📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 দাস-দাসীর প্রতি মমত্ব

📄 দাস-দাসীর প্রতি মমত্ব


শুধুমাত্র একটি কসম ভাঙার কারণেই তিনি চল্লিশ জন গোলামকে আজাদ করে দিয়েছিলেন। তাঁর আজাদ-করা গোলামের সংখ্যা ছিল সাতষট্টিটি। তার কাছে তামিম গোত্রের একটি দাসী ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে শুনেছিলেন, তামিমিরাও হযরত ইসমাঈল আ.-এর বংশধর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঙ্গিতে তিনি এই দাসীকে আজাদ করে দেন। মদীনায় বারীরাহ রাযি. নাম্নী এক দাসী ছিলেন। তার মনিব তার সঙ্গে মুকাতাবার চুক্তি করেছিল। অর্থাৎ তাকে বলেছিল, যদি আমাকে এত টাকা দিতে পারো, তা হলে তুমি মুক্ত। বারীরাহ মদীনায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা আদায় করছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জানতে পেরে পুরো টাকাই নিজে পরিশোধ করলেন এবং বারীরাহকে মুক্ত করে দিলেন।' একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। লোকেরা বলল, কেউ যাদুটোনা করেছে। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি যাদুটোনা করেছ? সে স্বীকার করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? সে বলল, আপনাকে মেরে ফেলার জন্য। কারণ আপনি মারা গেলে আমি ছাড়া পাব। তিনি বললেন, এই দুষ্টকে কোনো দুষ্ট লোকের কাছেই বেচে দাও, আর এর পয়সা দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে এসো।' এটা এক ধরনের সাজা ছিল। কিন্তু কেমন অদ্ভুত!

টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী : باب الهجرة
৫. শরহে বুলুগুল মারাম, আমীর ইসমাঈল : كتاب العتق
৬. সহীহ বুখারী : كتاب العنق
১. সহীহ বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ-সহ আরও অনেক গ্রন্থে এসেছে।
২. হাদীসটি দারাকুতনী, মুয়াত্তা মালিক: (من رواية العضى মুয়াত্তা মুহাম্মাদ: (باب العنق মুসতাদরাকে হাকেম: (كتاب الطب) ইত্যাদি গ্রন্থে আছে। দাসীকে শাস্তি দিয়েছিলেন শরীয়তের খেলাফ কাজে জড়িত হওয়ার কারণে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 অভাবী ও ফকির-মিসকিন : আলাদা আচার-ব্যবহার

📄 অভাবী ও ফকির-মিসকিন : আলাদা আচার-ব্যবহার


অভাবী ও ফকির-মিসকিনের সঙ্গে অবস্থান ও মর্যাদাভেদে আলাদা আচার ব্যবহার করা উচিত। যদি কোনো নীচু পর্যায়ের ফকির বা মিসকিন আসে, তা হলে শুধু কিছু দিলেই সে খুশি। কিন্তু যদি এমন কোনো অভাবী ও প্রয়োজনগ্রস্ত আসে, যে ফকির-মিসকিনের মতো অত নীচু নয়; যদিও চেয়ে-মেঙ্গেই দিন চলে, তা হলে প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি একটু সম্মানেরও ব্যাপার থাকে। হযরত আয়েশা রাযি. এই বিষয়টিও লক্ষ রাখতেন। একবার এক ভিক্ষুক এল। তিনি এক টুকরো রুটি দিলেন। সে চলে গেল। একটু পর আরেকজন লোক এল। গায়ে কাপড়চোপড় ছিল। চলনে-বলনে মনে হচ্ছিল, একরকম সম্মানবোধ আছে। হযরত আয়েশা রাযি. তাকে বসালেন, খানা খাওয়ালেন, এরপর বিদায় করলেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, দুজনেই তো ফকির; কিন্তু দুজনের সঙ্গে দুরকম আচরণ কেন করলেন? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে আচার ব্যবহার করবে।

