📄 মুসহাফে আয়েশা রাযি.
আবু ইউনুস ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর গোলাম।' তিনি লিপিশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তার হাতেই নিজের মুসহাফ লিখিয়েছিলেন।² অনারবদের আধিক্যের কারণে, কেরাতের ভিন্নতার প্রভাব ইরাকেই পড়ে সবচেয়ে বেশি। ইরাক থেকে একজন ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং আবেদন করেন, উম্মুল মুমিনীন, আমাকে আপনার মুসহাফ শরীফ যদি দেখাতেন।³ কারণ জানতে চাইলে লোকটি বললেন, আমাদের ওখানে এখনো কুরআন মাজীদ সুবিন্যস্ত নয়। আমার ইচ্ছা, আমার মুসহাফটি আপনার মুসহাফের সঙ্গেই মিলিয়ে নেব। তিনি বললেন, সূরা আগে পরে হলে কোনো সমস্যা হয় না। এরপর তিনি নিজ মুসহাফের সূরাবিন্যাসের অনুলিপি প্রদান করলেন।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩।
২. সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা বাকারা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩।
৩. সহীহ বুখারী: বাব-জামউল কুরআন।
৪. সহীহ বুখারী: বাব-তালিফুল কুরআন।
📄 কুরআন মাজীদ এবং উম্মুল মুমিনিন রাযি.
কোনো আয়াতের মর্ম উদ্ধারে অসমর্থ হলে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে জেনে নিতেন-বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের অনেক হাদীস পাওয়া যায়। উপরন্তু উম্মাহাতুল মুমিনীন রাযি.- এর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিল:
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ
অর্থ: তোমাদের ঘরে কুরআনের যে আয়াতগুলো এবং হেকমতের যে বাণীগুলো পড়ে শোনানো হয়, সেগুলো আত্মস্থ রেখো। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৪)
মহান আল্লাহর এই নির্দেশের বাস্তবায়নও আবশ্যক ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাযে কুরআন মাজীদের বড় বড় সূরা ও আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করতেন। তিনি অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে, চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সঙ্গে সেগুলো তেলাওয়াত করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. রাসূলের এই সুগভীর নামায ও আবেদনময় তেলাওয়াতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।' কুরআন মাজীদের অবতরণ আর কোনো স্ত্রীর বিছানাতেই হয়নি। কুরআন অবতীর্ণ হলে, অধিকাংশ সময়, সবার আগে তিনিই জানতে পারতেন। তিনি বলেন, সূরা বাকারা এবং সূরা নিসা যখন নাজিল হয়, তখন আমি তাঁর কাছেই ছিলাম।° মোটকথা, কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রগুলোই এমন ছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি. প্রতিটি আয়াত ও সূরার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মর্ম ও তাৎপর্য এবং বাচনভঙ্গি ও প্রমাণক্ষেত্র সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করতেন। আর তাই—অনুধাবন, প্রয়োগ ও বিশ্লেষণে এবং শরীয়তের বিধি-বিধান প্রণয়ন ও উদ্ঘাটনে গভীর থেকে গভীরে পৌঁছে যেতে পারতেন।
তিনি প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসায় সর্বপ্রথম কুরআন কারীমে মনোনিবেশ করতেন। আকাইদ, আহকাম এবং ফিকহ তো আছেই; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও কর্মও বিশ্লেষণ করতেন কুরআনের আলোকে; যদিও তা কোনো ঐতিহাসিক বিষয়। এবং ঘরের মানুষ ছিলেন তিনি নিজেই। উদাহরণস্বরূপ, একবার কিছু লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল। তারা আবেদন করলেন, মাতা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রমাধুরী সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, তোমরা কুরআন পড় না? আপাদমস্তক তিনি ছিলেন কুরআন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, 'তোমরা সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?'
