📄 ছোটখাট বিষয়েও পরহেজগারী
ছোটখাটো নিষিদ্ধ বিষয়গুলোও অত্যন্ত পরহেজ করে চলতেন। যদি কখনো রাস্তায় বের হতেন আর ঘণ্টির আওয়াজ পেতেন তা হলে দাঁড়িয়ে যেতেন—যেন ওই আওয়াজ আর শুনতে না হয়।' তাঁর একটি ঘরে ভাড়াটিয়া ছিল। তিনি জানতে পারলেন, লোকটি পাশা খেলে। তাকে বলে পাঠালেন, যদি এই বদঅভ্যাস না ছাড়, তা হলে ঘর থেকে বের করে দেব।
একবার ঘরে একটি সাপ বের হলো। তিনি সাপটিকে মেরে ফেললেন। কেউ বলল, আপনি সাপটিকে মেরে ঠিক করলেন না। যদি এ কোনো মুসলমান জিন হয়ে থাকে। তিনি বললেন, এ যদি মুসলমান হতো, তা হলে উম্মুল মুমিনীনের ঘরে ঢুকত না। লোকটি বলল, যখন সে এসেছে, তখন আপনি তো পর্দার সঙ্গেই ছিলেন। এ কথা শুনে তিনি প্রভাবিত হলেন। ফিদয়া স্বরূপ একটি গোলাম আজাদ করলেন।
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৬।
২. আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী রহ, পৃষ্ঠা: ২৩২।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড।
📄 দাস-দাসীর প্রতি মমত্ব
শুধুমাত্র একটি কসম ভাঙার কারণেই তিনি চল্লিশ জন গোলামকে আজাদ করে দিয়েছিলেন। তাঁর আজাদ-করা গোলামের সংখ্যা ছিল সাতষট্টিটি। তার কাছে তামিম গোত্রের একটি দাসী ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে শুনেছিলেন, তামিমিরাও হযরত ইসমাঈল আ.-এর বংশধর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঙ্গিতে তিনি এই দাসীকে আজাদ করে দেন। মদীনায় বারীরাহ রাযি. নাম্নী এক দাসী ছিলেন। তার মনিব তার সঙ্গে মুকাতাবার চুক্তি করেছিল। অর্থাৎ তাকে বলেছিল, যদি আমাকে এত টাকা দিতে পারো, তা হলে তুমি মুক্ত। বারীরাহ মদীনায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা আদায় করছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জানতে পেরে পুরো টাকাই নিজে পরিশোধ করলেন এবং বারীরাহকে মুক্ত করে দিলেন।' একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। লোকেরা বলল, কেউ যাদুটোনা করেছে। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি যাদুটোনা করেছ? সে স্বীকার করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? সে বলল, আপনাকে মেরে ফেলার জন্য। কারণ আপনি মারা গেলে আমি ছাড়া পাব। তিনি বললেন, এই দুষ্টকে কোনো দুষ্ট লোকের কাছেই বেচে দাও, আর এর পয়সা দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে এসো।' এটা এক ধরনের সাজা ছিল। কিন্তু কেমন অদ্ভুত!