টিকাঃ
৩. আবু দাউদ: كتاب الأدب

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 পর্দার প্রতি গুরুত্ব

📄 পর্দার প্রতি গুরুত্ব


তিনি পর্দার ব্যাপারে অনেক যত্নশীল ছিলেন। পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার পর থেকে পর্দা করা ফরজ হয়ে যায়।' তাই যেই সব শিশুদের বড় হয়ে তালীম তারবিয়াতের জন্য তাঁর কাছে অবাধে আসা-যাওয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে করতেন, তাদেরকে কোনো মাহরাম নারীকে দিয়ে দুধ পান করাতেন। এভাবে তিনি তাদের দুধখালা, দুধনানী ইত্যাদি হতেন; ফলে তাদের সঙ্গে বিশেষভাবে পর্দা করার প্রয়োজন হতো না। এছাড়া অন্যান্য তালিবুল ইলমগণের সঙ্গে কঠোরভাবে পর্দা রক্ষা করতেন। দরসে মধ্যখানে পর্দা ঝুলিয়ে রাখতেন। একবার হজের সফরে কয়েকজন বিবি সঙ্গে ছিলেন। কেউ বললেন, উম্মুল মুমিনীন, চলুন, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করি। তিনি বললেন, আপনি যেতে পারেন, পুরুষদের ভিড়ে আমি ঢুকব না। কখনো দিনের বেলা তাওয়াফ করতে হলে খানায়ে কাবা থেকে পুরুষদেরকে সরিয়ে দেওয়া হতো। একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাওয়াফরত অবস্থায়ও তিনি মুখমণ্ডলে নেকাব পরে থাকতেন। তিনি একটি গোলামকে মুকাতাব করেছিলেন। তিনি বললেন, তুমি যখন মুকাতাবা চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলবে, তখন তো তোমার সামনে আর আসতে পারব না। তাবেঈ ইসহাক অন্ধ ছিলেন। তিনি একবার খেদমতে হাজির হলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সঙ্গেও পর্দা করলেন। ইসহাক বললেন, আমার সঙ্গেও পর্দা করতে হবে? আমি তো আপনাকে দেখতে পাব না। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি দেখতে পাবে না; কিন্তু আমি তো দেখতে পাব।' শরীয়তে মুর্দাদের থেকে পর্দা করতে হয় না। কিন্তু তাঁর সতর্কতা দেখুন, হযরত উমর রাযি.-এর দাফনের পর থেকে হুজরায় কখনো বেপর্দা অবস্থায় যেতেন না।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : ا ذكر افك
২. সহীহ মুসলিম : كتاب الرضاعة ,মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭১।
৩. এ পদ্ধতি শুধু হযরত আয়েশা রাযি.-ই অবলম্বন করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের আর কেউ এমন করেননি। একটি হাদীসের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এমন করতেন। সামনে ফিকহের ইখতেলাফি মাসায়েলের কোনো পাদটীকায় এ সংক্রান্ত আলোচনা আসবে।
৪. সহীহ বুখারী : ا كتاب الحج ، باب طواف النساء
৫. সহীহ বুখারী : ا كتاب الحج ، باب طواف النساء
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৭।
৭. أخبار مكة للازرقي ২য় খণ্ড, ১০ নং পৃষ্ঠা। মক্কা মুআযযামা।
৮. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫।
১. তাবাকাতে ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪৭।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 মানাকেব : বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্য

