📄 বিরোধীপক্ষের আক্রমণ এবং তাঁর ধৈর্যধারণ
পরের দিন উভয় পক্ষের লোকজন দলবেঁধে সারিবদ্ধভাবে বাইরে এল। বিরোধী পক্ষের নেতা ছিলেন হাকিম নামক জনৈক যোদ্ধা। তিনি বরাবরই সংঘাত বাধানোর চেষ্টা করছিলেন। শান্তিবাহিনীর লোকেরা নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বরাবরের মতো উভয় পক্ষকে শান্তি ও সমঝোতার এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু হাকিম নাছোড়বান্দা; কিছু একটা করেই ছাড়বে; একপর্যায়ে অধৈর্য হয়ে আক্রমণের নির্দেশ দিল নিজ দলের লোকদেরকে। শান্তিবাহিনী তবুও হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে। এ অবস্থা দেখে, হাকিম নিজ বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলল— সাথীরা, কাপুরুষ কুরাইশদের দ্যাখো, ওদের ভীরুতাই আজ ওদের মৃত্যুর কারণ হবে। লোকজন রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো। উভয় দিক থেকে ইট-পাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। একপর্যায়ে রক্তপাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটে গেল। হযরত আয়েশা রাযি. এবারও সংঘাত এড়ানোর জন্য নিজ বাহিনীকে পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। শান্তিবাহিনী পিছু হটল। তারা ওই স্থান ত্যাগ করে অন্য এক জায়গায় আশ্রয় নিলেন। হাকিমের বাহিনী সেখানেও চড়াও হওয়ার জন্য ধেয়ে এল। কিন্তু রাত ঘনিয়ে আসায় ফিরে যেতে বাধ্য হলো তারা।
📄 আবুল জারবাহর মধ্যস্থতা
ঝামেলা এখানেই মিটে যাক, এমনটাই চাচ্ছিলেন অধিকাংশ মানুষ। আবুল জারবা তাইমি নামক জনৈক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-সহ অন্যান্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন। সকলে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন এবং তাঁবু ফেললেন।
📄 হাকিমের ধৃষ্টতা
সকাল হলে গভর্নরের বাহিনী আবারও সামনে এল। হাকিম পথ মাড়াচ্ছিল আর হযরত আয়েশা রাযি.-এর সম্পর্কে অশালীন কথা বলছিল। কায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, কার সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করছেন আপনি? হাকিম যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। অত্যন্ত ধৃষ্টতার সঙ্গে বলল, আয়েশা [রাযি.] সম্পর্কে। লোকটি হতভম্ব হয়ে বললেন, আরে শয়তান, উম্মুল মুমিনীনের শানে তোর মুখ থেকে এমন কথা বের হচ্ছে? হাকিম বর্শা মেরে লোকটিকে থামিয়ে দিল। কিছু দূর গিয়ে এক মহিলার সঙ্গেও একই আচরণ করল। আবদুল কায়সের গোত্র হাকিমের এহেন আচরণে তার পক্ষ ত্যাগ করল।
📄 বসরা-বিজয়
হাকিমের প্ররোচনায় বিরোধী গোষ্ঠী পুরো দমে প্রস্তুত, যে কোনো মুহূর্তে হামলা করবে; এবং করলও। হযরত আয়েশা রাযি.-এর পক্ষ থেকে জনৈক ঘোষক একের পর এক শপথ বাক্য উচ্চারণ করে করে আক্রমণ বন্ধ করার অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু তারা কোনোক্রমেই আক্রমণ বন্ধ করল না। অবশেষে শান্তিবাহিনীও আত্মরক্ষা করতে লাগলে ঘটনাটি যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। বিরোধীদের লাশের স্তূপ পড়ে যায়। তারা হতভম্ব হয়ে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু করে এবং চিৎকার করে 'আমান আমান' আওয়াজ তোলে। অবশেষে উভয় পক্ষ এই শর্তে সন্ধি করে যে, বসরা থেকে একজন প্রতিনিধি মদীনায় যাবে এবং জনসম্মুখে জানতে চাইবে-হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি. কি স্বেচ্ছায় হযরত আলী রাযি.-এর খেলাফত মেনে নিয়েছেন, নাকি তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে? স্বেচ্ছায় হলে বিরোধীদের বসরা ছেড়ে দেওয়া হবে, অন্যথায় বিরোধীরাই বসরা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য থাকবে।
