📄 রওয়াআত (দৃশ্যদর্শন) সম্পর্কিত ভুল ধারণা
রযাআত সম্পর্কে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, কুরআন মাজীদে প্রথমে দশ ফোঁটা দুধ পান করলে রেযাআত সাব্যস্ত হওয়ার কথা এসেছে, তারপর পাঁচ ফোঁটার কথা এসেছে; এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুরআন মাজীদে এই বিধানই ছিল।' কিন্তু সকলে একমত যে, কুরআনে এমন কোনো আয়াত ছিল না। যদি হযরত আয়েশা রাযি. সত্যিই এমন কিছু বলে থাকেন, তা হলে, আমাদের বলতেই হবে যে, তিনি কোনোভাবে ভুল বুঝেছেন; অথবা তিনি শুধু বলেছেন, আগে এমন ছিল। এমন সংযোজন যে, কুরআনে এমন ছিল-এটা নির্ঘাত বর্ণনাকারীর ভুল।'
টিকাঃ
২. সহীহ মুসলিম: কিতাব-রাযাআত।
৩. কিছু কিছু বর্ণনাকারী (যেমন: দারাকুতনী, ইবনে মাজাহ) কিতাবুর রযাআহ-অংশে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাযাআত-সংক্রান্ত হাদীসটি একটি কাগজে লেখা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন এটা তাঁর শিয়রে রাখা ছিল। আমরা তাঁর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। হঠাৎ একটি বকরি এসে কাগজটি মুখে নিয়ে চিবিয়ে নষ্ট করে ফেলে। হাদীসটি সর্বদিক থেকে 'বাতিল'-অগ্রহণযোগ্য। সকলে একমত যে, মৃত্যুশয্যায় কোনো আয়াত নাজিল হয়নি। যদি আয়াতটি আগে নাজিল হয়ে থাকে তা হলে তা অবশ্যই ওহীলেখক সাহাবীদের কাছে থাকত এবং সাহাবা কেরাম অনেকেই জানতে পারতেন। মূলত হাদীসটি বর্ণনাকারী হলেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক। ইনি হাদীস এবং আহকামের জগতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব নন। সহীহ মুসলিম, মুয়াত্তা-সহ আরও উচ্চ মর্যাদার কিতাবগুলোতেও হযরত আয়েশা রাযি.-এর 'পাঁচ ফোঁটা দুধ' সংক্রান্ত হাদীসটি এসেছে। কিন্তু কোথাও বকরি এসে কাগজটি খেয়ে গেছে—এমন কথা নেই। এটা কোনো দুষ্ট লোকের সংযোজন।
📄 হাদীস শরীফ
হযরত আয়েশা রাযি. এবং পবিত্র স্ত্রীগণ
হাদীসশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় মূলত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ তাঁর পবিত্র সত্তাই এ মহিমাময় শাস্ত্রের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং যিনি যত বেশি তাঁর নৈকট্য ও সাহচর্য লাভ করেছেন, জ্ঞানের এ অমূল্য শাখায় তার পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তিও তত বেশি। ভাগ্যক্রমে এ সুযোগ ও সম্ভাবনায় এগিয়ে ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.।
📄 হযরত আয়েশা রাযি. এবং পবিত্র স্ত্রীগণ
হাদীসশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় মূলত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ তাঁর পবিত্র সত্তাই এ মহিমাময় শাস্ত্রের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং যিনি যত বেশি তাঁর নৈকট্য ও সাহচর্য লাভ করেছেন, জ্ঞানের এ অমূল্য শাখায় তার পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তিও তত বেশি। ভাগ্যক্রমে এ সুযোগ ও সম্ভাবনায় এগিয়ে ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.।
হিজরতের তিন বছর পূর্বে তাঁর বিবাহ হয়। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন লাগাতার তাঁদের ঘরে আসা-যাওয়া করেছেন।' অবশ্য হিজরতের পর ছয় মাস এই মহান মানুষটিকে দেখার পরম সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। এরপর শাওয়াল মাসের কোনো এক সৌভাগ্যময় দিনে নববী-নীড়ের পবিত্র আঙিনায় পদার্পণ করেন উম্মুল মুমিনীনের 'তাজ' মস্তকে ধারণ করে। এরপর থেকে, অষ্টপ্রহর এই পবিত্র সত্তার মোবারক সান্নিধ্যলাভে ধন্য হয়েছেন আমৃত্যু। ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়টুকু তাঁর ছেলেবেলায় কাটলেও, প্রকৃতিগত বুদ্ধিমত্তা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল যথার্থ পরিপূরক। একজন সহধর্মিনী হিসেবে হযরত সাওদা রাযি. হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কয়েক মাস বেশি পেয়েছিলেন; কিন্তু মেধা-প্রতিভার তারতম্য ছাড়াও, সার্বিক বিচারে, নৈকট্য ও সাহচর্য লাভের অগ্রগামিতা হযরত আয়েশা রাযি.-এরই ভাগে। কেননা হযরত সাওদা রাযি. বয়সভারে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।' এমনকি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর বেশ কিছুকাল আগেই স্বামীসেবায়ও অপরাগ হয়ে পড়েন তিনি।' পক্ষান্তরে, হযরত আয়েশা রাযি. যুবতী ছিলেন। যতই দিন যাচ্ছিল, তাঁর বুঝ ও বুদ্ধি এবং ধারণক্ষমতা ততই বাড়ছিল। এবং এভাবেই, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সেবাযত্ন করার সুযোগ ও সৌভাগ্যলাভে ধন্য হন। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভের সুযোগও তাঁরই বেশি হয়েছে।