আকায়েদ, আহকাম, ফিকহ-ইসলামী মতবাদ ও বিশ্বাস, ইসলামী জীবন-দর্শন ও জীবন-বিধানের প্রণয়ন ও পর্যালোচনায় এবং উদ্ঘাটন ও হেতুনির্দেশে তিনি যেভাবে কুরআন মাজীদের উদ্ধৃতি দিতেন, তা বিভিন্ন শিরোনামের অধীনে আলোচনা করা হবে। আমরা দেখব, বস্তুর মর্ম-মূলে কী সহজে তাঁর হাত যেত। বিষয়ের সারবত্তায় কী সহজে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হতো।
টিকাঃ
৫. তালীম ও তারবিয়াত অংশে দেখুন।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২।
২. সহীহ বুখারী: বাব—তালিফুল কুরআন।
৩. সহীহ বুখারী: বাব—তালিফুল কুরআন।
১. আবু দাউদ: কিয়ামুল লাইল। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৪।
📄 হাদীস গ্রন্থগুলোতে তাফসীরের পরিমাণ
সাহাবা কেরাম রাযি. থেকে কুরআন মাজীদের তাফসীর বিশুদ্ধ সূত্রে খুব কমই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী রহ. যদিও একটি বিশাল অংশ নিবেদন করেছেন শুধু তাফসীরের ওপর; কিন্তু সর্বোচ্চ তাবেঈদের পক্ষ থেকে কোনো আয়াতের শব্দার্থ এনেছেন; অথবা, নিজ রীতি অনুসারে, সামান্য থেকে সামান্য সম্পর্কেরও সূত্র ধরে একের পর এক ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। প্রকৃত তাফসীর বলতে যা বোঝায়, খুবই কম। তিরমিযী শরীফেও সেরকম তাফসীর তেমন নেই বললেই চলে।
অবশ্য ইমাম মুসলিম রহ. গ্রন্থের শেষাংশে অত্যন্ত সচেতনতা ও সতর্কতার সঙ্গে তাফসীরের সারনির্যাস তুলে এনেছেন; কিন্তু তাও অপ্রতুল-শুধু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বর্ণনার আলোকে।
📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর কয়েকটি তাফসীর
যাই হোক, হযরত আয়েশা রাযি. থেকে তাফসীরমূলক বর্ণনার সংখ্যা একেবারে কম নয়। আলোচ্য অধ্যায়ে আমরা শুধু ওই আয়াতগুলোই আনব, যেগুলোতে কোনো না কোনো বিশেষত্ব আছে।
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ : তাফসীর
হজের আমলগুলোর মধ্যে সাফা-মারওয়া পর্বতের মধ্যখানে দৌড়ানোও একটি। কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত শব্দগুলো এসেছে:
إِنَّ الصَّفَا وَ الْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا
অর্থ: সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে হজ কিংবা উমরা করবে, যদি সেগুলোর তাওয়াফ করে, তা হলে কোনো সমস্যা নেই। (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮]
উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের রাযি. বললেন, খালাজান, তা হলে তো এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, যদি কেউ তাওয়াফ না করে তা হলেও সমস্যা নেই। তিনি বললেন, ভাগ্নে, তুমি ঠিক বোঝনি। যদি আয়াতের অর্থ সেটাই হতো, যেটা তুমি বুঝেছ, তা হলে আল্লাহ এভাবে বলতেন: لَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ لَّا يَطَّوَّفَ بِهِمَا -অর্থ : যদি তাওয়াফ না করে তা হলে কোনো সমস্যা নেই। আসলে আয়াতটি নাজিল হয়েছিল আনসার সাহাবীদের শানে। আওস ও খাযরাজ ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে 'মানাত'-এর জয়ধ্বনি দিত। 'মানাত'-এর অবস্থান ছিল মুশাল্লালে। এজন্য আনসারিগণ সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে তাওয়াফ করাকে খারাপ মনে করতেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা আগে এমনটা করতাম; এখন কী হুকুম? তখন আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতটি নাজিল করে হুকুম দিলেন, তোমরা সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করো, এতে কোনো সমস্যা নেই। এরপর তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ করেছেন, সুতরাং এটা বাদ দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান রহ. একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্যটি শুনে বলেছিলেন, জ্ঞান একেই বলে।'
তাফসীর-শাস্ত্রের একটি মূলনীতি
প্রকৃত প্রস্তাবে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর এই সংক্ষিপ্ত আলোকপাত তাফসীর-শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হয়ে আছে। যে কোনো আয়াতের তাফসীরে এই মূলনীতি সামনে রাখতে হয়। আরবদের বাচনভঙ্গি অনুযায়ী শব্দের যে অর্থটি ফুটে ওঠে, সেটিকেই কুরআনের উদ্দিষ্ট অর্থ ধরতে হবে, অন্যটি নয়; নয়তো, যেমনটি উম্মুল মুমিনীন বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা অন্য শব্দে অন্যভাবে কথাটি বলতে পারতেন, তখন ওই অর্থটিই বিবেচ্য হতো।
حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ : কুরআন মাজীদে সূরা ইউসুফে একটি আয়াত আছে:
حَتَّى إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كَذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا
অর্থ: এমনকি, যখন রাসূলগণ সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তারা মনে করলেন যে তাদেরকে মিথ্যা বলা হয়েছে, তখনই আমার সাহায্য এল। (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১১০)
উরওয়া জিজ্ঞেস করলেন, كُذِبُوا (তাদেরকে মিথ্যা বলা হয়েছে) নাকি كُذِّبُوا (তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে)?
