📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্য

📄 হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্য


অবস্থা লক্ষ করে হযরত আয়েশা রাযি. অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও উচ্চ আওয়াজে কথা বলতে লাগলেন। হামদ ও সানার পর তাঁর বক্তব্যের শব্দগুলো ছিল নিম্নরূপ:
'লোকেরা উসমান রাযি.-এর ওপর আপত্তি করত। তাঁর আমলে বিভিন্ন পদধারী উচ্ছৃঙ্খল যুবকের দোষ-ত্রুটির কথা বলত। মদীনায় এসে আমাদের কাছে অভিযোগ-অনুযোগ করত, পরামর্শ চাইত। আমরা তাদেরকে সান্ত্বনা ও উপদেশ দিতাম এবং বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতাম এবং তারা বুঝত। উসমান রাযি.-এর ওপর যে আপত্তিগুলো উত্থাপিত হয়েছিল, আমরা সেগুলো নিয়ে অনেক ভেবেছি। আসলে তিনি নির্দোষ, খোদাভীরু ও সরল পথের পথিক ছিলেন। পক্ষান্তরে যারা যেখানে-সেখানে হট্টগোল করত, আমাদের দৃষ্টিতে তাদেরকেই পাপী, প্রতারক ও পথভ্রষ্ট মনে হয়েছে। তাদের মনে ছিল এক, মুখে ছিল আরেক। ছলনার আশ্রয়ে যখন তাদের দল ভারী হয়ে গেল, তখন বিনা কারণে নিরপরাধ উসমান রাযি.-এর গৃহে ঢুকে পড়ল। যেই রক্ত তাদের জন্য বৈধ ছিল না, সেই রক্তই বইয়ে দিল। যেই সম্পদে তাদের কোনো অধিকার ছিল না, সেই সম্পদই আত্মসাৎ শুরু করল। যেই পবিত্র ভূমির সম্মান করা তাদের কর্তব্য ছিল, তারও অসম্মান করে ছাড়ল। ... হাঁ, এখন আমাদের যা করতে হবে, এবং যার বিরোধিতা করা মোটেই ঠিক হবে না, তা হলো—হযরত উসমান রাযি.-এর হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা এবং তাদের ওপর আল্লাহর বিধান কার্যকর করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيباً مِّنَ الْكِتَابِ يَدْعُوْنَ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ يَتَوَلَّى فَرِيقٌ مِنْهُمْ وَهُمْ مُّعْرِضُونَ
অর্থ: আপনি কি তাদের দেখেননি, যাদেরকে আল্লাহর কিতাবের একটি অংশ দেওয়া হয়েছে? তাদের আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করা হতো, যেন তারা সে অনুযায়ী তাদের মাঝে বিচারাচার করে; অথচ তারপর তাদের একটি দল উপেক্ষা-প্রদর্শনপূর্বক আল্লাহর কিতাব থেকে সরে গেল। (সূরা আ-লি ইমরান, আয়াত: ২৩)'
কিছু কিছু গ্রন্থে’ বিরাজমান পরিস্থিতিতে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে আরও একটি বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে, যা বাগ্মিতা ও অলঙ্কারশিল্পে পূর্বোক্ত বক্তৃতা থেকে আরও উন্নত। বক্তৃতাটি এই:
'লোকসকল, থামুন, শান্ত হোন!' হযরত উম্মুল মুমিনীনের মুখে উচ্চারিত শব্দগুলো এতটাই গাম্ভীর্যপূর্ণ ও ঐশী বলে বলীয়ান ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে পুরো ময়দানে স্তব্ধতা ছেয়ে গেল, চোখের পলকে বিশাল জনসমুদ্র নীরব-নির্বাক-নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হযরত আয়েশা রাযি. বক্তব্যের শাণিত ধারাকে গতিময় করলেন এভাবে:
'আপনাদের ওপর আমার মাতৃত্বের অধিকার রয়েছে। আপনাদের উপদেশ দেওয়ার সম্মানও আমি প্রাপ্ত হয়েছি। যে তার প্রতিপালকের প্রকৃত অনুগত বান্দা নয় সে ছাড়া, কেউই আমাকে দোষারোপ করতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে মাথা রেখেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তাঁর প্রিয় পত্নীগণের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাকে অন্য যে কোনো মানব- সংস্পর্শ থেকে সুরক্ষিত রেখেছেন।’ আমার সম্মানেই মুমিন আর মুনাফিকের ভেদ উন্মোচিত হয়েছে। আমার কারণেই আল্লাহ আপনাদের তায়াম্মুমের বিধান দান করেছেন। আমার সম্মানিত পিতাই ছিলেন পৃথিবীর বুকে তৃতীয় মুসলমান। তিনিই মহিমান্বিত হেরা গুহার ঈর্ষণীয় দুজনের দ্বিতীয় জন। পৃথিবীতে তিনিই প্রথম সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থেকে, তাঁকে খেলাফতের তাজ প্রদান করে। যখনই ইসলাম ধর্মের ওপর কোনো আঘাত এসেছে, তখনই আমার পিতা শক্ত হাতে তা প্রতিহত করেছেন। মুনাফিকদের ফেতনার মোকাবেলা করেছেন। ধর্মদ্রোহীদের উচ্ছেদ করেছেন। ইহুদিদের চক্রান্তকে নস্যাৎ করেছেন। আপনারা তাঁর সময়ে অভ্যন্তরীণ যে কোনো গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা থেকে নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছেন। নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে কোনো বাদানুবাদ, কোনো ঝগড়া-বিবাদ আপনাদের কর্ণগোচর হয়নি। তিনি কণ্টকাকীর্ণকে করেছেন কুসুমাস্তীর্ণ, অচলাবস্থাকে করেছেন সচল, প্রহরাকে করেছেন নিশ্ছিদ্র। তিনি অন্তরের ব্যাধিগুলোর নিরাময় করেছেন। যে তৃপ্ত, তাকে পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে। যে পিপাসার্ত, তাকে নিয়ে এসেছেন ঘাটে। যে একবার পান করেছে, তাকে আরেকবার পান করিয়েছেন। এভাবে, যখন সকল ফেতনার মূলোৎপাটন হলো এবং মুসলমানরা পেলেন খেলাফতে রাশেদার স্বাদ, তখন আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নিলেন আপন রহমতের কোলে। বিদায়লগ্নে তিনি এমন এক মহান ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করে গেলেন, প্রজাদের সুরক্ষায় যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ, ভ্রান্তি থেকে দূরে-মদীনার দুই পাহাড়ের চেয়েও দূরে। যিনি ইসলামের দুশমনদের প্রতি ছিলেন কঠোর। সরলমনা মানুষের প্রতি ছিলেন উদার। মুসলমানদের কল্যাণে জেগেছেন রাতের পর রাত। চলেছেন অগ্রবর্তীদেরই পথে। ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের প্রতিটি বীজ। অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছেন পবিত্র কুরআনের প্রতিটি বাণী। ... হাঁ, আজ আমি আমার সন্তানদের প্রশ্নবাণের লক্ষ্যবস্তু—কেন এভাবে সৈন্যসামন্ত নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছি? কী আমার উদ্দেশ্য? আমার উদ্দেশ্য বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগকে উসকে দেওয়া নয়; আমার উদ্দেশ্য বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের মূলোৎপাটন করা। আমি যা বলছি, সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে বলছি। আমি যা করছি, সজাগ ও সচেতনভাবে করছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর রাসূলের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন এবং রাসূলের স্থলবর্তীদের সাহচর্য ও স্থলবর্তিতার সম্মান আপনাদের নসীব করেন।