হযরত সাওদা রাযি. ছাড়া অন্য স্ত্রীগণ হযরত আয়েশা রাযি.-এর পরে নববী-সান্নিধ্যে আসেন। আট দিনে একদিন তাঁদের স্বামীসেবার সুযোগ হতো। পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ সৌভাগ্য হতো দুই দিন। কেননা হযরত সাওদা রাযি. নিজের দিনটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিলেন।' তা ছাড়া, তাঁর ঘরটি ছিল মসজিদে নববীর সঙ্গে লাগানো, যা ছিল দরসে নববীর মূল কেন্দ্র। এই বিবেচনায়, পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে কেউই হাদীসে নববীর জ্ঞানে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সমকক্ষা ছিলেন না।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, বাবু হিজরত।
২. باب جواز هبتها نوبتها لضرتها
১. সহীহ মুসলিম, ২ অধ্যায়, নুবা হাঝা নুবা লিজারিহা
২. সহীহ মুসলিম, ১ অধ্যায়, নুবা হাঝা নুবা লিজারিহা
📄 আকাবির সাহাবার রেওয়ায়েত কম হওয়ার কারণ
হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যে— কি নারী সাহাবী, কি উম্মাহাতুল মুমিনীন; আর কি পুরুষ সাহাবীগণ— অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউই তাঁর সম-মর্যাদার দাবি করতে পারতেন না। হযরত আবু বকর রাযি., হযরত উমর রাযি., হযরত উসমান রাযি. এবং আলী রাযি. প্রমুখ মহিমান্বিত ব্যক্তিবর্গ যদিও নববী-সান্নিধ্য, ধর্মতত্ত্ব ও যোগ্যতায় হযরত আয়েশা রাযি. থেকে অনেক উঁচুমানের ছিলেন; কিন্তু একে তো স্বাভাবিক রীতি অনুসারে স্ত্রী কয়েক মাসে যতখানি জানতে পারে, বন্ধুমহল কয়েক বছরেও তা পারে না; অন্য দিকে, এই মহিমান্বিত ব্যক্তিবর্গকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরই পর্যায়ক্রমে খেলাফতের গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দিতে হয়েছে; তাই হাদীস- বর্ণনার সুযোগ তাঁদের কমই হয়েছে; এরপরও তাঁদের সূত্রে বর্ণিত অল্প যে কটি হাদীস সংরক্ষিত হয়েছে, অধিকাংশই রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন-কানুন ও সংবিধান বলা চলে, যা আমাদের ফিকহশাস্ত্রের মূল ভিত্তি। এজন্য প্রকৃত হাদীস-বর্ণনার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন শুধুমাত্র ওইসব সাহাবীই, যাঁরা রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক বিভিন্ন দায় ও দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নির্বিঘ্ন জীবন-যাপন করেছেন।
বড় বড় সাহাবা কেরাম কর্তৃক বর্ণিত হাদীস-সংখ্যা কম হওয়ার আরও একটি রহস্য আছে। মূলত তাঁদের যুগটি ছিল স্বয়ং সাহাবীগণের যুগ। সাহাবা কেরাম প্রত্যেকেই এক-এক জন ছিলেন হাদীসের জ্ঞানভাণ্ডার। তাঁদের অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হতো খুবই কম। তাবেঈগণ—যাঁরা এই অমীয় সুধার মধুসরোবর থেকে অতৃপ্ত ছিলেন—জন্মগ্রহণ করেছেন মোটামুটি বিশ পঁচিশ বছর পরে। তাঁরা তাঁদের প্রিয় নবীর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে জানার জন্য ছিলেন উদগ্রীব। কিন্তু বড় বড় সাহাবা কেরাম ততদিনে পরপারের যাত্রী; পৃথিবী ও পৃথিবীবাসী এই মহাপুরুষদের হারিয়ে তখন অনেকখানি নিঃস্ব হয়ে গেছে। কমবয়সী সাহাবা কেরাম তখন শক্ত-সমর্থ যুবক অথবা প্রৌঢ়। হিজরী প্রথম শতক পর্যন্ত সাহাবা কেরামের এই শেষ পরম্পরাটুকুই পৃথিবীর বুকে হাদীসে নববীর আলো ছড়িয়েছিল। এজন্য ‘মুকসিরীন’ বা সর্বাধিক হাদীসবর্ণনাকারী সাহাবীর মর্যাদা পেয়েছেন তাঁরাই। তাঁদের বর্ণনায়ই হাদীসের সংগ্রহশালা পুষ্ট হয়েছে।'
টিকাঃ
১. ইবনে সাদ, ২য় খণ্ড, ২য় পরিচ্ছেদ।