তিনি উত্তর দিলেন, كُذِّبُوا (তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে)। উরওয়াহ বললেন, রাসূলগণ তো নিশ্চিত ছিলেন যে তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে। কেননা তাদের উম্মত তাদের নবুওয়াত ও রিসালাতকে অস্বীকার করেছিল। এটা তো ধারণা বা মনে করার বিষয় নয়। সুতরাং كُذِبُوا (তাদেরকে মিথ্যা বলা হয়েছে)-ই সঠিক।' তিনি বললেন, আল্লাহর পানাহ, নবী-রাসূলগণ কি এমন ধারণা করতে পারেন যে, তাদেরকে আল্লাহ মিথ্যা বলেছেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? উরওয়াহ বললেন, তা হলে আয়াতের তাৎপর্য কী? তিনি বললেন, এটা বলা হয়েছে ঈমানদার উম্মতদের ব্যাপারে, অর্থাৎ : তারা ঈমান আনল, নবুওয়াতকে বিশ্বাস করল, এবং এ কারণে সমাজের লোকেরা তাদের কষ্ট দিতে লাগল; অথচ আল্লাহর সাহায্য বিলম্বিত হচ্ছিল; এমনকি রাসূলগণ কাফেরদের ঈমান আনার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তাদের মনে হলো যে তাদের ঈমানদার উম্মতেরাও বুঝি আল্লাহর সাহায্য না আসার কারণে তাদের মিথ্যাবাদী বলে বসবে; এমন সময় হঠাৎ আল্লাহর সাহায্য এল।'
তাকসীর : وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا
যেই আয়াতে চারজন নারীকে বিবাহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেই আয়াতের শব্দগুলো এই:
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
অর্থ: যদি তোমাদের ভয় হয় যে এতিমদের ব্যাপারে ন্যায় আচরণ করতে পারবে না, তা হলে দুটো-দুটো করে বিবাহ করো, তিনটে-তিনটে করে বিবাহ করো, চারটে চারটে করে বিবাহ করো; ন্যায় ব্যবহার করতে না পারার আশঙ্কা হলে একটাই করো। (সূরা নিসা, আয়াত : ৩)
বাহ্যত, আয়াতে পূর্বাপরের মিল নেই মনে হয়। এতিমদের সঙ্গে ন্যায় ব্যবহার করতে না পারা আর বিবাহ করার অনুমতি প্রদান—এর মধ্যে মিল কোথায়? একজন শিক্ষার্থী এই আপত্তিই করলেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে। তিনি বললেন, আয়াতটি নাজিল হওয়ার পেছনে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। কিছু কিছু লোক এতিম শিশুকন্যাদের অভিভাবক হতো। এদের মধ্যে উত্তরাধিকারের ব্যাপার থাকত। এই লোকগুলো জোর করে মেয়েগুলোকে বিবাহ করত। উদ্দেশ্য—এদের সম্পদগুলো দখল করবে। যেহেতু এরাই অভিভাবক, এরাই স্বামী; সেহেতু কথা বলার কেউ থাকত না। এরা মেয়েগুলোকে স্ত্রীর মর্যাদা তো দিতই না, উল্টো নানাভাবে নির্যাতন করত। আল্লাহ এই লোকগুলোকেই সম্বোধন করে বলেছেন, যদি তোমরা এই এতিম মেয়েগুলোর প্রতি ন্যায় ও সদাচার করতে না পারো, তা হলে অন্য মেয়েদের বিয়ে করো। দুইটা-দুইটা করে করো। তিনটা-তিনটা করে করো। চারটা-চারটা করে করো। কিন্তু এই এতিম মেয়েগুলোকে বিবাহ করে নিজেদের অধীনে রেখো না।'
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ : সূরা নিসার আরও একটি আয়াত:
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ فِي يَتَامَى النِّسَاءِ اللَّاتِي لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُتِبَ لَهُنَّ وَتَرْغَبُونَ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ
অর্থ: এই মেয়েগুলোর ব্যাপারে লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, আল্লাহ এদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এই কিতাবে তোমাদের যা তেলাওয়াত করে শোনানো হয়েছে ওইসব এতিম মেয়েদের ব্যাপারে, যাদের তোমরা না প্রাপ্য অধিকার দাও, না বিবাহ করতে চাও... (সূরা নিসা, আয়াত: ১২৭)
