📄 অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ না করা
হযরত আয়েশা রাযি. অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে চাইতেন না। কখনো গ্রহণ করলেও শীঘ্রই বিপরীতে তিনিও কিছু না কিছু দিতেন। ইরাক বিজয়ের পর গনিমতের মধ্যে মোতির একটি দামি ডিব্বা পাওয়া গেল। সকলের অনুমতিক্রমে হযরত উমর রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.- এর খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. ডিব্বাটি উন্মুক্ত করে বললেন, আল্লাহ, ইবনে খাত্তাবের অনুগ্রহ গ্রহণের জন্য আমাকে আর বেশি বাঁচিয়ে রেখো না।' পুরো মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন জায়গা হতে একের পর এক উপঢৌকন আসতে থাকত। তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল, অবশ্যই যেন প্রত্যেক বস্তুর যথার্থ বিনিময় হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর, জনৈক আরব নেতা, কিছু দিনার ও কাপড় পাঠালেন। তিনি সেগুলোকে এই বলে ফেরত পাঠাতে চাইলেন যে, আমরা কারও অনুগ্রহ গ্রহণ করি না। কিন্তু পরক্ষণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণী মনে পড়ে যাওয়ায় তিনি তা রেখে দিতে বললেন।
টিকাঃ
২. মুসতাদরাকে হাকেম।
৩. আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী রহ. বাবুল কিতাবাতি ইলান নিসা।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৭।
📄 আত্মপ্রশংসা থেকে পরহেজ করা
হযরত আয়েশা রাযি. আত্মপ্রশংসা অপছন্দ করতেন। এমনকি, মৃত্যুশয্যায় একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি বুঝতে পারলেন, সে এসে আমার প্রশংসা করা শুরু করবে। তাই অনুমতি দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু অন্যদের অনুরোধে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস ভেতরে এসে সত্যি সত্যিই প্রশংসা করা শুরু করলেন। তাঁর প্রশংসা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হায় আমার যদি অস্তিত্বই না হতো!'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী। মুসতাদরাক। মুসনাদ।
📄 আত্মসম্মানবোধ
বাস্তবজীবনের অনেক অক্ষমতা ও অপারগতা সত্ত্বেও উম্মুল মুমিনীন রাযি.-কে মহান আল্লাহ ভীষণ আত্মসম্মান দান করেছিলেন। এই আত্মসম্মানবোধ যেমন তাঁর প্রকৃতিকে মহৎ করেছে, তেমনই কখনো কখনো অনুদারও করেছে। দীর্ঘদিনের বুকফাটা কষ্ট চেপে রাখার পর মহাগ্রন্থ আল কুরআনে যখন তাঁর দোষমুক্তি ও পবিত্রতা ঘোষিত হয়েছিল, তখনও এই প্রকৃতিস্থ আত্মাভিমানের দারুণ প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর ভাষ্যে। মা বললেন, যাও মা, স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তিনি কী আবেগঘন গভীর আবেদনে বললেন, আমি তো শুধু আমার প্রিয় প্রভুর প্রতিই কৃতজ্ঞ, যিনি আমার সতীত্বকে সম্মানিত করেছেন; আমার পবিত্রতাকে অলঙ্কৃত করেছেন।' পাঠক নিশ্চয় জেনেছেন, যখন পবিত্র জীবনসঙ্গীর প্রতি তাঁর অভিমান হতো, তখন শপথবাক্যে আর তাঁর নাম নিতেন না। এগুলো সবই প্রেমময়ী নারীর প্রেমের দাবি। এগুলো দাম্পত্যজীবনেরই অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. মাতৃপ্রতিম খালার খুবই সেবাযত্ন করতেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. ছিলেন অত্যন্ত বদান্য ও দানশীল। তিনি ভাগ্নের দেওয়া সবকিছুই এখানে-সেখানে দান করে দিতেন। ইবনে যুবায়ের রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে একবার বললেন, খালার হাত বেঁধে রাখতে হবে। ঘটনাক্রমে কথাটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কানে পৌঁছে যায়। তিনিও মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। তিনি শপথ করলেন, ভাগ্নের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না, তার দেওয়া কিছু গ্রহণ করবেন না। লোকেরা অনেক কাকুতি-মিনতি করেও যখন কাজ হলো না, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাতুল পক্ষের নিকটাত্মীয়দের শরণাপন্ন হলেন। অবশেষে তাদের হস্তক্ষেপে মাতার মানও ভাঙল, মানতও ভাঙল।
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী: ইফক।
৩. সহীহ বুখারী: মানাকিবে কুরাইশ।
📄 ন্যায় ও নিষ্ঠা
অনেক সময়, আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারীগণ আত্মসম্মানের কাছে পরাজিত হয়ে ন্যায় ও ধর্ম থেকে বিচ্যুত হন। কিন্তু নববী উদ্যানের স্বর্গীয় মালির পরিচর্যায় প্রস্ফুটিত সাদা গোলাবটি এমন ছিলেন না। মহান আল্লাহ তাঁকে উত্তম চরিত্রমাধুরীর পূর্ণাঙ্গতা দান করেছিলেন। বিচিত্র, বিরোধী, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলির নিখুঁত সমন্বয়েই তিনি ছিলেন মহীয়সী। তাই তো তাঁর আত্মসম্মান ছিল; কিন্তু ন্যায় ও ধর্ম থেকে অনাসক্তি ছিল না। যা ন্যায়-আত্মগর্বে কখনোই তা অস্বীকার করেননি। যা ধর্ম- আত্ম-অহংকারে কখনোই তা উপেক্ষা করেননি।
সহীহ মুসলিমে এসেছে, একবার জনৈক মিশরী হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের বর্তমান শাসক ও গভর্নরের মনোভাব কীরূপ? লোকটি বললেন, তাদের প্রতি আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কারও বাহনের অভাব হলে বাহনের ব্যবস্থা করেন। সেবক না থাকলে সেবকের ব্যবস্থা করেন। অর্থের প্রয়োজন হলে অর্থের ব্যবস্থা করেন। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তারা আমার অনুজ মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে যে আচরণ করেছে তা হৃদয়বিদারক; কিন্তু তারপরও আমাকে বলতেই হবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার এই ঘরে বসেই দুআ করেছিলেন, হে আল্লাহ, যারা আমার উম্মতের শাসনভার গ্রহণ করবে, তারা যদি আমার উম্মতের প্রতি নির্দয় হয়, তবে তুমিও তাদের প্রতি নির্দয় হয়ো; যদি সদয় হয়, তবে তুমিও তাদের প্রতি সদয় হয়ো।'
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: বাবু ফযিলাতিল ইমামিল আদিল।