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী : باب الهجرة
৫. শরহে বুলুগুল মারাম, আমীর ইসমাঈল : كتاب العتق
৬. সহীহ বুখারী : كتاب العنق
১. সহীহ বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ-সহ আরও অনেক গ্রন্থে এসেছে।
২. হাদীসটি দারাকুতনী, মুয়াত্তা মালিক: (من رواية العضى মুয়াত্তা মুহাম্মাদ: (باب العنق মুসতাদরাকে হাকেম: (كتاب الطب) ইত্যাদি গ্রন্থে আছে। দাসীকে শাস্তি দিয়েছিলেন শরীয়তের খেলাফ কাজে জড়িত হওয়ার কারণে।
📄 অভাবী ও ফকির-মিসকিন : আলাদা আচার-ব্যবহার
অভাবী ও ফকির-মিসকিনের সঙ্গে অবস্থান ও মর্যাদাভেদে আলাদা আচার ব্যবহার করা উচিত। যদি কোনো নীচু পর্যায়ের ফকির বা মিসকিন আসে, তা হলে শুধু কিছু দিলেই সে খুশি। কিন্তু যদি এমন কোনো অভাবী ও প্রয়োজনগ্রস্ত আসে, যে ফকির-মিসকিনের মতো অত নীচু নয়; যদিও চেয়ে-মেঙ্গেই দিন চলে, তা হলে প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি একটু সম্মানেরও ব্যাপার থাকে। হযরত আয়েশা রাযি. এই বিষয়টিও লক্ষ রাখতেন। একবার এক ভিক্ষুক এল। তিনি এক টুকরো রুটি দিলেন। সে চলে গেল। একটু পর আরেকজন লোক এল। গায়ে কাপড়চোপড় ছিল। চলনে-বলনে মনে হচ্ছিল, একরকম সম্মানবোধ আছে। হযরত আয়েশা রাযি. তাকে বসালেন, খানা খাওয়ালেন, এরপর বিদায় করলেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, দুজনেই তো ফকির; কিন্তু দুজনের সঙ্গে দুরকম আচরণ কেন করলেন? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে আচার ব্যবহার করবে।
টিকাঃ
৩. আবু দাউদ: كتاب الأدب
📄 পর্দার প্রতি গুরুত্ব
তিনি পর্দার ব্যাপারে অনেক যত্নশীল ছিলেন। পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার পর থেকে পর্দা করা ফরজ হয়ে যায়।' তাই যেই সব শিশুদের বড় হয়ে তালীম তারবিয়াতের জন্য তাঁর কাছে অবাধে আসা-যাওয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে করতেন, তাদেরকে কোনো মাহরাম নারীকে দিয়ে দুধ পান করাতেন। এভাবে তিনি তাদের দুধখালা, দুধনানী ইত্যাদি হতেন; ফলে তাদের সঙ্গে বিশেষভাবে পর্দা করার প্রয়োজন হতো না। এছাড়া অন্যান্য তালিবুল ইলমগণের সঙ্গে কঠোরভাবে পর্দা রক্ষা করতেন। দরসে মধ্যখানে পর্দা ঝুলিয়ে রাখতেন। একবার হজের সফরে কয়েকজন বিবি সঙ্গে ছিলেন। কেউ বললেন, উম্মুল মুমিনীন, চলুন, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করি। তিনি বললেন, আপনি যেতে পারেন, পুরুষদের ভিড়ে আমি ঢুকব না। কখনো দিনের বেলা তাওয়াফ করতে হলে খানায়ে কাবা থেকে পুরুষদেরকে সরিয়ে দেওয়া হতো। একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়, তাওয়াফরত অবস্থায়ও তিনি মুখমণ্ডলে নেকাব পরে থাকতেন। তিনি একটি গোলামকে মুকাতাব করেছিলেন। তিনি বললেন, তুমি যখন মুকাতাবা চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলবে, তখন তো তোমার সামনে আর আসতে পারব না। তাবেঈ ইসহাক অন্ধ ছিলেন। তিনি একবার খেদমতে হাজির হলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর সঙ্গেও পর্দা করলেন। ইসহাক বললেন, আমার সঙ্গেও পর্দা করতে হবে? আমি তো আপনাকে দেখতে পাব না। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি দেখতে পাবে না; কিন্তু আমি তো দেখতে পাব।' শরীয়তে মুর্দাদের থেকে পর্দা করতে হয় না। কিন্তু তাঁর সতর্কতা দেখুন, হযরত উমর রাযি.-এর দাফনের পর থেকে হুজরায় কখনো বেপর্দা অবস্থায় যেতেন না।
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী : ا ذكر افك
২. সহীহ মুসলিম : كتاب الرضاعة ,মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৭১।
৩. এ পদ্ধতি শুধু হযরত আয়েশা রাযি.-ই অবলম্বন করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের আর কেউ এমন করেননি। একটি হাদীসের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এমন করতেন। সামনে ফিকহের ইখতেলাফি মাসায়েলের কোনো পাদটীকায় এ সংক্রান্ত আলোচনা আসবে।
৪. সহীহ বুখারী : ا كتاب الحج ، باب طواف النساء
৫. সহীহ বুখারী : ا كتاب الحج ، باب طواف النساء
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৭।
৭. أخبار مكة للازرقي ২য় খণ্ড, ১০ নং পৃষ্ঠা। মক্কা মুআযযামা।
৮. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫।
১. তাবাকাতে ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪৭।