📄 ইমাম হাসান রাযি.-এর দাফনের ঘটনা
ইমাম হাসান রাযি. ৪৯ হিজরীতে আমীর মুআবিয়া রাযি.-এর শাসনামলে মদীনায় মৃত্যুবরণ করেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবু বকর রাযি. এবং হযরত উমর রাযি. সমাহিত হয়েছিলেন। এক কোণে আরও একটি সমাধির সংকুলান ছিল। ইমাম হাসান রাযি. ওসিয়ত করেছিলেন, ওই কোণে আমাকে কবর দিয়ো। যদি বিবাদ হয়, তা হলে প্রয়োজন নেই। অনুজ ইমাম হুসাইন রাযি. যখন ওসিয়ত পূরণের মনঃস্থ করলেন, তখন মারওয়ান বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, হযরত উসমান রাযি.-কে যখন বিদ্রোহীরা এখানে সমাহিত হতে দেয়নি, তখন আর কারও এখানে জায়গা হবে না। ঘটনার প্রেক্ষিত এমন দাঁড়াল যে, হাশেমিগণ ইমাম হুসাইন রাযি.-এর সঙ্গে এবং উমাইয়াগণ মারওয়ানের সঙ্গে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে বেড়িয়ে এলেন। মুহূর্তেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উপক্রম হলো। তৎক্ষণাৎ হযরত আবু হুরায়রা রাযি. মধ্যস্থতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। তিনি মারওয়ানকে বোঝালেন, দোহিত্রকে মাতামহের সমাধির পাশে সমাহিত করা হবে, এতে তোমার কী আসে যায়? আবার ইমাম হুসাইন রাযি.- কেও বোঝালেন, তোমার অগ্রজ তো তোমাকে ওসিয়তের সঙ্গে সঙ্গে এও বলেছিলেন যে, যদি বাধা আসে তা হলে বিবাদ এড়িয়ে যাবে। যাই হোক, শেষমেশ সম্মানিত ইমামের মৃতদেহ জান্নাতুল বাকিতে আনা হয় এবং মা জননী হযরত ফাতেমা রাযি.-এর সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।
প্রশ্ন হলো, এ বিষয়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনোভাব কী ছিল? শিয়া সম্প্রদায়ের কিছু ঐতিহাসিক লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি. স্বয়ং কয়েকজন যোদ্ধা নিয়ে একটি সফেদ খচ্চরে আরোহণ করে ইমাম হাসান রাযি.-এর জানাযায় বাধা দিতে বের হয়েছিলেন। সৈন্যরা তির চালানো শুরু করলে কোনো এক ভ্রাতা ছুটে আসেন এবং বলেন, এখনো জঙ্গে জামালের দাগই বংশের গা থেকে কাটেনি; এরই মধ্যে এসেছ আরেক জঙ্গ বাধাতে। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা রাযি. ফিরে গেলেন।
আলোচ্য বর্ণনাটি তারীখে তাবারীর অতি প্রাচীন একটি ফারসি অনুবাদে পাওয়া গেছে। ভারতবর্ষে এটা এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু মূল আরবী গ্রন্থের সপ্তম খণ্ড অক্ষরে অক্ষরে অধ্যয়ন করেও এমন কোনো বর্ণনা আমাদের চোখে পড়েনি। উপরন্তু মূলের সঙ্গে আলোচ্য অনুবাদের অনেক অমিল দৃষ্টিগোচর হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনুবাদে অনেক সংযোজন-বিয়োজন রয়েছে। অনুবাদক ভূমিকায় তা স্পষ্টও করেছেন।
তৃতীয় শতকের শিয়া-মতাবলম্বী প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইয়াকুবি আলোচ্য বর্ণনাটি উদ্ধৃত করছেন ঠিকই; কিন্তু আর কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি। তাও, মূলত যে বাধা হয়েছিলেন মারওয়ান তা উল্লেখ করার পরই قيل (কথিত আছে/বলা হয়ে থাকে) বাক্যযোগে বর্ণনাটি বিবৃত। এমন উদ্ধৃতি নিঃসন্দেহে তথ্যগত ত্রুটি ও দুর্বলতাই নির্দেশ করে। কিন্তু, আল্লাহ মাফ করুন, কোথাও এমন কথা নেই যে, তিনি তির চালিয়েছেন বা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন, কিংবা যুদ্ধ বাধিয়েছেন।
