📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 মনোমালিন্যের দাবির খণ্ডন

📄 মনোমালিন্যের দাবির খণ্ডন


ইফকের ঘটনায় হযরত আলী রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আপনি চাইলে হযরত আয়েশা রাযি.- কে আলাদা করে দিতে পারেন। কিছু অন্তর্দৃষ্টিহীন মানুষ এ কথা বলতে চান, হযরত আলী রাযি.-এর এমন নিষ্ঠুর উত্তরে হযরত আয়েশা রাযি. ভীষণভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। তাদের দাবি, যুদ্ধে হযরত আয়েশা রাযি.-এর নেতৃত্বদানের প্রকৃত কারণ এটাই ছিল।
যুদ্ধের পূর্ব বিবরণ আপনাদের সামনে আছে। আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও আমরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর যুদ্ধকালীন বার্তা ও পত্রগুলো উদ্ধৃত করেছি শুধু এজন্যই। এগুলোর কোথাও হযরত আলী রাযি.-এর প্রতি তাঁর কোনো ক্ষোভ বা অসন্তোষ পাঠক পেয়েছেন কি? যুদ্ধটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সংঘটিত হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট কিছু পাপী ছাড়া উভয় পক্ষের সবাই নির্দোষ ও নিরপরাধ ছিলেন。
এ কথা সত্য যে, হযরত আয়েশা রাযি. সাবাঈদের একটি অমূলক দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা দাবি করত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় হযরত আলী রাযি.-এর অনুকূলে খেলাফতের ওসিয়ত করে গেছেন। এ ব্যাপারে হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে মাথা রেখে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি এমন ওসিয়ত কখন করলেন?' কিন্তু এ থেকেই তো হযরত আলী রাযি.-এর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রমাণিত হয় না। এটা তো একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা। জনৈক ব্যক্তি একবার হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যা কী?
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَ مِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَ مِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ
অর্থ: এরপর আমি আমার নির্বাচিত বান্দাদের কিতাব দান করলাম। তাদের কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী, কেউ মধ্য-মতাবলম্বী, কেউ কল্যাণে অগ্রণী। (সূরা ফাতির, আয়াত: ৩২)
হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, পুত্র, এই তিন দলই জান্নাতে যাবে। এটা পূর্বোক্ত আয়াতে কারীমার শেষাংশেরই ইঙ্গিত:
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا
অর্থ: এরা চিরস্থায়ী জান্নাতে থাকবে। (সূরা রাদ, আয়াত: ২৩)
এরপর তিনি বললেন, سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ (কল্যাণে অগ্রণী) তাঁরা, যাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তিনি তাঁদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন। مُقْتَصِدٌ (মধ্য- মতাবলম্বী) তাঁরা, যাঁরা রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করেছেন এবং এর ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন। আর ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ (নিজের প্রতি জুলুমকারী) হলো— আমার আর তোমার মতো সাধারণ মানুষ。
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং আশতার নাখঈ হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষাবলম্বী ও যুদ্ধের মূল হিরো ছিলেন। এরা একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। হযরত আম্মার রাযি. বললেন, 'হে আমার মাতা, ...' হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমি তোমার মাতা নই। তিনি বললেন, আপনি অবশ্যই আমার মাতা; যতই অস্বীকার করুন। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে কে এসেছে? তিনি বললেন, আশতার নাখঈ। তিনি আশতার নাখঈকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমিই সে ছিলে না, যে আমার ভাগ্নেকে মেরে ফেলতে চাইছিলে? আশতার নাখঈ বললেন, সে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল, তাই আমিও তা-ই চাইছিলাম। তিনি বললেন, যদি তা- ই হতো, তা হলে তুমি বাঁচতে পারতে না।' মুসনাদে আহমদের বর্ণনা: এরপর তিনি বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আর তয়ালিসিতে' আছে, তিনি বললেন, হে আম্মার, তুমি তো জানোই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— কোনো মুমিনের রক্তপাত ঘটানো বৈধ নয়; তবে তিন কারণে বৈধ: যদি সে মুরতাদ হয়, যদি যিনা করে, যদি কাউকে হত্যা করে। এই হাদীসটি উল্লেখ করার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা রাযি. রক্তপাত ঘটানোর জন্য সংশোধনকামী বাহিনী গঠন করেননি।
মূলত এই বিভ্রাট ও আপত্তির সূচনা করেছেন বনু উমাইয়ার লোকেরা। ঘটনা শুধু এই যে, হযরত আলী রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, মুনাফিকদের রটনার প্রতি যদি আপনার ভ্রুক্ষেপ থেকেই থাকে, তা হলে তাঁকে পৃথক করে দিন—এত বিচলিত হওয়ার কী আছে? ...বনু উমাইয়ার হোমরাচোমরারা যখন হযরত আলী রাযি.-এর ওপর আপত্তি করার কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন তিলকে তাল করে এটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। কেননা কুরআনে কারীমে, যারা হযরত আয়েশা রাযি.-এর ওপর অপবাদ আরোপে মূল ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের ব্যাপারে জাহান্নামী হওয়ার ঘোষণা এসেছে। একবার ইমাম যুহরী রহ. ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের দরবারে উপস্থিত ছিলেন। ওয়ালিদ বললেন, ওই অভিশপ্ত লোক তো আলী [রাযি.]-ই না? যার ব্যাপারে কুরআনে এসেছে—
وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
অর্থ : আর যে অপবাদ আরোপকারীদের মূল হোতা ছিল, তার জন্য রয়েছে বিরাট আজাব। (সূরা নূর, আয়াত : ১১)
ইমাম যুহরী রহ. বলেন, আমার অন্তর ভীত ছিল, সত্য বলার সাহস হচ্ছিল না; কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমার আল্লাহ আমাকে মুখ খোলার তওফিক দিলেন, আমি বলে উঠলাম, আল্লাহ আমাদের নেতাকে সঠিক বুঝ দান করুন; তাঁর বংশেরই দুইজন মানুষ আমাকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ভাষ্য শুনিয়েছেন :
كَانَ عَلِيٌّ مُسَلَّمًا فِي شَأْنِهَا
অর্থ : হযরত আলী রাযি. তাঁর ব্যাপারে ফেতনা থেকে নিরাপদে ছিলেন। (বুখারী)'
ইমাম যুহরী রহ.-এর কথা শোনার পরও ওয়ালিদ আশ্বস্ত হননি। তিনি তার দাবির ওপর অটল ছিলেন。
মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হযরত আব্বাস রাযি. এবং হযরত আলী রাযি. মিলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে পৌঁছে দিতেন। হযরত আয়েশা রাযি. এই বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্বাস রাযি. এবং আরেকজনের কাঁধে ভর করে ঘরে আসতেন। কুধারণাপোষণকারীদের মন্তব্য, হযরত আয়েশা রাযি. হযরত আলী রাযি.-কে এত অপছন্দ করতেন যে, তাঁর নামও মুখে উচ্চারণ করতে চাননি। অথচ বাস্তবতা হলো, সাধারণত একদিকে হযরত আব্বাস রাযি. ধরতেন, অন্যদিকে কখনো হযরত আলী রাযি., কখনো উসামা বিন যায়েদ রাযি. ধরতেন। এ কারণেই, বলতে গিয়ে মুখে প্রথমে হযরত আব্বাস রাযি.-এর নাম এসেছে, আর অন্যজনের নাম নির্দিষ্ট করে আসেনি। অথবা সংক্ষেপণের জন্যই তিনি বলেছেন, 'আরেকজন'।'
এই মহিমান্বিত দুই ব্যক্তির পারস্পরিক মনোমালিন্যের বিষয়টি প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমেও খণ্ডিত হয়ে যায়। তারীখে তাবারীতে এসেছে, তাঁরা জনসম্মুখে নিজেদের মনঃস্বচ্ছতার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁদের মানাকেব (মর্যাদা) সংবলিত হাদীসগুলোতে এরকম একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। জনৈক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে কাকে বেশি ভালোবাসতেন? তিনি বললেন, হযরত ফাতেমা রাযি.-কে। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষদের মধ্যে? তিনি বললেন, তাঁর জীবনসঙ্গী খুব নামাযী ও রোযাদার ছিলেন।'
হযরত আলী রাযি. যে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত, আমরা আহলুস সুন্নাহ তা জানতে পেরেছি হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাধ্যমেই। প্রায়ই এমন হতো যে, কোনো জিজ্ঞাসু ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে আসতেন, আর তিনি তাকে হযরত আলী রাযি.-এর খেদমতে পাঠিয়ে দিতেন।'
যখনই তিনি কোনো সফর থেকে ফিরতেন, জামাইয়ের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন।' খারেজিদের হাতে হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদত বরণের পর লোকেরা কুফা থেকে মদীনায় এলে এ নিয়ে আলোচনা উঠত। একবার হযরত আয়েশা রাযি. জনৈক ব্যক্তিকে ডেকে বললেন—হে আল্লাহর বান্দা, আমি তোমাকে যা যা জিজ্ঞেস করব, সত্য সত্য বলবে তো? লোকটি বললেন, কেন বলব না, মাতা? হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, যে লোকগুলোকে হযরত আলী রাযি. মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, তাদের ঘটনাটা কী ছিল? লোকটি তখন আমীর মুআবিয়া রাযি. এবং হযরত আলী রাযি.-এর সমঝোতা, খারেজিদের বিচারে দ্বিমত, হযরত আলী রাযি.-এর বোঝানো এবং তাদের না মানা—সবকিছু বর্ণনা করলেন। সব শুনে হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আল্লাহ হযরত আলী রাযি.-কে রহম করুন, তাঁর যখন কোনো কথা ভালো লাগত, তখন বলতেন, (صَدَقَ اللَّهُ وَ رَسُوْلُهُ ) (আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন)। ইরাকবাসীরা তাঁর ওপর মিথ্যা আরোপ করেছে। তিলকে তাল বানিয়ে অনেক কথা রটিয়েছে।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, বাবু ওয়াফাতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পৃষ্ঠা: ৬৪১।
২. মুসনাদে আহমাদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২০৫।
৩. তয়ালিসি: মুসনাদে আয়েশা রাযি.।
৪. ঘটনাটি সহীহ বুখারীর দুই জায়গায় এসেছে। বিস্তারিত ফাতহুল বারী গ্রন্থে ইফকের হাদীসের ব্যাখ্যায় দেখুন।
৫. সহীহ বুখারী, ا ذكر وفاة مع كرما في
৬. তিরমিযী, মানাকিব।
৭. সহীহ মুসলিম।
৮. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৫; ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯২ ইত্যাদি।
৯. মুসনাদে আহমদ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫৫।
১০. মুসনাদে আহমদ: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৭। বুখারী : حلق أفعال العباد, পৃষ্ঠা: ১৯১ (মাতবুআয়ে আনসারি)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00