📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আমীর মুআবিয়া রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.

📄 আমীর মুআবিয়া রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.


একবার আমীর মুআবিয়া রাযি. মদীনায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করার জন্য গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি এভাবে সম্পূর্ণ একা একা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ। হতে পারত আমি কাউকে গোপনে প্রস্তুত রাখতাম, তুমি আসামাত্র সে তোমার মাথাটা উড়িয়ে দিত। আমীর মুআবিয়া রাযি. বললেন, এটা দারুল আমান (নিরাপদ ভূমি)। আপনি এখানে এমনটা করতে পারতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমান হলো হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য জিঞ্জিরস্বরূপ। এরপর আমীর মুআবিয়া রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সঙ্গে আমার ব্যবহার কেমন? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, ঠিক আছে। আমীর মুআবিয়া রাযি. বললেন, তা হলে উমাইয়া ও হাশেমি দ্বন্দ্বে দয়া করে কিছু বলবেন না। আল্লাহর আদালতে আমাদের মীমাংসা হবে।'
হাজার ইবনে আদি রাযি. একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি হযরত আলী রাযি.-এর একনিষ্ঠ অনুসারী ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় ছিলেন। কুফার তৎকালীন গভর্নর কিছু লোকের সাক্ষ্য অনুসারে বিদ্রোহীদের গ্রেফতার করে দামেশকে পাঠিয়ে দেন। হাজার ইবনে আদি ছিলেন ইয়ামানের কিনদা বংশীয়। কুফা ছিল আরব গোত্রগুলোর কেন্দ্রস্থল। স্বয়ং কিনদা বংশের লোকেরাও এখানে ছিলেন। তারা কেউই হাজারের পক্ষে কথা বলার সাহস করলেন না। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিদ্যমান সাহাবা কেরামের মধ্যে তাঁর ভালো মূল্যায়ন ছিল। তাই বিষয়টা কারও কাছেই সুখকর ছিল না। বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবর্গ হাজার রাযি.-এর পক্ষে সুপারিশ করলেন। কিন্তু প্রশাসন সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করল। মদীনায় সংবাদ পৌঁছলে হযরত আয়েশা রাযি.-ও বিষয়টি অবগত হন। তিনিও দূত-মারফত সুপারিশনামা পাঠান। কিন্তু আফসোস, দূত দামেশক পৌঁছার আগেই হযরত হাজার ইবনে আদি রাযি.-কে হত্যা করা হয়।
এই ঘটনার পর যখন হযরত আমীর মুআবিয়া রাযি. তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখন প্রথমেই তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, মুআবিয়া, হাজারের মামলায় তোমার ধৈর্য্য কোথায় ছিল? হাজারকে হত্যা করার ব্যাপারে তুমি আল্লাহকে ভয় করলে না। আমীর মুআবিয়া রাযি. বললেন, এতে আমার দোষ ছিল না, দোষ ছিল যারা সাক্ষ্য দিয়েছিল তাদের। আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আমীর মুআবিয়া রাযি. বললেন, মাতা, কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি পাশে না থাকায় এমনটা হয়েছে। তাবেঈ মাসরুক বর্ণনা করেন, তখন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম, যদি মুআবিয়া জানত যে, এখনো কুফায় সৎ সাহস ও আত্মসম্মানবোধ বলতে কিছু আছে, তা হলে সে কিছুতেই তাদের চোখের সামনে হাজারকে ধরিয়ে এনে সিরিয়ায় হত্যা করতে পারত না। কিন্তু রাক্ষসী হিনদার' পুত্র খুব ভালো করেই জেনে গেছে যে, এখন সত্যিকারের মানুষ উঠে গেছে। আল্লাহর কসম, একসময় কুফা সাহসী ও সম্মানী নেতৃবৃন্দেরই আবাস ছিল। কবি লাবিদ ঠিকই বলেছেন':
ذَهَبَ الَّذِيْنَ يُعَاشُ فِي أَكْنَافِهِمْ * وَبَقِيَتْ فِي خَلْفٍ كَجِلْدِ الْأَحْرَابِ
অর্থ : ওই মানুষগুলো চলে গেছে, যাদের ছায়ায় জীবনটা উপভোগ্য মনে হতো। এখন যারা আছে এদের অধীনে জীবনটা খোস-পাঁচড়ায় আক্রান্ত উটের চামড়ায় মতোই ঘৃণিত মনে হয়।
لَا يَنْفَعُوْنَ وَ لَا يُرْجَى خَيْرُهُمْ * وَ يُعَابُ قَائِلُهُمْ وَ إِنْ لَّمْ يَتَّعب
অর্থ : এরা না উপকার করে, না এদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায়। এদের মাঝে কথা বললেও দোষী হতে হয় দোষ না করেও।

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমাদ: ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২।
২. তাবারী: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪৫।
৩. তাবারী: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪৫।
৪. তাবারী: ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৬।
৫. হিনদা—আমীর মুআবিয়া রাযি.-এর মাতা। তিনি উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযা রাযি.-এর বুক চিরে তাঁর কলজে চিবিয়েছিলেন।
৬. পুরো ঘটনাটি তাবারী সপ্তম খণ্ডে আছে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 খারেজীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি

📄 খারেজীদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি


ইরাকীগণ এবং মিশরীগণ হযরত উসমান রাযি.-কে দোষারোপ করতেন। সিরীয়গণ অশোভন আচরণ করতেন হযরত আলী রাযি.-এর শানে। খারেজীগণ উভয়কেই দু'চোখে সহ্য করতে পারতেন না। হযরত আয়েশা রাযি. এই ফেরকাগুলো সম্পর্কে জেনে বললেন, কুরআনুল কারীম আমাদের বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের জন্য তোমরা ক্ষমা ও করুণার প্রার্থনা করো; অথচ এই মানুষগুলো তাঁদের গালি-গালাজ করা শুরু করেছে। খারেজীগণ হযরত আলী রাযি.-এর দল ত্যাগ করে সর্বপ্রথম মাকামে হুরুরে সমবেত হয়েছিলেন। এজন্য তাদের শুরুতে হুরুরিয়া নামে অভিহিত করা হতো। জনৈকা মহিলা হযরত আয়েশা রাযি.-এর দরবারে এসে মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন, বিশেষ দিনগুলোর (মাসিকের) রোযার মতো নামাযেরও কাযা করতে হবে না কেন? হযরত আয়েশা রাযি. তার প্রশ্নে বিরক্ত হলেন এবং বললেন, যুক্তির ঘোড়া ছোটাচ্ছ যে? হুরুরিয়া হয়ে গেছ নাকি?' অর্থাৎ তিনি এই ফেরকাকে পছন্দ করতেন না।

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, তাফসীর অধ্যায়। নববী।
২. সহীহ বুখারী: হায়েয অধ্যায়।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত মুআবিয়া রাযি.-কে উপদেশ

📄 হযরত মুআবিয়া রাযি.-কে উপদেশ


আমীর মুআবিয়া রাযি. একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর সমীপে পত্র প্রেরণ করলেন। পত্র-মারফত মিনতি করলেন, আমাকে একটি ছোট্ট উপদেশ দিন, যা আমি বিশেষভাবে পালন করব। হযরত আয়েশা রাযি. উত্তরে লিখলেন:
'সালামুন আলাইকুম, পরকথা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির পরোয়া না করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তাকে মানুষের অসন্তুষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরোয়া না করে মানুষের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তাকে মানুষের হাতে ছেড়ে দেন। ওয়াস সালামু আলাইক।'
হযরত আয়েশা রাযি.-এর উপদেশবাক্যটি আমীর মুআবিয়া রাযি.- এর পুরো জীবনের ওপর একটি সারগর্ভ আলোকপাত বলা চলে।

টিকাঃ
১. তিরমিযী: যুহদ অধ্যায়।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 ইয়াযিদের বাইয়াত প্রসঙ্গ

📄 ইয়াযিদের বাইয়াত প্রসঙ্গ


আমীর মুআবিয়া রাযি. আপন সন্তান ইয়াযিদকে স্থলাভিষিক্ত করার সংকল্প করেন। মারওয়ান ছিলেন মদীনার গভর্নর। জনসম্মুখে তিনি ইয়াযিদের নাম ঘোষণা করলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভ্রাতা আবদুর রহমান বিরোধিতা করেন। মারওয়ান তাঁকে গ্রেফতার করতে উদ্যত হন। হযরত আবদুর রহমান দৌড়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে ঢুকে পড়েন। মারওয়ান ভেতরে প্রবেশের সাহস করতে পারলেন না। ক্রোধে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, এ তো সে—যাঁর ব্যাপারে এই আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
وَالَّذِي قَالَ لِوَالِدَيْهِ أُفٍّ لَكُمَا
অর্থ: আর ওই ব্যক্তি, যে তার পিতামাতার উদ্দেশ্যে বলল, উহ। (সূরা আহকাফ, আয়াত: ১৭)
মারওয়ানের মন্তব্য শুনে হযরত আয়েশা রাযি. পর্দার আড়াল থেকে বললেন, আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কোনো আয়াত নাজিল করেননি; শুধু আমার পবিত্রতার ঘোষণা করেছেন।' আলোচ্য ঘটনা থেকে অনুমান করা হয়, ইয়াযিদের রাজ্যাভিষেকে হযরত আয়েশা রাযি. অসন্তুষ্ট ছিলেন।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী: তাফসীর সূরা আহযাব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00