আবুল ফিদায় শুধু এটুকু আছে যে, বনু হাশেম ও বনু উমাইয়ার মধ্যে যখন যুদ্ধের উপক্রম হলো, তখন হযরত আয়েশা রাযি. বলে পাঠালেন, এটা আমার মালিকানাধীন জায়গা। এতে আমি আর কাউকে দাফন করার অনুমতি দেব না। কিন্তু এ বর্ণনাও সঠিক নয়। কেননা ইবনে আসির-সহ সকল গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. খুশিমনেই অনুমতি ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি, আমীর মুআবিয়া রাযি.-এর পক্ষ হতে মদীনায় নিযুক্ত গভর্নরও বাধা হননি।
শুধুমাত্র মারওয়ানই ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে বিবাদ বাধানোর চেষ্টা করেছিলেন। ইমাম হাসান রাযি. বলে গিয়েছিলেন, যদি বিবাদের আশঙ্কা থাকে তবে মুসলমানদের সাধারণ গোরস্তানেই দাফন করবে। মারওয়ানের আচরণে হয়তো ইমাম হুসাইন রাযি. ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন; কিন্তু জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নির্দেশকে উপেক্ষা করতে চাননি।'
প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ ইবনে আবদুল বার ইসতিআব গ্রন্থে, ইবনে আসির উসদুল গাবাহ গ্রন্থে এবং আল্লামা সুয়ূতি রহ. তারীখুল খুলাফা গ্রন্থে হুবহু একই ভাষায় একই বর্ণনাকারীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন; উপরন্তু আলোচ্য বিবরক এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ইমাম হাসান রাযি.-এর মৃত্যুর সময় স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন:
... وَ قَدْ كُنْتُ طَلَبْتُ إِلَى عَائِشَةَ رضَ إِذَا مِتُّ أَنْ تَأْذَنَ لِي فَأُدْفَنَ فِي بَيْتِهَا مَعَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ نَعَمْ، وَ إِنِّي لَأَدْرِي لَعَلَّهَا كَانَ ذَلِكَ مِنْهَا حَيَاءٌ، فَإِنْ طَابَتْ نَفْسُهَا فَادْفَنِّي فِي بَيْتِهَا، وَ مَا أَظُنُّ إِلَّا الْقَوْمُ سَيَمْنَعُوْكَ إِذَا أَرَدْتَ ذَلِكَ. فَإِنْ فَعَلُوْا فَلَا تُرَاجِعُهُمْ فِي وَادْفَنِّي فِي الْبَقِيعِ الغرقد ....
অর্থ: ইমাম হাসান রাযি. ওসিয়ত করলেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে মৃত্যুর পর তাঁর গৃহে সমাহিত হওয়ার অনুমতি চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু কে জানে, হয়তো তিনি লজ্জাবশত হাঁ বলেছিলেন। তাই আমার মৃত্যুর পর পুনরায় অনুমতি চাইবে। যদি খুশিমনে অনুমতি দেন, তা হলেই দাফন করবে। তবে আমার মনে হচ্ছে, কিছু লোক তোমাকে বাধা দেবে। যদি সত্যিই বাধা দেয়, তা হলে বিবাদে জড়াবে না; জান্নাতুল বাকিতে দাফন করবে। ...
فَلَمَّا مَاتَ الْحَسَنُ أَتَى الْحُسَيْنُ عَائِشَةَ فَطَلَبَ ذَلِكَ إِلَيْهَا فَقَالَتْ نَعَمْ وَ كَرَامَةً فَبَلَغَ ذَلِكَ مَرْوَانَ فَقَالَ كَذَبَ وَ كَذَبَتْ وَاللَّهِ لَا يُدْفَنُ هُنَاكَ أَبَدًا .... مَنَعُوا عُثْمَانَ مِنْ دَفْنِهِ فِي الْمَقْبَرَةِ وَ يُرِيدُوْنَ دَفْنَ الْحَسَنَ فِي بَيْتِ عَائِشَةَ ؟
অর্থ: এরপর যখন হযরত হাসান রাযি. মৃত্যুবরণ করলেন তখন হুসাইন রাযি. হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে গেলেন এবং অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, আমি খুশিমনেই অনুমতি দিচ্ছি। মারওয়ানের কাছে সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, হুসাইন রাযি. এবং আয়েশা রাযি. দুজনেই মিথ্যা (ভুল) বলেছেন। হুসাইন রাযি.-কে ওখানে কিছুতেই দাফন করতে দেওয়া হবে না।...
উসমান রাযি.-কে গোরস্তানেও দাফন করতে দেওয়া হচ্ছিল না; আর হুসাইন রাযি.-কে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে দাফন করা হবে?
টিকাঃ
১. বিস্তারিত: ইবনে আসির, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৩ (ইউরোপের ছাপা)।