📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 গীবত ও অন্যের দোষচর্চা থেকে বেঁচে থাকা

📄 গীবত ও অন্যের দোষচর্চা থেকে বেঁচে থাকা


তিনি কখনো কারও ক্ষতি করতেন না। দোষচর্চা করতেন না। তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কয়েক হাজার। কিন্তু এত বড় সংগ্রহশালায় কারও প্রতি অবজ্ঞামূলক একটি অক্ষরও নেই। সতিনদের দোষচর্চা করা নারীর সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু আমরা দেখেছি তিনি কত উদার মনোভাব নিয়ে সতিনদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করতেন। কত প্রসন্ন বদনে তাঁদের মহত্ত্ব-বড়ত্বের আলোচনা করতেন। হযরত হাসান রাযি. অপবাদ আরোপের ফেতনা থেকে আত্মরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনিও সুর মিলিয়েছিলেন অবাঞ্ছিত কপটশ্রেণির সঙ্গে। যে কেউ বুঝবেন হযরত আয়েশা রাযি. তার এহেন আচরণে কতটা ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন। অথচ এই হাসান রাযি.-ই হযরত আয়েশা রাযি.-এর মজলিসে আসতেন এবং তিনি সানন্দে তাকে জায়গা করে দিতেন। একবার হযরত হাসান রাযি. এলেন এবং স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন। কবিতাপঙক্তির একাংশের ভাবার্থ ছিল : তিনি কখনো কোনো সহজ-সরল নারীর দোষচর্চা করেন না। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ইফকের ঘটনা মনে পড়ে যায়; তিনি শুধু এটুকুই বললেন, 'কিন্তু হে হাসান, তুমি তো এমন ছিলে না।' তাঁর কাছের কিছু মানুষ অপবাদ আরোপের ঘটনায় জড়িত থাকায় হযরত হাসসান রাযি.-কে দেখতে পারতেন না। তারা দু-একবার তাঁকে উদ্দেশ্য করে বিরূপ মন্তব্য করতে চাইলে হযরত আয়েশা রাযি. খুবই কঠোরভাবে বাধা দেন এবং বলেন, তাকে মন্দ বোলো না, সেই তো তার কবিপ্রতিভায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কাফের-মুশরিকদের সমালোচনার দাঁতভাঙা জবাব দিত।
একবার জনৈক ব্যক্তির আলোচনা চলছিল। লোকটির প্রতি তাঁর অসন্তোষ লক্ষ করা গেল। লোকেরা বলল, উম্মুল মুমিনীন, তার ইন্তেকাল হয়ে গেছে। এ কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তার রুহের মাগফেরাতের দুআ করলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আপনাকে তো তার প্রতি অসন্তুষ্ট মনে হলো; অথচ তার জন্য দুআ করলেন? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা মারা গেছে, তাদের শুধু গুণই স্মরণ করো, কখনো দোষ স্মরণ কোরো না।'

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: ইফকের ঘটনা, তাফসীর- সূরা নূর।
২. সহীহ বুখারী: মানাকিবে হাসান রাযি.।
১. তয়ালিসি: মুসনাদে আয়েশা রাযি.।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ না করা

📄 অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ না করা


হযরত আয়েশা রাযি. অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে চাইতেন না। কখনো গ্রহণ করলেও শীঘ্রই বিপরীতে তিনিও কিছু না কিছু দিতেন। ইরাক বিজয়ের পর গনিমতের মধ্যে মোতির একটি দামি ডিব্বা পাওয়া গেল। সকলের অনুমতিক্রমে হযরত উমর রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.- এর খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. ডিব্বাটি উন্মুক্ত করে বললেন, আল্লাহ, ইবনে খাত্তাবের অনুগ্রহ গ্রহণের জন্য আমাকে আর বেশি বাঁচিয়ে রেখো না।' পুরো মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন জায়গা হতে একের পর এক উপঢৌকন আসতে থাকত। তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল, অবশ্যই যেন প্রত্যেক বস্তুর যথার্থ বিনিময় হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর, জনৈক আরব নেতা, কিছু দিনার ও কাপড় পাঠালেন। তিনি সেগুলোকে এই বলে ফেরত পাঠাতে চাইলেন যে, আমরা কারও অনুগ্রহ গ্রহণ করি না। কিন্তু পরক্ষণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণী মনে পড়ে যাওয়ায় তিনি তা রেখে দিতে বললেন।

