দাউদ, كتاب الطهارة، باب الرخصة في ترك الغسل يوم الجمعة হাদীস নং ৩৫২
২. তিরমিযী, أبواب الأضاحي، باب في كراهية أكل الأضحية فوق ثلاثة أيام হাদীস নং ১৫১০।
১. সহীহ বুখারী, كتاب الأضاحي، باب ما يؤكل من لحوم الأضاحي হাদীস নং ৫৫৭০।
২. তিরমিযী, كتاب الأضاحي، باب في الرخصة في أكل لحوم الأضاحي ... হাদীস নং ১৫১১।
৩. তিরমিযী।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৩।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বারবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া

📄 বারবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া


হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনায় ভুল কম হওয়ার একটি বিশেষ কারণ এই যে, অন্যান্য সাহাবীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একবার কোনো কথা শুনে বা দেখেই বর্ণনা করতেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি.-এর নীতি ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় ভালো করে বুঝতে না পারতেন, ততক্ষণ সেটা বর্ণনা করতেন না। যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কথা বুঝে না আসত, তা হলে বারবার জিজ্ঞেস করে সেটা স্পষ্ট করেই ক্ষান্ত হতেন।' এরকম সুযোগ অন্যদের হওয়াও কঠিন ছিল। এরকম অনেক বিষয় আছে, যেগুলোতে তাঁর বর্ণনা আর অন্যদের বর্ণনার মধ্যে ভালোমন্দ তুলে ধরার ক্ষেত্রে, কারণ উল্লেখ করার ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ব্যবধান মনে হয়। সামনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।
যেই বর্ণনাগুলো তিনি সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনতেন না, বরং অন্য কারও থেকে শুনতেন, সেই বর্ণনাগুলোর ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং ভালোভাবে জেনে নিয়ে তার পরই ভরসা করতেন। একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। এক বছর পর যখন তিনি এলেন, তখন একজনকে পাঠিয়ে পুনরায় হাদীসটি শুনতে বললেন। তিনি কোনোরকম কম-বেশি না করে হুবহু সেভাবেই বলে দিলেন। লোকটি ফিরে এসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সামনে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি করল। হযরত আয়েশা রাযি. অবাক হয়ে বললেন, বাহ, আমরের বেটা ভালোই মনে রেখেছে。

টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, كتاب العلم ।
৩. সহীহ বুখারী, باب ما يذكر من ذم الرأي ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00