📄 রণাঙ্গনে কুরআন-প্রদর্শন
এদিকে কাব ইবনে সুরকে হযরত আয়েশা রাযি. নিজের কুরআন শরীফ দিয়ে বললেন, যাও এটা দেখিয়ে মানুষকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান করো। তিনি কুরআন উন্মুক্ত করে উভয় বাহিনীর মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে গেলেন। দুষ্টচক্র পরিণতি বুঝতে পেরে দূর থেকে তাকেও তির মেরে নিশ্চুপ করে দিল।
📄 উম্মুল মুমিনিনের ওপর আক্রমণ এবং বনু দাব্বার প্রতিরোধ
দ্বিপ্রহর হয়ে গেল। সন্ধির কথা জেনে সাধারণ মুসলমানদের একটি বড় অংশ আগেই সরে গিয়েছিলেন। সাবাঈরা সবাই ছিল হযরত আলী রাযি.-এর দলে। এ কারণে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাহিনী হয়ে পড়ে নড়বড়ে। উভয় পক্ষের সাধারণ যোদ্ধাগণ ছিলেন একে অপরের আপনজন। তাই কেউ কাউকে হত্যা করতে চাইছিলেন না। শুধু প্রতিহত ও পরাস্ত করতে চাইছিলেন। তারা একে অপরের হাত ও পায়ে আঘাত করছিলেন। মাথা ও বুক এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তখনো আশা করছিলেন, শীঘ্রই এই অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ বন্ধ হবে। ... রণক্ষেত্রে অসংখ্য ছিন্ন হাত ও পা পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল।
সাবাঈরা এত নিকৃষ্ট ছিল যে, তারা ধান্দা করছিল, যদি কোনোভাবে হযরত আয়েশা রাযি.-কে বাগে পায়, তা হলে ভীষণভাবে অপদস্থ করবে।' এজন্য কুফার লোকেরা হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.-কে হত্যা করার পর হযরত আয়েশা রাযি.-এর উটের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে। ভয়াবহতা লক্ষ করে মুষ্টিমেয় মুসলিম যোদ্ধাগণ চতুর্দিক থেকে স্তরে স্তরে ব্যূহাকারে মাতাকে ঘিরে ধরেন এবং মাতার সম্মান ও জীবন রক্ষাকেই জীবনের চরম ও পরম প্রাপ্তি জ্ঞান করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার সংকল্প গ্রহণ করেন। মুযারি সবগুলো গোত্র, বিশেষ করে বনু আদ ও বনু দাব্বা সমরে আবির্ভূত হন অপরিমেয় জোশ আর তেজস্বিতা নিয়ে। একদিকে শত্রুসাগরের দানবীয় গ্রাস, অন্যদিকে সন্তানদের পর্বতপ্রমাণ প্রতিরোধ। মুসলিম জননীর ডান দিকে বনু বকর, বাম দিকে আযদ, সামনে বনু নাজিয়া। তারা লড়ছে, মরছে-উম্মুল মুমিনীনের সম্মানের জন্য, উম্মুল মুমিনীনের জীবনের জন্য।
টিকাঃ
১. প্রমাণ: সাবাঈরা যখন বিভক্ত হয়ে খারেজি সম্প্রদায়ের গোড়াপত্তন করেছিল, তখন এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করেছিল, তোমরা তো স্বয়ং মাতাকেই দাসী বানাতে চেয়েছিলে।
২. তারীখে তাবারী: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৯৩।
📄 বনু দাব্বার রণসঙ্গীত
মুসলিম জননীর সম্মান রক্ষা করতে তাঁর কলিজার টুকরারা হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করে চলেছে। উট ব্যূহের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান। হাওদাকে লক্ষ্য করে শত্রুরা তিরের ঝড় তুলেছে। সন্তানেরা চারদিক থেকে সেই তিরঝড় হয়তো প্রতিহত করছে, নয়তো বুক পেতে বরণ করছে। যুদ্ধের তালে তালে রণিত, ধ্বনিত হচ্ছিল:
يَا أُمَّنَا يَا خَيْرَ أُمَّ نَعْلَمْ أَمَا تَرَيْنَ كَمْ شُجَاعٍ يُكْلَمْ وَتَخْتَلِي هَامَتُهُ وَالْمُعْصَمْ
অর্থ: হে আমাদের মাতা, হে আমাদের শ্রেষ্ঠ মাতা, দেখুন! আপনার বীর সন্তানদের দেখুন! কত বীর কত আঘাত বুক পেতে নিচ্ছে। কত বক্ষ ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। কত মস্তক জমিনে ছিটকে পড়ছে। দেখুন, আপনার বীর সন্তানদের দেখুন!
দাব্বিদের এমন রক্তজোশ আর মরণস্পৃহা দেখে সবার মুখে মুখে একই কথা, যতক্ষণ না উটকে বসানো যাচ্ছে, ততক্ষণ এই উন্মাদনা থামবে না। বনু দাব্বা উটকে ব্যূহের ভেতর সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষদের মধ্য থেকে যেই এদিকে আসছে, ফিরে যেতে পারছে না। তাদের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছে উদ্দীপনার রণসঙ্গীত:
نَحْنُ بَنُو ضَبَّةٍ لَا نَفِرُ * حَتَّى نَرَى جَمَّا جَمَّا تَخِرُ * يَخِرُّ مِنْهَا الْعَلَقُ الْمُحْمَرُ
অর্থ: আমরা বনু দাব্বার বীরযোদ্ধা। আমরা যুদ্ধে অটল-অবিচল। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, আমরা লড়ে যাব। একটি মস্তকও থাকতে, একবিন্দু রক্তও থাকতে আমরা হার মানব না।
يَا أُمَّنَا يَا عَيْشَ لَنْ تُرَاعُ * كُلُّ بَنِيْكَ بَطَلٌ شُجَاعُ
অর্থ: হে আমাদের মাতা, হে আয়েশা, আপনি একটুও বিচলিত হবেন না। আপনার একেকটা সন্তান চির দুর্জয় বীর, চির সাহসী যোদ্ধা।
يَا أُمَّنَا يَا زَوْجَةَ النَّبِيِّ * يَا زَوْجَةَ الْمُبَارَكِ الْمَهْدِي
অর্থ: হে আমাদের মাতা, হে আমাদের প্রিয়তমের প্রিয়তমা, হে আমাদের বরকতময় রাসূলের স্ত্রী, আমাদের আদর্শ পুরুষের সহধর্মিনী।
তবে তাদের সবচেয়ে তেজোদীপ্ত রণকাব্য ছিল এটি:
نَحْنُ ضَيَّةُ أَصْحَابُ الْجَمَلْ * الْمَوْتُ أَحْلَى عِنْدَنَا مِنَ الْعَسَلْ
অর্থ: আমরা দাব্বার বীর সন্তান। আপনার উটের রশি আমরাই সামলাব-যদি মৃত্যু আসে আসুক, মৃত্যু তো সুধার মতো।
نَحْنُ بَنُوا الْمَوْتِ إِذَا الْمَوْتُ نَزَلْ * نَنْعِي ابْنَ عَفَّانَ بِأَطْرَافِ الْأَسَلْ * رُدُّوا عَلَيْنَا شَيْخَنَا ثُمَّ بَجَلْ
অর্থ: যদি মৃত্যু আসে তো ভয় কী? আমরা তো মৃত্যুর সঙ্গেই খেলা-করা রণবীর। আফফানের পুত্রের মৃত্যু-সংবাদ আমরা অস্ত্রাঘাতেই প্রচার করব। পারলে আমাদের নেতাকে ফিরিয়ে দাও, তবেই আমরা ক্ষান্ত হব।
📄 যুদ্ধের সমাপ্তি
দাব্বিরা এতটাই জোশে উঠে গিয়েছিল যে, একজন একজন করে আগে বাড়ছিল আর উটের রশি ধরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। একজন লুটিয়ে পড়তে না পড়তেই আরেকজন ছুটে আসছিল। তার কিছু হলে আরেকজন আসছিল। এভাবে সত্তর জন শুধু রশি ধরে থেকেই জীবন উৎসর্গ করল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. উটের কাছে দণ্ডায়মান থেকে ঢাল তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যে-ই উটের দিকে এগিয়ে আসছিল তারই হাত উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর চারপাশে-মনে হচ্ছিল-ছিন্ন হাতগুলো যেন উড়ছে। একপর্যায়ে হযরত আয়েশা রাযি.-কে ঘিরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ করে হযরত আলী রাযি. নিজে এগিয়ে এলেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে। আশতার নাখঈ (প্রকৃত নাম মালিক) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি.-এর কাছে চলে এলেন। দুজনই প্রসিদ্ধ বীর। যুদ্ধ যেন নতুন মোড় নিল। আঘাত পাল্টা আঘাতে দুজনই ক্ষতবিক্ষত হলেন। একপর্যায়ে তারা দৌড়ে গিয়ে একে অপরকে জাপটে ধরলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. চিৎকার করে বলতে লাগলেন,
اقْتُلُوْنِي وَ مَالِكًا * اقْتُلُوْا مَالِكًا مَّعِيْ
অর্থ: আমাকে এবং মালিককে মেরে ফেল। আমার সঙ্গে মালিককে মেরে ফেল।
আশতার বলেন, লোকে আমাকে মালিক নামে চিনত না। তা না হলে, আমার খবর হয়ে যেত। বনু দাব্বার কিছু লোক অন্য পক্ষেও ছিলেন। তারা চিন্তা করলেন, যদি উম্মুল মুমিনীনের উট দাব্বিদের দৃষ্টির আড়াল না হয়, তা হলে আমাদের গোত্রের একটা লোকও বাঁচবে না। যতক্ষণ একজনেরও জীবন থাকবে এবং উট দণ্ডায়মান থাকবে ততক্ষণ তারা থামবে না। তাই জনৈক দাব্বি পেছন থেকে উটের পায়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন। উট পড়ে গেল। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি. দৌড়ে গিয়ে হাওদা সামলে নিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর ভেতরে হাত দিয়ে দেখতে চাইলেন যে কোনো জখম হয়েছে কি না। হযরত আয়েশা রাযি. বলে উঠলেন, এ কোন অভিশপ্তের হাত? তিনি তৎক্ষণাত বললেন, আপনার অনুজ মুহাম্মাদের। ভগ্নি, আপনার কোনো জখম হয়নি তো? হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, তুমি মুহাম্মাদ (নন্দিত) নও; তুমি মুযাম্মাম (নিন্দিত)। হযরত আলী রাযি.-ও পৌঁছে গেলেন। তিনি হালপুরসি করলেন। উম্মুল মুমিনীন রাযি. উত্তর দিলেন, ভালো আছি।