📄 উত্তরাধিকার
হযরত আয়েশা রাযি. অল্প কিছু জিনিস রেখে গিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে একটি জমিও ছিল। এটা হযরত আসমা রাযি.-এর ভাগে পড়ে। আমীর মুআবিয়া রাযি. বরকতের উদ্দেশ্যে জমিটি অনেক চড়া মূল্যে (এক লক্ষ দিরহামে) কিনে নিয়েছিলেন।
পাঠক জানেন কি, হযরত আসমা রাযি. অত মুদ্রা কী করেছিলেন? প্রিয়জনদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছিলেন!
টিকাঃ
৪. সহীহ বুখারী : باب هية الواحد للجماعة
৫. আবু দাউদ: শিষ্টাচার অধ্যায়।
📄 পোষ্যগ্রহণ ও সন্তান-লালন
হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোনো সন্তান ছিল না। কিন্তু সারা জীবনে এমন কোনো ঘটনা নেই, যা থেকে ভাবা যেতে পারে যে ভাগ্যের প্রতি তাঁর কোনো অভিযোগ ছিল। আরবের অভিজাত লোকেরা নামের পাশাপাশি সন্তানদের নামে উপনাম গ্রহণ করতেন। কেননা সম্মানিত ব্যক্তির নাম নেওয়া ছিল অশোভন। তাই উপনামে সম্বোধিত হতেন। হযরত আয়েশা রাযি. একবার আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার স্ত্রীগণ যার যার আগের ঘরের সন্তানদের নামে উপনাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমি কার নামে উপনাম গ্রহণ করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমিও তোমার পুত্র আবদুল্লাহর নামে উপনাম গ্রহণ করো।'
ইবনুল আরাবী রহ. এখানে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়েশা রাযি. একটি অপূর্ণাঙ্গ শিশু প্রসব করেছিলেন। তারই নাম ছিল আবদুল্লাহ।' কিন্তু এ কথা একদমই অগ্রহণযোগ্য। কেননা বর্ণনাটি অত্যন্ত দুর্বল। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একটি বিশুদ্ধ বর্ণনাও এমন তথ্য দেয় না। বরং বেশ কিছু হাদীসে স্পষ্টত উল্লেখ আছে যে হযরত আয়েশা রাযি. নিঃসন্তান ছিলেন।
হাদীসে আবদুল্লাহ বলে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. উদ্দিষ্ট। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাগ্নে ছিলেন। তাঁর গর্ভধারিণী মাতা ছিলেন হযরত আসমা রাযি.। মুহাজির সাহাবীগণের মদীনায় ভূমিষ্ঠ হওয়া ইনিই প্রথম সন্তান। হিজরতের পর মদীনার কাফেররা বলাবলি করত, মুসলমান বিবিরা এখানে এসে দেখি বাঁজা হয়ে গেছে। তাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. যখন জন্মগ্রহণ করলেন, তখন মুসলমানগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত হয়ে তাঁর জিহ্বায় নিজের মুখে চিবানো খেজুর ও লালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
হযরত আয়েশা রাযি. যেন তাঁকে পোষ্যরূপে গ্রহণ করেছিলেন। মনেপ্রাণে তাঁকে ভালোবাসতেন। শিশু আবদুল্লাহও তাঁকে মায়ের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি আরও কয়েকটি শিশুকে অপত্যস্নেহে বড় করেছিলেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও এক আনসারি শিশুর লালন-পালন ও বিবাহ দেওয়ার কথা হাদীসে এসেছে।'
মাসরুক ইবনে আজদা, উমরাহ বিনতে আয়েশা রাযি., উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান আনসারিয়াহ রাযি., আসমা বিনতে আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাযি., উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের রাযি., কাসেম ইবনে মুহাম্মাদ ও তার ভাই এবং আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখকে হযরত আয়েশা রাযি. মায়ের মমতায় বড় করেছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি.-এর কন্যাদের দেখাশোনাও তিনিই করেছিলেন। তাদের বিবাহশাদিও হয়েছিল তাঁরই তত্ত্বাবধানে।
