📄 রণভূমির করুণ দৃশ্য
হযরত আলী রাযি. মদীনা মুনাওওয়ারা থেকে সাতশো জনকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করেছিলেন। কুফা থেকে সাত হাজার মানুষ তাঁর সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। এভাবে বসরা পৌঁছতে পৌঁছতে বিশ হাজার সৈন্য তাঁর দলে যোগ দেয়। এদিকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে ত্রিশ হাজার মানুষ ছিল। উভয় বাহিনী যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে রণভূমিতে তাঁবু ফেলে। মুযারিরা মুযারিদের বিপরীতে, আযদিরা আযদিদের বিপরীতে, এমিনিরা এমিনিদের বিপরীতে; মোটকথা, প্রত্যেক যোদ্ধা নিজ নিজ গোত্রের যোদ্ধাদের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়। এরচেয়েও কষ্টদায়ক দৃশ্য এই ছিল যে, হৃদয় দুঃখে-কষ্টে ভারাক্রান্ত; কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে একই মায়ের দুই সন্তান রণভূমিতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। দুজনই সত্যের অনুসারী; কিন্তু দুজনের সত্য দুই মেরুতে। সত্যবোধের সামনে ভ্রাতৃত্ববোধ পরাজিত।
উভয় বাহিনী মুখোমুখি। বুকের ভেতর যেন হু হু করে উঠছে। কালই যে মানুষগুলো একযোগে তলোয়ার চালিয়েছিল শত্রুদের বিরুদ্ধে, আজ তারাই একে অপরকে ক্ষত-বিক্ষত করতে চায়। হযরত যুবায়ের রাযি. এ দৃশ্য দেখে বললেন, আহ, মুসলমানরা যখন শক্তি-সামর্থ্যে পর্বতপ্রমাণ, তখন নিজেরাই নিজেদের টুকরো টুকরো করতে উদ্যত! নিজ নিজ জায়গায় সত্যোপলব্ধিতে একেকজন এতই অটল যে, কোনো কিছুই তাদেরকে চুল পরিমাণও নড়াতে বা সরাতে সক্ষম নয়। কুফার কতিপয় গোত্রের নেতৃবর্গ বসরায় বসবাসকারী নিজ নিজ গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন এবং যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করলেন। কিন্তু প্রত্যেকেরই একই উত্তর: আমরা কিছুতেই উম্মুল মুমিনীনকে নিঃসঙ্গ ছাড়তে পারি না।
📄 সন্ধিস্থাপন
তারপরও উভয় পক্ষের লোকদের প্রবল বিশ্বাস ছিল যে, বিষয়টি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে না; বরং আগেই সমঝোতা হয়ে যাবে। জনৈক গোত্রপতি ভাবলেন, তিনি হযরত আলী রাযি.-কে সন্ধি করার জন্য পীড়াপীড়ি করবেন। কিন্তু দেখা গেল, হযরত আলী রাযি. আগে থেকেই মনেপ্রাণে সমঝোতা চাইছেন। তখন তিনি হযরত আলী রাযি.-এর অনুমতি নিয়ে হযরত তালহা রাযি., হযরত যুবায়ের রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.- এর কাছে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আমাদের মাতা, এত কিছু কেন করছেন? তিনি বললেন, উসমান রাযি.-এর ঘাতকদের শাস্তিপ্রদান এবং সমাজের সংশোধনের জন্য। তিনি বললেন, হে আমাদের মাতা, দয়া করে একটু ভাবুন; পাঁচশো অপরাধীকে সাজা দিতে গিয়ে পাঁচ হাজারের প্রাণ গেছে। আর এই পাঁচ হাজারের জন্য আরও কত হাজারের প্রাণ যাবে। এ কেমন সংস্কার, মাতা? এ কেমন সংশোধন? কথার ভাব এত গভীর ও সংবেদনশীল ছিল যে, তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। সকলে সম্মতি ব্যক্ত করলেন। সকলে মিলে সন্ধি করে নিলেন।
টিকাঃ
১. তারীখে তাবারী: ৬ষ্ঠ খণ্ড।
📄 বনু উমাইয়া ও সাবাঈ গোষ্ঠীর রেশ হামলা
উভয় পক্ষের সাধারণ যোদ্ধাগণ নিশ্চিন্ত। যুদ্ধের চিন্তা-এক কথায় সকলের মন থেকে মুছে গেল। সন্ধিচুক্তি পাকাপোক্তকরণ ও অন্যান্য মামলার নিষ্পত্তিকরণে কারও কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু উসমান রাযি.-এর ঘাতক সাবাঈগোষ্ঠী ও অপরপক্ষে বনু উমাইয়ার যে বিষাক্ত বীজটুকু তখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, তারা ভাবল, যদি সত্যিই সন্ধি হয়ে যায় তা হলে আমাদের রক্ষা নেই; আমাদের এত দিনের শ্রম একদম বিফলে যাবে। সাবাঈ গোষ্ঠীর সদস্যরা হযরত আলী রাযি.-এর দলে ছিল। সকলে যখন রাতের শেষ প্রহরে গভীর ঘুমে নিমগ্ন, সাবাঈরা তখন এলোপাতাড়িভাবে সৈন্যদের ওপর তলোয়ার হাকানো শুরু করল। অন্যদিকে বনু উমাইয়ার ছোকরারা এখানে-ওখানে আগুন ধরিয়ে দিল।
টিকাঃ
১. তারীখে তাবারী: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৮২-৩১৮৩।
📄 আকস্মিক যুদ্ধের সূচনা
হযরত আলী রাযি. ছুটে এসে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে লাগলেন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেল। যোদ্ধারা হতবুদ্ধি হয়ে যার যার অস্ত্রের দিকে ছুটে গেলেন। উভয় পক্ষের নেতৃস্থানীয়গণ ভাবলেন, অপরপক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
রাতের অন্ধকার কাটতে কাটতে পরিস্থিতি চরম হয়ে গেল। চিৎকার চেঁচামেচিতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ধ্যানমগ্নতা কেটে গেল। তিনি জানতে চাইলেন, কী হচ্ছে? উত্তর এল: মাতা, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।