📄 কুরআন এবং তাঁর বাল্যকাল
সবাই জানেন, কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে দীর্ঘ তেইশ বছরের ধারাবাহিকতায়। হযরত আয়েশা রাযি. নবুওয়াতপ্রাপ্তি ও কুরআন অবতরণের চতুর্দশ বছরে, নয় বছর বয়সে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তাঁর সহাবস্থানকাল প্রায় দশ বছর। এই বিবেচনায়, কুরআন অবতরণের ধারাবাহিকতার বেশি অর্ধেকই কেটে গিয়েছে তাঁর প্রাথমিক বোধোদয়ের আগেই। কিন্তু এই অসাধারণ মন-মস্তিষ্কের অধিকারিণী এই সময়টাকেও, যা সাধারণত শিশুসুলভ অনবগতি ও খেলাধুলার উদাসীনতায় পার হয়ে যায়, বৃথা যেতে দেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সিদ্দীকে আকবর রাযি.-এর ঘরে যেতেন।' হযরত সিদ্দীকে আকবর রাযি. নিজ গৃহে একটি নামাযগাহ বানিয়েছিলেন। তিনি সেখানে বসে অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে কুরআনের অবতীর্ণ আয়াতগুলো তেলাওয়াত করতেন। এমন উর্বর আলোকময় পরিবেশ থেকে এই অলৌকিক ধারণক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি উপকৃত না হয়ে পারে না। তিনি বলেন, যখন এই আয়াতটি নাজিল হয়:
بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَ أَمَرُ
অর্থ: বরং কেয়ামত তাদেরই প্রতিশ্রুত মহাকাল, যা অতি বিষাদ ও বিষাদময় হয়ে দেখা দেবে। (সূরা কমার, আয়াত: ৪৬)
তখন আমি খেলছিলাম।
হযরত আয়েশা রাযি. তেরো-চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত (৫ম হিজরী) কুরআন মাজীদ খুব বেশি পড়তে পারেননি। তিনি নিজেই বলেছেন,
وَ أَنَا جَارِيَةٌ حَدِيثَةُ السِّنِّ لَا أَقْرَأُ مِنَ الْقُرْآنِ كَثِيرًا
অর্থ: আমি ওই সময় অল্পবয়স্কা ছিলাম, তখনো কুরআন খুব বেশি পড়া হয়নি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই সময়ও তিনি কুরআনের উদ্ধৃতি দিতেন।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: হিজরত।
২. সহীহ বুখারী: হিজরত।
৩. সহীহ বুখারী: তাফসীর–সূরা কমার।
৪. সহীহ বুখারী: ইফক।
📄 কুরআন মাজীদ লিপিবদ্ধকরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুরআন লিখিত আকারে গ্রন্থবদ্ধ হয়নি। হযরত আবু বকর রাযি. স্বীয় শাসনামলেই প্রথম কাগজে বিন্যস্ত করেন। অবশ্য অন্যান্য সাহাবীগণও দৈনিক তেলাওয়াতের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজ নিজ পদ্ধতিতে কুরআন বিন্যাসে মনোযোগী হয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্য কোনো মৌলিক ভিন্নতা ছিল না। শুধু সূরাসমূহের পর্যায়ক্রমিক (সিরিয়ালে) তারতম্য ছিল।
📄 মুসহাফে আয়েশা রাযি.
আবু ইউনুস ছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.-এর গোলাম।' তিনি লিপিশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তার হাতেই নিজের মুসহাফ লিখিয়েছিলেন।² অনারবদের আধিক্যের কারণে, কেরাতের ভিন্নতার প্রভাব ইরাকেই পড়ে সবচেয়ে বেশি। ইরাক থেকে একজন ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং আবেদন করেন, উম্মুল মুমিনীন, আমাকে আপনার মুসহাফ শরীফ যদি দেখাতেন।³ কারণ জানতে চাইলে লোকটি বললেন, আমাদের ওখানে এখনো কুরআন মাজীদ সুবিন্যস্ত নয়। আমার ইচ্ছা, আমার মুসহাফটি আপনার মুসহাফের সঙ্গেই মিলিয়ে নেব। তিনি বললেন, সূরা আগে পরে হলে কোনো সমস্যা হয় না। এরপর তিনি নিজ মুসহাফের সূরাবিন্যাসের অনুলিপি প্রদান করলেন।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩।
২. সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা বাকারা। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩।
৩. সহীহ বুখারী: বাব-জামউল কুরআন।
৪. সহীহ বুখারী: বাব-তালিফুল কুরআন।
📄 কুরআন মাজীদ এবং উম্মুল মুমিনিন রাযি.