📄 মানাকেব : বিশেষ মর্যাদা ও মাহাত্ম্য


সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাজাইলে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, أَنَا تَارِكٌ فِيْكُمُ الثَّقَلَيْنِ كِتَابَ اللَّهِ .... وَ أَهْلَ بَيْتِي.
আমি তোমাদের জন্য মহামূল্যবান দুটো বস্তু রেখে যাচ্ছি, আল্লাহর কিতাব এবং আমার 'আহলে বাইত'।
নিঃসন্দেহে কুরআন পুরো জীবনব্যবস্থার সহজ ও সামগ্রিক পথনির্দেশ। ইসলামের সরল পথে জীবনকে পরিচালিত করতে সবকিছুর কর্মভিত্তিক দৃষ্টান্ত থাকা আবশ্যক নয়। কিন্তু তারপরও পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকা প্রয়োজন যারা ঐশী বাণীর নিগূঢ় তাৎপর্য তুলে ধরতে পারেন, সূক্ষ্ম ভেদ ও রহস্য উন্মোচন করতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে আমরা এই মহামহিম মানুষগুলোকে পাব তাঁরই 'আহলে বাইত'-এর মধ্যে। আহলে বাইত কারা? সেটাও সূরা আহযাবের বেশ কিছু আয়াতে বিধৃত। আমরা সে আয়াতগুলো পূর্বে আলোচনা করেছি।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্যকে বিশেষ মূল্যায়নে বিশিষ্ট করেছেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নববী সান্নিধ্যে তিনি যে পরিচর্যা লাভ করেছেন তা আর কারও ভাগ্যে জোটেনি। তাঁর আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ প্রতিভা ও যোগ্যতা সর্বজনবিদিত। এই বিবেচনায় কারও কোনোও দ্বিমত থাকার কথা নয় যে, আহলে বাইতের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে হযরত আয়েশা রাযি. বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত। সুতরাং কিতাব ও সুন্নাহর ব্যাখ্যায়, মুসলিম আইন ও বিধানের বিশ্লেষণে তাঁর চেয়ে অগ্রগণ্য আর কে হতে পারে? তা ছাড়া তিনি যত কাছে থেকে রাসূলকে দেখেছেন তা আর কারও পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এজন্যই ঐশী' প্রত্যাদেশের অনবদ্য সিদ্ধান্ত:
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الْتَرِيْدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
সকল নারীর ওপর আয়েশার মর্যাদা তেমন, সকল খাদ্যের ওপর সারিদের মর্যাদা যেমন।
স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রুয়াতে সাদেকায় (সত্য স্বপ্নযোগে) হযরত আয়েশা রাযি.-এর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়েছেন। হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়া আর কোনো উম্মুল মুমিনীনের বিছানায় ওহী নাজিল হয়নি। জিবরীল আমিন আ. তাঁর হুজরা মোবারকে করুণার বারিধারা নিয়ে এসেছেন। চর্মচক্ষেই তিনি দুবার নামুসে আকবারকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইলহামে সাদেকের মাধ্যমে (ঐশী অনুপ্রেরণার আলোকে) আখেরাতে রাসূলের প্রিয়তমা হওয়ার সুসংবাদ পেয়েছেন।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, গর্ব করার জন্য নয়; ঘটনা বর্ণনার জন্য বলছি, আল্লাহ আমাকে এমন নয়টি বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা পৃথিবীতে আর কাউকে দান করেননি। স্বপ্নে ফেরেশতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আমার আকৃতি তুলে ধরেছিলেন। যখন আমার বয়স মাত্র সাত বছর তখন তিনি আমাকে বিবাহ করেছেন। যখন আমার বয়স নয় বছর তখন আমি তাঁর ঘরে এসেছি। আমিই তাঁর একমাত্র কুমারী বিবি। তিনি আমার বিছানায় থাকাকালেও তাঁর ওপর ওহী নাজিল হয়েছে। আমি তাঁর সবচে প্রিয় বিবি ছিলাম। আমার শানে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়েছে। আমি নিজের চোখে জিবরীল আ.-কে দেখেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে মাথা রেখেই মৃত্যুবরণ করেছেন।'

টিকাঃ
১. وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى [سورة النجم : 43] অর্থ : তিনি কোনো কিছুই নিজের ইচ্ছায় বলেন না; তিনি যা বলেন তাই ওহী, (ঐশী প্রত্যাদেশ)...
২. সহীহ বুখারী, তিরমিযী : مناقب عائشة رض
৩. সহীহ বুখারী, তিরমিযী : مناقب عائشة رض
৪. সহীহ বুখারী : مناقب عائشة رض
৫. সহীহ বুখারী : مناقب عائشة رض
৬. সহীহ বুখারী : مناقب عائشة رض
১. মুসতাদরাকে হাকেম। তাবাকাতে ইবনে সাদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00