📄 তাফসীর-শাস্ত্রের একটি মূলনীতি
প্রকৃত প্রস্তাবে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর এই সংক্ষিপ্ত আলোকপাত তাফসীর-শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হয়ে আছে। যে কোনো আয়াতের তাফসীরে এই মূলনীতি সামনে রাখতে হয়। আরবদের বাচনভঙ্গি অনুযায়ী শব্দের যে অর্থটি ফুটে ওঠে, সেটিকেই কুরআনের উদ্দিষ্ট অর্থ ধরতে হবে, অন্যটি নয়; নয়তো, যেমনটি উম্মুল মুমিনীন বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা অন্য শব্দে অন্যভাবে কথাটি বলতে পারতেন, তখন ওই অর্থটিই বিবেচ্য হতো।
📄 কিরাতে শাযযাহ (ব্যতিক্রমী কেরাত)
কুরআন মাজীদে বিদ্যমান আয়াত, শব্দ বা বর্ণ ছাড়াও অন্য কোনো আয়াত, শব্দ বা বর্ণ যদি গায়রে মুতাওয়াতির সনদে বর্ণিত হয়, তা হলে সেটাকে বলে 'কেরাতে শাযযাহ'। এ ধরনের দু-একটি কেরাতও হযরত আয়েশা রাযি. থেকে পাওয়া যায়। যেমন :
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى (صَلَوةِ الْعَصْرِ)
অর্থ: তোমরা নামাযের প্রতি যত্নশীল হও, যত্নশীল হও মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি (অর্থাৎ আসরের নামাযের প্রতি)।
আবু ইউনুস হযরত আয়েশা রাযি.-এর গোলাম ছিলেন। তিনি বলেন, হযরত আয়েশা রাযি. আমাকে দিয়ে কুরআন লিখিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন এই আয়াতে পৌঁছবে তখন আমাকে জানাবে। আমি যখন এই আয়াতে পৌঁছলাম, তখন তিনি এভাবেই লিখতে বললেন। তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এভাবেই শুনেছি।' মূল কুরআনে صَلُّوةِ الْعَصْرِ শব্দটি নেই।
বাস্তবতা হলো, তিনি صَلَوةِ الْعَصْرِ কুরআনের অংশ হিসেবে লেখাননি; বরং ব্যাখ্যা হিসেবে লিখিয়েছেন। বর্ণনাকারী বুঝতে ভুল করেছেন।
টিকাঃ
১. জামে তিরমিযী: তাফসীর-আলোচ্য আয়াত।
📄 রওয়াআত (দৃশ্যদর্শন) সম্পর্কিত ভুল ধারণা
রযাআত সম্পর্কে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, কুরআন মাজীদে প্রথমে দশ ফোঁটা দুধ পান করলে রেযাআত সাব্যস্ত হওয়ার কথা এসেছে, তারপর পাঁচ ফোঁটার কথা এসেছে; এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুরআন মাজীদে এই বিধানই ছিল।' কিন্তু সকলে একমত যে, কুরআনে এমন কোনো আয়াত ছিল না। যদি হযরত আয়েশা রাযি. সত্যিই এমন কিছু বলে থাকেন, তা হলে, আমাদের বলতেই হবে যে, তিনি কোনোভাবে ভুল বুঝেছেন; অথবা তিনি শুধু বলেছেন, আগে এমন ছিল। এমন সংযোজন যে, কুরআনে এমন ছিল-এটা নির্ঘাত বর্ণনাকারীর ভুল।'
টিকাঃ
২. সহীহ মুসলিম: কিতাব-রাযাআত।
৩. কিছু কিছু বর্ণনাকারী (যেমন: দারাকুতনী, ইবনে মাজাহ) কিতাবুর রযাআহ-অংশে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাযাআত-সংক্রান্ত হাদীসটি একটি কাগজে লেখা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন এটা তাঁর শিয়রে রাখা ছিল। আমরা তাঁর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। হঠাৎ একটি বকরি এসে কাগজটি মুখে নিয়ে চিবিয়ে নষ্ট করে ফেলে। হাদীসটি সর্বদিক থেকে 'বাতিল'-অগ্রহণযোগ্য। সকলে একমত যে, মৃত্যুশয্যায় কোনো আয়াত নাজিল হয়নি। যদি আয়াতটি আগে নাজিল হয়ে থাকে তা হলে তা অবশ্যই ওহীলেখক সাহাবীদের কাছে থাকত এবং সাহাবা কেরাম অনেকেই জানতে পারতেন। মূলত হাদীসটি বর্ণনাকারী হলেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক। ইনি হাদীস এবং আহকামের জগতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব নন। সহীহ মুসলিম, মুয়াত্তা-সহ আরও উচ্চ মর্যাদার কিতাবগুলোতেও হযরত আয়েশা রাযি.-এর 'পাঁচ ফোঁটা দুধ' সংক্রান্ত হাদীসটি এসেছে। কিন্তু কোথাও বকরি এসে কাগজটি খেয়ে গেছে—এমন কথা নেই। এটা কোনো দুষ্ট লোকের সংযোজন।
📄 হাদীস শরীফ
হযরত আয়েশা রাযি. এবং পবিত্র স্ত্রীগণ
হাদীসশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় মূলত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অর্থাৎ তাঁর পবিত্র সত্তাই এ মহিমাময় শাস্ত্রের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সুতরাং যিনি যত বেশি তাঁর নৈকট্য ও সাহচর্য লাভ করেছেন, জ্ঞানের এ অমূল্য শাখায় তার পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তিও তত বেশি। ভাগ্যক্রমে এ সুযোগ ও সম্ভাবনায় এগিয়ে ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.।