📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ইবাদত-বন্দেগী

📄 ইবাদত-বন্দেগী


তিনি অধিকাংশ সময়ই ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকতেন। চাশতের নামায পড়তেন এবং বলতেন, আমার পিতাও যদি কবর থেকে উঠে আসেন এবং নিষেধ করেন তবু এই নামায ছাড়ব না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে অভ্যস্ত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুত্যুর পরও এত গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ পড়তেন যে যদি কোনোদিন ঘুম ভাঙতে দেরিও হতো, তবু উঠে আগে তাহাজ্জুদ পড়তেন; এরপর ফজর পড়তেন। একদিন এরকম সময়ে তাহাজ্জুদ পড়ছিলেন। এমন সময় ভ্রাতুষ্পুত্র কাসেম বিন মুহাম্মাদ কাছে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ফুফি, এটা কীসের নামায? তিনি বললেন, রাতে পড়তে পারিনি; তাই বলে এখন ছাড়তেও পারব না। রমযানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তারাবীহ আদায় করতেন। যাকওয়ান নামক জনৈক গোলাম ছিলেন। তিনি ইমাম হতেন এবং সামনে কুরআন রেখে তেলাওয়াত করতেন। হযরত আয়েশা রাযি. মুক্তাদি হতেন।
অধিকাংশ দিনই রোযা রাখতেন। কিছু কিছু বর্ণনায় এভাবে এসেছে যে, তিনি সব সময়ই রোযা রাখতেন।' একবার প্রচণ্ড গরমে আরাফার দিবসে রোযা অবস্থায় ছিলেন। গরম ও পিপাসা এত বেশি লেগেছিল যে, মাথায় পানি ঢালতে হচ্ছিল। ভাই আবদুর রহমান বললেন, এই গরমে এত কষ্ট করে রোযা রাখার কী দরকার? রোযা ভেঙে ফেলুন এবং কিছু মুখে দিন। তিনি বললেন, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে শুনেছি—আরাফার দিবসে রোযা রাখলে সারা বছরের গুনাহ মাফ হয়, তখন এই রোযা ভাঙি কী করে?'
নিয়মিত হজ-পালনে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। এমন বছর খুব কমই ছিল, যে বছর তিনি হজ করেননি। হযরত উমর রাযি. তাঁর শাসনামলের শেষের দিকে হযরত উসমান রাযি. এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-কে উম্মাহাতুল মুমিনীনের সঙ্গে হজের সফরে প্রেরণ করেছিলেন। হজের সফরে তাঁদের অবতরণের জায়গা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকত। প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে আরাফার ময়দানের শেষ সীমানা নামিরায় অবতরণ করানো হতো। যখন এখানে ভিড় হতে লাগল, তখন একটু সরে আরাকে তাঁবু ফেলা হতো। কখনো কোহে ছাবিরের পাদদেশেও তাঁবু গাড়া হতো।
যতক্ষণ এখানে অবস্থান করতেন, তিনি এবং তাঁর সঙ্গের সকলে তাকবীর পড়তে থাকতেন। যখন এখান থেকে উঠে চলে যেতেন, তখন তাকবীর বলা বন্ধ করতেন। প্রথমে এই অভ্যাস ছিল যে, হজের পর জিলহজ মাসের মধ্যেই উমরা আদায় করতেন। কিন্তু পরে অভ্যাসে পরিবর্তন আনেন। মহররম মাসের পূর্বেই জুহফায় গিয়ে তাঁবু ফেলতেন। এরপর মুহাররমের চাঁদ দেখে উমরার নিয়ত করতেন। আরাফার দিনে রোযা রাখতেন। সন্ধ্যায় যখন সবাই রওনা হতো, তখন ইফতার করে নিতেন।

টিকাঃ
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৮।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২।
৪. দারাকুতনী: কিতাবুস সালাহ।
৫. মুয়াত্তা ও সহীহ বুখারী: বাবু কিয়ামি রামাযান।
১. তাবাকাতে ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৪৭।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৮।
৩. সহীহ বুখারী: বাবু হাজ্জিন নিসা।
৪. পুরো বর্ণনা আছে মুয়াত্তা, باب قطع التلبية অংশে। কোহে ছাবিরে অবস্থানের ঘটনা আছে সহীহ ا باب طواف النساء : 1
৫. মুয়াত্তা, ইমাম মালেক রহ: ا صيام يوم عرفة