প্রতিনিধি যেদিন মদীনায় পৌঁছে, ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল শুক্রবার। সকল সাহাবা কেরাম এবং অপরাপর মুসলমানগণ মসজিদে নববীতে উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করেন-হে মদীনাবাসী, আমি বসরা থেকে মদীনায় প্রতিনিধি হয়ে এসেছি। মহিমান্বিত ব্যক্তিদ্বয় (হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.) কি খুশিমনে বাইয়াত গ্রহণ করেছেন, নাকি জোরপূর্বক তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে? আগন্তুকের প্রশ্নে মজলিসে অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলছিলেন না। হঠাৎ একটি আওয়াজ নীরবতার আস্তরণ ভেঙে দিল। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পালকপৌত্র, হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রাযি.-এর আওয়াজ ছিল।
তিনি বলে উঠলেন, তাঁরা স্বেচ্ছায় বাইয়াত গ্রহণ করেননি; বরং জোরপূর্বক করানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সাহল বিন হানীফ আনসারি (হযরত আলী রাযি.-এর ধর্মভাই) লাফ দিয়ে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেললেন। এ অবস্থা দেখে হযরত সুহাইব রাযি., হযরত আবু আইয়ুব রাযি., হযরত মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযি.-সহ অন্যান্য সাহাবা কেরام বলতে লাগলেন— হাঁ, হাঁ, উসামা সত্য বলেছে। এরপর হযরত সুহাইব রাযি. হযরত উসামা রাযি.-কে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরে পৌঁছে দিলেন এবং বললেন—বাবা, আমরা সবাই যেমন চুপচাপ ছিলাম, তুমিও তেমন চুপচাপ থাকতে।
রাস্তায় হযরত আলী রাযি.-কে সন্ধির শর্ত জানানো হলে তিনি বসরার গভর্নরের নামে একটি পত্র লিখলেন:
'যদি তাঁদেরকে জোরপূর্বক বাইয়াত গ্রহণ করানো হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু এজন্য যে মুসলমানদের মধ্যে যেন বিভেদ ও দলাদলির সৃষ্টি না হয়।'
প্রতিনিধি বসরায় ফিরে এসে মদীনার অবস্থা ব্যক্ত করল। বিরোধীরা বিপরীতে হযরত আলী রাযি.-এর পত্র উপস্থাপন করল। তখনো আলোচনা চলছেই। এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। সন্ধির সময়কালে উভয় পক্ষ একই জায়গায়, একই মসজিদে, একই ইমামের পেছনে নামায পড়ার কথা। কিন্তু ভুলবশত একবার এই পক্ষ তাদের একজনকে ইমাম বানিয়ে আগে বাড়িয়ে দেয় এবং নামায শুরু করে।
অনারব-মনা বেশ কিছু লোক ক্ষিপ্ত হয়ে তলোয়ার বের করে হামলা করে। তারাও প্রতিউত্তরে তলোয়ার চালায়। এই ঘটনায় বসরার গভর্নর সংশোধনকামী বাহিনীর হাতে বন্দী হন। হযরত আয়েশা রাযি. জানতে পেরে গভর্নরকে মুক্ত করে দেন এবং ঘোষণা করেন—হযরত উসমান রাযি.-এর হত্যায় জড়িতদের ছাড়া আর কাউকে কিছু করা হবে না।
ঘোষণা শুনে সাধারণ জনগণ অস্ত্র ত্যাগ করেন। কিন্তু হাকিম কোনো কিছুই গায়ে মাখল না। সে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জেদ ধরল। এক শয়তান রাতের অন্ধকারে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে ঢুকে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল। সে বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছেও গিয়েছিল; কিন্তু হাতেনাতে ধরা পড়ায় তার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যায়। যাই হোক, শেষমেশ শান্তিকামী কাফেলারই বিজয় হলো। বসরা তাদের দখলে এসে যায়। শহরের অধিকাংশ মানুষই আনুগত্য স্বীকার করে। বসরার ধনভাণ্ডার হতে যোদ্ধাদের ওজিফা প্রদান করা হয়।
টিকাঃ
১. তাহযিব ও ইসাবাহ, ইবনে সা’দের উদ্ধৃতি অনুযায়ী।