📄 যুদ্ধের সমাপ্তি
দাব্বিরা এতটাই জোশে উঠে গিয়েছিল যে, একজন একজন করে আগে বাড়ছিল আর উটের রশি ধরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। একজন লুটিয়ে পড়তে না পড়তেই আরেকজন ছুটে আসছিল। তার কিছু হলে আরেকজন আসছিল। এভাবে সত্তর জন শুধু রশি ধরে থেকেই জীবন উৎসর্গ করল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. উটের কাছে দণ্ডায়মান থেকে ঢাল তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যে-ই উটের দিকে এগিয়ে আসছিল তারই হাত উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর চারপাশে-মনে হচ্ছিল-ছিন্ন হাতগুলো যেন উড়ছে। একপর্যায়ে হযরত আয়েশা রাযি.-কে ঘিরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ করে হযরত আলী রাযি. নিজে এগিয়ে এলেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে। আশতার নাখঈ (প্রকৃত নাম মালিক) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি.-এর কাছে চলে এলেন। দুজনই প্রসিদ্ধ বীর। যুদ্ধ যেন নতুন মোড় নিল। আঘাত পাল্টা আঘাতে দুজনই ক্ষতবিক্ষত হলেন। একপর্যায়ে তারা দৌড়ে গিয়ে একে অপরকে জাপটে ধরলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. চিৎকার করে বলতে লাগলেন,
اقْتُلُوْنِي وَ مَالِكًا * اقْتُلُوْا مَالِكًا مَّعِيْ
অর্থ: আমাকে এবং মালিককে মেরে ফেল। আমার সঙ্গে মালিককে মেরে ফেল।
আশতার বলেন, লোকে আমাকে মালিক নামে চিনত না। তা না হলে, আমার খবর হয়ে যেত। বনু দাব্বার কিছু লোক অন্য পক্ষেও ছিলেন। তারা চিন্তা করলেন, যদি উম্মুল মুমিনীনের উট দাব্বিদের দৃষ্টির আড়াল না হয়, তা হলে আমাদের গোত্রের একটা লোকও বাঁচবে না। যতক্ষণ একজনেরও জীবন থাকবে এবং উট দণ্ডায়মান থাকবে ততক্ষণ তারা থামবে না। তাই জনৈক দাব্বি পেছন থেকে উটের পায়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। উট পড়ে গেল। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি. দৌড়ে গিয়ে হাওদা সামলে নিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর ভেতরে হাত দিয়ে দেখতে চাইলেন যে কোনো জখম হয়েছে কি না। হযরত আয়েশা রাযি. বলে উঠলেন, এ কোন অভিশপ্তের হাত? তিনি তৎক্ষণাত বললেন, আপনার অনুজ মুহাম্মাদের। ভগ্নি, আপনার কোনো জখম হয়নি তো? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি মুহাম্মাদ (নন্দিত) নও; তুমি মুযাম্মাম (নিন্দিত)। হযরত আলী রাযি.-ও পৌঁছে গেলেন। তিনি হালপুরসি করলেন। উম্মুল মুমিনীন রাযি. উত্তর দিলেন, ভালো আছি।
📄 হেজাজের পথে
হযরত আলী রাযি. উম্মুল মুমিনীন রাযি.-কে তাঁর পক্ষাবলম্বী জনৈক বসরি নেতার বাড়িতে অবতরণ করালেন। উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীর আহত সৈন্যরা ওই বাড়িতেই আত্মগোপন করেছিল। পরবর্তীতে হযরত আলী রাযি. এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। হযরত আলী রাযি. খুব ভালোভাবেই জানতেন যে, এই বাড়িতেই আহত সৈন্যরা আত্মগোপন করে আছে; কিন্তু তারপরও তিনি কিছু করেননি বা বলেননি। এরপর মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকরের তত্ত্বাবধানে হযরত আয়েশা রাযি.-কে প্রায় চল্লিশজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলার সঙ্গে হেজাজে পৌঁছে দেওয়া হয়। সাধারণ মুসলমানগণসহ স্বয়ং হযরত আলী রাযি.-ও অনেক দূর পর্যন্ত বিদায় জানাতে এগিয়ে আসেন। ইমাম হাসান রাযি. কয়েক মাইল সঙ্গে গিয়েছিলেন। সফরের শুরুতে হযরত আয়েশা রাযি. জনসম্মুখে ঘোষণা দেন, হযরত আলী রাযি.-এর সঙ্গে আমার আগেও কোনো মনোমালিন্য ছিল না; এখনো নেই। তবে শ্বাশুড়ি ও জামাইয়ের মধ্যে যে দু-একটি বিষয় থাকে তা অস্বীকার করব না। হযরত আলী রাযি.-ও একই ধরনের কথা বলেন। এরপর এই ছোট্ট কাফেলাটি হেজাজের পথে রওয়ানা হয়।'
টিকাঃ
১. আলোচ্য ঘটনাগুলো সবই তারীখে তাবারী থেকে নেওয়া। দুঃখের বিষয়, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কোনো সনদে আসেনি। কেননা, হাদীসগ্রন্থগুলো এসব ঘটনায় প্রায় নীরব।