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ছোটখাট বিষয়েও পরহেজগারী

📄 ছোটখাট বিষয়েও পরহেজগারী


ছোটখাটো নিষিদ্ধ বিষয়গুলোও অত্যন্ত পরহেজ করে চলতেন। যদি কখনো রাস্তায় বের হতেন আর ঘণ্টির আওয়াজ পেতেন তা হলে দাঁড়িয়ে যেতেন—যেন ওই আওয়াজ আর শুনতে না হয়।' তাঁর একটি ঘরে ভাড়াটিয়া ছিল। তিনি জানতে পারলেন, লোকটি পাশা খেলে। তাকে বলে পাঠালেন, যদি এই বদঅভ্যাস না ছাড়, তা হলে ঘর থেকে বের করে দেব।
একবার ঘরে একটি সাপ বের হলো। তিনি সাপটিকে মেরে ফেললেন। কেউ বলল, আপনি সাপটিকে মেরে ঠিক করলেন না। যদি এ কোনো মুসলমান জিন হয়ে থাকে। তিনি বললেন, এ যদি মুসলমান হতো, তা হলে উম্মুল মুমিনীনের ঘরে ঢুকত না। লোকটি বলল, যখন সে এসেছে, তখন আপনি তো পর্দার সঙ্গেই ছিলেন। এ কথা শুনে তিনি প্রভাবিত হলেন। ফিদয়া স্বরূপ একটি গোলাম আজাদ করলেন।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৬।
২. আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী রহ, পৃষ্ঠা: ২৩২।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 দাস-দাসীর প্রতি মমত্ব

📄 দাস-দাসীর প্রতি মমত্ব


শুধুমাত্র একটি কসম ভাঙার কারণেই তিনি চল্লিশ জন গোলামকে আজাদ করে দিয়েছিলেন। তাঁর আজাদ-করা গোলামের সংখ্যা ছিল সাতষট্টিটি। তার কাছে তামিম গোত্রের একটি দাসী ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে শুনেছিলেন, তামিমিরাও হযরত ইসমাঈল আ.-এর বংশধর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইঙ্গিতে তিনি এই দাসীকে আজাদ করে দেন। মদীনায় বারীরাহ রাযি. নাম্নী এক দাসী ছিলেন। তার মনিব তার সঙ্গে মুকাতাবার চুক্তি করেছিল। অর্থাৎ তাকে বলেছিল, যদি আমাকে এত টাকা দিতে পারো, তা হলে তুমি মুক্ত। বারীরাহ মদীনায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা আদায় করছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জানতে পেরে পুরো টাকাই নিজে পরিশোধ করলেন এবং বারীরাহকে মুক্ত করে দিলেন।' একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। লোকেরা বলল, কেউ যাদুটোনা করেছে। তিনি এক দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি যাদুটোনা করেছ? সে স্বীকার করল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? সে বলল, আপনাকে মেরে ফেলার জন্য। কারণ আপনি মারা গেলে আমি ছাড়া পাব। তিনি বললেন, এই দুষ্টকে কোনো দুষ্ট লোকের কাছেই বেচে দাও, আর এর পয়সা দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে এসো।' এটা এক ধরনের সাজা ছিল। কিন্তু কেমন অদ্ভুত!

টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী : باب الهجرة
৫. শরহে বুলুগুল মারাম, আমীর ইসমাঈল : كتاب العتق
৬. সহীহ বুখারী : كتاب العنق
১. সহীহ বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ-সহ আরও অনেক গ্রন্থে এসেছে।
২. হাদীসটি দারাকুতনী, মুয়াত্তা মালিক: (من رواية العضى মুয়াত্তা মুহাম্মাদ: (باب العنق মুসতাদরাকে হাকেম: (كتاب الطب) ইত্যাদি গ্রন্থে আছে। দাসীকে শাস্তি দিয়েছিলেন শরীয়তের খেলাফ কাজে জড়িত হওয়ার কারণে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 অভাবী ও ফকির-মিসকিন : আলাদা আচার-ব্যবহার

📄 অভাবী ও ফকির-মিসকিন : আলাদা আচার-ব্যবহার


অভাবী ও ফকির-মিসকিনের সঙ্গে অবস্থান ও মর্যাদাভেদে আলাদা আচার ব্যবহার করা উচিত। যদি কোনো নীচু পর্যায়ের ফকির বা মিসকিন আসে, তা হলে শুধু কিছু দিলেই সে খুশি। কিন্তু যদি এমন কোনো অভাবী ও প্রয়োজনগ্রস্ত আসে, যে ফকির-মিসকিনের মতো অত নীচু নয়; যদিও চেয়ে-মেঙ্গেই দিন চলে, তা হলে প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি একটু সম্মানেরও ব্যাপার থাকে। হযরত আয়েশা রাযি. এই বিষয়টিও লক্ষ রাখতেন। একবার এক ভিক্ষুক এল। তিনি এক টুকরো রুটি দিলেন। সে চলে গেল। একটু পর আরেকজন লোক এল। গায়ে কাপড়চোপড় ছিল। চলনে-বলনে মনে হচ্ছিল, একরকম সম্মানবোধ আছে। হযরত আয়েশা রাযি. তাকে বসালেন, খানা খাওয়ালেন, এরপর বিদায় করলেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, দুজনেই তো ফকির; কিন্তু দুজনের সঙ্গে দুরকম আচরণ কেন করলেন? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে আচার ব্যবহার করবে।

টিকাঃ
৩. আবু দাউদ: كتاب الأدب

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00