টিকাঃ
২. মুসতাদরাকে হাকেম।
৩. আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী রহ. বাবুল কিতাবাতি ইলান নিসা।
৪. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৭।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আত্মপ্রশংসা থেকে পরহেজ করা

📄 আত্মপ্রশংসা থেকে পরহেজ করা


হযরত আয়েশা রাযি. আত্মপ্রশংসা অপছন্দ করতেন। এমনকি, মৃত্যুশয্যায় একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি বুঝতে পারলেন, সে এসে আমার প্রশংসা করা শুরু করবে। তাই অনুমতি দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু অন্যদের অনুরোধে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস ভেতরে এসে সত্যি সত্যিই প্রশংসা করা শুরু করলেন। তাঁর প্রশংসা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হায় আমার যদি অস্তিত্বই না হতো!'

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী। মুসতাদরাক। মুসনাদ।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আত্মসম্মানবোধ

📄 আত্মসম্মানবোধ


বাস্তবজীবনের অনেক অক্ষমতা ও অপারগতা সত্ত্বেও উম্মুল মুমিনীন রাযি.-কে মহান আল্লাহ ভীষণ আত্মসম্মান দান করেছিলেন। এই আত্মসম্মানবোধ যেমন তাঁর প্রকৃতিকে মহৎ করেছে, তেমনই কখনো কখনো অনুদারও করেছে। দীর্ঘদিনের বুকফাটা কষ্ট চেপে রাখার পর মহাগ্রন্থ আল কুরআনে যখন তাঁর দোষমুক্তি ও পবিত্রতা ঘোষিত হয়েছিল, তখনও এই প্রকৃতিস্থ আত্মাভিমানের দারুণ প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর ভাষ্যে। মা বললেন, যাও মা, স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তিনি কী আবেগঘন গভীর আবেদনে বললেন, আমি তো শুধু আমার প্রিয় প্রভুর প্রতিই কৃতজ্ঞ, যিনি আমার সতীত্বকে সম্মানিত করেছেন; আমার পবিত্রতাকে অলঙ্কৃত করেছেন।' পাঠক নিশ্চয় জেনেছেন, যখন পবিত্র জীবনসঙ্গীর প্রতি তাঁর অভিমান হতো, তখন শপথবাক্যে আর তাঁর নাম নিতেন না। এগুলো সবই প্রেমময়ী নারীর প্রেমের দাবি। এগুলো দাম্পত্যজীবনেরই অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. মাতৃপ্রতিম খালার খুবই সেবাযত্ন করতেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. ছিলেন অত্যন্ত বদান্য ও দানশীল। তিনি ভাগ্নের দেওয়া সবকিছুই এখানে-সেখানে দান করে দিতেন। ইবনে যুবায়ের রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে একবার বললেন, খালার হাত বেঁধে রাখতে হবে। ঘটনাক্রমে কথাটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কানে পৌঁছে যায়। তিনিও মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। তিনি শপথ করলেন, ভাগ্নের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না, তার দেওয়া কিছু গ্রহণ করবেন না। লোকেরা অনেক কাকুতি-মিনতি করেও যখন কাজ হলো না, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাতুল পক্ষের নিকটাত্মীয়দের শরণাপন্ন হলেন। অবশেষে তাদের হস্তক্ষেপে মাতার মানও ভাঙল, মানতও ভাঙল।

টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী: ইফক।
৩. সহীহ বুখারী: মানাকিবে কুরাইশ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00