টিকাঃ
১. আবু দাউদ: শিষ্টাচার অধ্যায়।
২. যুরকানি: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৯।
৩. মুসনাদে আহমাদ: ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫।
১. মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহ.: কিতাবুল যাকাত।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৯।
৩. তাযকিরাতুল হুফফায, তরজমায়ে মাসরুক।
৪. আসমাউর রিজালে তাঁর জীবনী দ্রষ্টব্য।
৫. মুয়াত্তা: যাকাতু আমওয়ালিল ইয়াতামা।
৬. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩২।
৭. مُوَطَّاً : كتاب الزكوة ، زكوة الحلى
৮. মুয়াত্তা: কিতাবুত তালাক।
৯. সহীহ বুখারী: হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ।
📄 সাজ-সজ্জা ও পোশাক-পরিচ্ছদ
হযরত আয়েশা রাযি. ওইসব শিশুকন্যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাদের শারীরিক বর্ধনশীলতা অতিমাত্রায় লক্ষণীয়। আট-দশ বছর বয়সেই পূর্ণযৌবনা নারীআকৃতি ধারণ করেন। শৈশব ও কৈশোরে ছিলেন ছিপছিপে, দোহারা গড়ন। একটু বয়স হতেই মোটাসোটা ও ভারী হয়ে ওঠেন।" দুধে আলতা বরণ।" হাসিখুশি, সুন্দর।
স্বভাবে অল্পেতুষ্টি ও অনাড়ম্বরতা ছিল। সাদাসিধে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কাপড়চোপড় এক জোড়ার বেশি রাখতেন না। সেটিই ধুয়ে ধুয়ে পরতেন।' সঙ্গে একটি দামি কুর্তাও ছিল। যার তৎকালীন মূল্য ছিল চার দিরহাম। ওই সময়ের বিবেচনায় সেটি এতই মূল্যবান ছিল যে অনুষ্ঠানাদিতে ব্যবহার্য ছিল। নারীগণ বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য চেয়ে নিয়ে যেতেন।' কখনো কখনো কাপড়ে জাফরানের রঙ মেশাতেন। থেকে-থেকে অলঙ্কারও পরতেন। গলায় ইয়েমেনের বানানো সাদা-কালো পাথরের হার ছিল। আঙ্গুলে সোনা-চাঁদির আংটিও পরতেন।
টিকাঃ
১০. সহীহ বুখারী: ইফক। আবু দাউদ। باب السبق
১১. আবু দাউদ: 1 باب السبق
১২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৮। হয়তো এজন্যই তাঁর একটি উপাধি হুমায়রা।
১৩. সহীহ বুখারী: ইফক ও ঈলা।
১. সহীহ বুখারী: ا باب هل تصلي المرأة في ثوب حلضت فيه
২. সহীহ বুখারী: ا باب الاستعار للعروس
৩. সহীহ বুখারী: ا باب ما يلبس المحرم من الشباب
৪. সহীহ বুখারী: ا باب التيمم / باب الإفك
৫. সহীহ বুখারী : ا باب خاتم النساء
📄 স্বভাব-প্রকৃতি ও আচার-ব্যবহার
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. শৈশব থেকে শুরু করে পরিণত বয়স পর্যন্ত পুরো সময়টাই অতিবাহিত করেছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তার সান্নিধ্য-শোভায়, পৃথিবীতে যাঁর আগমন হয়েছিল উত্তম চরিত্রের ফুলকলিকে বিকশিত করতে, যাঁর স্বভাব-সৌন্দর্য ও চরিত্রমাধুরী স্বয়ং আল-কুরআন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থ: নিশ্চয় আপনি মহৎ চরিত্রবৈশিষ্ট্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত। (সূরা কলাম, আয়াত: ৪)
নববী-নীড়ের আত্মিক দীক্ষা নিঃসন্দেহে বিদুষী মাতাকে উন্নত চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখর অবলোকন করিয়েছিল, যা মানবাত্মার উন্নতির চূড়ান্ত পর্যায়। সেই সৌন্দর্য ও সুঘ্রাণই তাঁকে বিমোহিত করেছে। তিনিও হয়েছেন বিকশিত। এজন্যই তিনি ছিলেন বিদুষী, বিবেচক, বদান্য, অল্পেতুষ্ট, আবেদা এবং মহৎ।