ওই একই জিজ্ঞাসু ব্যক্তি এই আয়াতটির মর্মও জানতে চাইল। তিনি বললেন, এই আয়াতে যা বলা হয়েছে, (কিতাবে তোমাদের যা তেলাওয়াত করে শোনানো হয়েছে...) তা দ্বারা উদ্দেশ্য আগের আয়াতটিই। এই নির্দেশনা ওইসব অভিভাবকদের প্রতি, যারা এতিম মেয়েগুলোকে—সুন্দর বা মনমতো না হওয়ায় বিয়ে করতেও চাইত না, আবার সম্পদের লোভে অন্য কোথাও বিয়ে দিতেও চাইত না।'
وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ : নিম্নোক্ত আয়াতটির অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে:
وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ
অর্থ: যে ধনী সে বিরত থাকবে, আর যে অভাবী সে ন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে। (সূরা নিসা, আয়াত: ৬)
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আয়াতটি এতিমদের অভিভাবকদের ব্যাপারে। যদি তারা গরিব হয়, তা হলে অধীনস্থ এতিমের সম্পদ থেকে গ্রহণ করতে পারবে।
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর ইখতিলাফ
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, আয়াতটি অন্য একটি আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে':
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا
অর্থ: যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভোগ করে, তারা পেটে জাহান্নামের আগুন ভরায়। (সূরা নিসা, আয়াত: ১০)
কিন্তু এই আয়াতে শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যারা অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদ ভোগ বা আত্মসাৎ করে তাদের ব্যাপারে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, যারা এতিমদের সম্পদ দেখা-শোনা করে এবং সম্পদে কারবার করে, তাদের যদি নিজেদের সম্পদ দিয়ে পেট চলে, তা হলে দেখা-শোনা ও কায়কারবারের বিনিময় না নেওয়া উচিত; পক্ষান্তরে যদি তারা গরিব হয় এবং নিজেদের অর্থ দিয়ে তাদের পেট না চলে, তা হলে ন্যায়সঙ্গতভাবে অবস্থাভেদে কিছু গ্রহণ করবে।' হযরত আয়েশা রাযি.-এর তাফসীর অনুযায়ী আলোচ্য আয়াত দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ থাকে না।
وَإِنِ امْرَأَةٌ خَافَتْ : তাফসীর
একটি আয়াতে আছে:
وَإِنِ امْرَأَةً خَافَتْ مِنْ بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًا وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
অর্থ: যদি কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে অসন্তুষ্টি বা উপেক্ষার ভয় করে, তা হলে তারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে নিতে কোনো বাধা নেই; সমঝোতা সবসময়ই ভালো। (সূরা নিসা, আয়াত: ১২৮)
মনে হতে পারে, অসন্তুষ্টি দূর করার জন্য স্বামী-স্ত্রী সমঝোতা করা একেবারেই সাধারণ কথা। এজন্য কুরআন মাজীদে আয়াত অবতীর্ণ হওয়া এবং বিশেষভাবে নির্দেশ প্রদান করার কী প্রয়োজন? হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, এই আয়াত ওই সমস্ত নারীর ব্যাপারে, যাদের স্বামীরা তাদের কাছে তেমন আসে না, অথবা বয়স বেশি হওয়ায় বা রোগে শোকে স্বামীর অধিকার রক্ষা করতে পারে না। এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি বিচ্ছেদ এড়াতে স্বামীর সঙ্গে এমন সমঝোতা করে যে, তোমার কাছে আমার পাওনা অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি, তুমি শুধু স্ত্রী হিসাবে আমাকে রেখে দাও। তা হলে এমন সমঝোতা মন্দ নয়; বরং একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া থেকে এটাই ভালো।