কোনো আয়াতের মর্ম উদ্ধারে অসমর্থ হলে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে জেনে নিতেন-বিশুদ্ধ গ্রন্থগুলোতে এ ধরনের অনেক হাদীস পাওয়া যায়। উপরন্তু উম্মাহাতুল মুমিনীন রাযি.- এর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিল:
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ
অর্থ: তোমাদের ঘরে কুরআনের যে আয়াতগুলো এবং হেকমতের যে বাণীগুলো পড়ে শোনানো হয়, সেগুলো আত্মস্থ রেখো। (সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৪)
মহান আল্লাহর এই নির্দেশের বাস্তবায়নও আবশ্যক ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের নামাযে কুরআন মাজীদের বড় বড় সূরা ও আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করতেন। তিনি অত্যন্ত বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে, চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সঙ্গে সেগুলো তেলাওয়াত করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. রাসূলের এই সুগভীর নামায ও আবেদনময় তেলাওয়াতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।' কুরআন মাজীদের অবতরণ আর কোনো স্ত্রীর বিছানাতেই হয়নি। কুরআন অবতীর্ণ হলে, অধিকাংশ সময়, সবার আগে তিনিই জানতে পারতেন। তিনি বলেন, সূরা বাকারা এবং সূরা নিসা যখন নাজিল হয়, তখন আমি তাঁর কাছেই ছিলাম।° মোটকথা, কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রগুলোই এমন ছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি. প্রতিটি আয়াত ও সূরার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মর্ম ও তাৎপর্য এবং বাচনভঙ্গি ও প্রমাণক্ষেত্র সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করতেন। আর তাই—অনুধাবন, প্রয়োগ ও বিশ্লেষণে এবং শরীয়তের বিধি-বিধান প্রণয়ন ও উদ্ঘাটনে গভীর থেকে গভীরে পৌঁছে যেতে পারতেন।
তিনি প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসায় সর্বপ্রথম কুরআন কারীমে মনোনিবেশ করতেন। আকাইদ, আহকাম এবং ফিকহ তো আছেই; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ও কর্মও বিশ্লেষণ করতেন কুরআনের আলোকে; যদিও তা কোনো ঐতিহাসিক বিষয়। এবং ঘরের মানুষ ছিলেন তিনি নিজেই। উদাহরণস্বরূপ, একবার কিছু লোক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল। তারা আবেদন করলেন, মাতা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রমাধুরী সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, তোমরা কুরআন পড় না? আপাদমস্তক তিনি ছিলেন কুরআন। তারা জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, 'তোমরা সূরা মুযযাম্মিল পড়নি?'
আকায়েদ, আহকাম, ফিকহ-ইসলামী মতবাদ ও বিশ্বাস, ইসলামী জীবন-দর্শন ও জীবন-বিধানের প্রণয়ন ও পর্যালোচনায় এবং উদ্ঘাটন ও হেতুনির্দেশে তিনি যেভাবে কুরআন মাজীদের উদ্ধৃতি দিতেন, তা বিভিন্ন শিরোনামের অধীনে আলোচনা করা হবে। আমরা দেখব, বস্তুর মর্ম-মূলে কী সহজে তাঁর হাত যেত। বিষয়ের সারবত্তায় কী সহজে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হতো।
টিকাঃ
৫. তালীম ও তারবিয়াত অংশে দেখুন।
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২।
২. সহীহ বুখারী: বাব—তালিফুল কুরআন।
৩. সহীহ বুখারী: বাব—তালিফুল কুরআন।
১. আবু দাউদ: কিয়ামুল লাইল। মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৪।