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ
কুরআন মাজীদে যে আয়াতে কোনো ভয়ানক অবস্থা ও পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, তাফসীরকারকদের সাধারণ রীতি অনুসারে, সেটিকে কেয়ামত সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সাহাবা কেরাম যেহেতু সাধারণত প্রত্যেকটি আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে অবগত থাকতেন, সেহেতু প্রকৃত ক্ষেত্র নির্ধারণে তাদের ভুল খুব কম হতো। কুরআন মাজীদে একটি আয়াত আছে:
فَارْتَقِبْ يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُ خَانٍ مُبِينٍ
অর্থ: আপনি অপেক্ষা করুন সেই দিনের, যেদিন আসমান ধোঁয়া নিয়ে আসবে... (সূরা দুখান, আয়াত: ১০)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদদুআর ফলে মক্কায় যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল সে সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।' একইভাবে কুরআন মাজীদে আরও একটি আয়াত আছে:
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ ....
অর্থ: যখন তারা তোমাদের সামনে এল—তোমাদের ওপর থেকে, তোমাদের নিচে থেকে; যখন তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হলো, এবং প্রাণ কণ্ঠাগত হলো... (সূরা আহযাব, আয়াত: ১০)
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আয়াতটি পরিখা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে।
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ : কুরআন মাজীদে নামাযের ব্যাপারে নির্দেশনামা :
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى
অর্থ: তোমরা নামাযগুলোর প্রতি যত্নবান হও; যত্নবান হও মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৩৮)
মধ্যবর্তী নামায বলে কী উদ্দেশ্য? এ নিয়ে সাহাবা কেরামের মতভেদ আছে। মুসনাদে আহমাদে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রাযি. এবং হযরত উসামা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে—এর উদ্দেশ্য হলো যোহরের নামায। কোনো কোনো সাহাবী বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো ফজরের নামায। হযরত আয়েশা রাযি. মনে করেন, মধ্যবর্তী নামায বলতে আসরের নামাযকে বোঝানো হয়েছে। এ মতের ওপর তাঁর এত বেশি নিশ্চয়তাবোধ ছিল যে নিজ মুসহাফের পাদটীকায়ও তা লিখে দিয়েছিলেন। তাঁর এই তাফসীরের বিশুদ্ধতা হযরত আলী রাযি., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. এবং হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রাযি.- এর বিভিন্ন বর্ণনা থেকেও প্রমাণিত হয়।' মধ্যবর্তী নামায বলতে দৈনন্দিন নামাযগুলোর মধ্যবর্তী নামায উদ্দেশ্য, আর তা আসরের নামায, কেননা তা যোহর ও মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে পড়তে হয়।
وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنفُسِكُمْ : সূরা বাকারায় আছে:
وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبُكُمْ بِهِ اللَّهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ
অর্থ: তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা গোপন করো বা প্রকাশ করো, আল্লাহ তার হিসাব নেবেন। তখন তিনি যাকে ইচ্ছা করেন, ক্ষমা করবেন; যাকে ইচ্ছা করেন, শাস্তি দেবেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৪)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মনের মধ্যেও যেসব কল্পনা-জল্পনা হয়, আল্লাহ সেগুলোরও হিসাব নেবেন। তিনি এগুলোর ব্যাপারে ক্ষমাও করতে পারেন, শাস্তিও দিতে পারেন। কিন্তু অন্তরে অনিচ্ছাবশত যে ইচ্ছা বা ওসওয়াসা আসে, সেগুলোর হিসাব নিলে মানুষের বিপদ হয়ে যাবে। হযরত আলী রাযি. এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, আয়াতটি অন্য আর একটি আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে':
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ
অর্থ: আল্লাহ মানুষকে সাধ্যের বাইরে কিছু চাপান না। সে যা ভালো করবে, তার সুফল পাবে; যা মন্দ করবে, তার কুফল পাবে। (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-ও একই মত ব্যক্ত করেছেন।' হযরত আয়েশা রাযি.-কে একজন এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি কাছাকাছি অর্থের আর একটি আয়াত উল্লেখ করেন:
مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ
অর্থ: যে কোনো বদ আমল করবে, তাকে তার বদ আমলের সাজা দেওয়া হবে। (সূরা নিসা, আয়াত: ১২৩)
প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য ছিল, যদি এমনই হয় তা হলে আল্লাহর দয়া ও করুণার কী হলো? মুক্তির আশা করা যাবে কী করে? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমিও আয়াতটির ব্যাখ্যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এরপর তুমিই প্রথম আমার কাছে জানতে চাইলে। আল্লাহর কথা চিরসত্য। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ছোট-ছোট গুনাহের সাজা ছোট-ছোট বিপদ ও ঝামেলা দিয়ে দেন। মুমিন তখন অসুস্থ হয়, কিংবা কোনো বিপদ আসে; এমনকি পকেটে কিছু রেখে আর পায় না, খুঁজে খুঁজে পেরেশান হয় (অর্থাৎ এই সমস্ত ছোটখাটো সাজা দিয়ে আল্লাহ ক্ষমা ও মাগফেরাত করেন)। সোনা পুড়ে পুড়ে যেমন খাঁটি সোনা হয়, তেমন মুমিনও পূত-পবিত্র হয়ে পৃথিবী ত্যাগ করে।২
এই আয়াতগুলো ছাড়াও আরও অনেক আয়াতের ব্যাখ্যা ও তাফসীর হযরত আয়েশা রাযি. থেকে এসেছে। কিন্তু আমরা সেগুলো আলোচনায় আনিনি। সেগুলো স্বাভাবিকভাবে সবারই জানা। মুফাসসিরগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে পর্যালোচিত। অনেক আয়াতে স্বতন্ত্র কোনো মত নেই। কুরআন মাজীদে হযরত আয়েশা রাযি.-এর পাণ্ডিত্য হাদীস, ফিকহ, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি আলোচনা থেকেও অনুমান করা যায়।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: বাব-উজুবুস সাফা ওয়াল মারওয়াহ।
১. সাধারণভাবে এই কেরাতই গৃহীত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর মতও এটাই। দেখুন সহীহ বুখারী: তাফসীর- ثم أفيضوا من حيث أفاض الناس ا
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা ইউসুফ।
১. সহীহ মুসলিম: কিতাব-তাফসীর। সহীহ বুখারী: কিতাব-নিকাহ。
২. সহীহ মুসলিম: কিতাব-তাফসীর। সহীহ বুখারী: কিতাব-নিকাহ।
১. নববী, শরহে মুসলিম: কিতাব—তাফসীর।
২. সহীহ মুসলিম: কিতাব—তাফসীর। সহীহ বুখারী: তাফসীর—সূরা নিসা。
১. সহীহ মুসলিম: কিতাব—তাফসীর। সহীহ বুখারী: কিতাব—তাফসীর।
২. সহীহ মুসলিম: কিতাব—তাফসীর।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২০২।
৪. সহীহ বুখারী: তাফসীর—আলোচ্য আয়াত।
১. জামে তিরমিযী: তাফসীর-আলোচ্য আয়াত।
২. জামে তিরমিযী: তাফসীর-আলোচ্য আয়াত।
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর-আলোচ্য আয়াত।
২. জামে তিরমিযী: তাফসীর-আলোচ্য আয়াত।