টিকাঃ
১. বক্তৃতাটি ইবনে আবদি রাব্বিহ আল-ইকদুল ফরিদ গ্রন্থের অধ্যায়ে এবং জঙ্গে জামাল অংশে পুরোপুরি উদ্ধৃত করেছেন। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. ইযালাতুল খাফা গ্রন্থে জঙ্গে জামালের আলোচনায় এর একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আহমদ ইবনে আবি তাহের (মৃত্যু: ২০৪ হি.) বালাগাতুন নিসা গ্রন্থে বক্তৃতাটি তুলে ধরেছেন।
১. তিনিই একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুমারী স্ত্রী ছিলেন।
২. ইফকের (অপবাদ আরোপের) ঘটনার ইঙ্গিত।
৩. এর কাছাকাছি অর্থের আরও একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা মুজামুত তাবারানি গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনে হাসানের সূত্রে বর্ণিত আছে; পৃষ্ঠা: ২১৮ (মাতবুআয়ে আনসারি, দিল্লি)।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 পক্ষাবলম্বন : দলাদলি ও বাদানুবাদ

📄 পক্ষাবলম্বন : দলাদলি ও বাদানুবাদ


হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্যের প্রভাবে বিশাল উপস্থিতি যেন মন্ত্রমুগ্ধ ও সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল। এক-একটা কথা যেন তির হয়ে বিদ্ধ করেছিল শত্রুদের হৃদয়। অবচেতন মনে তাদের মুখ থেকেও বেরিয়ে পড়ল—মাতা ঠিক বলেছেন, মাতা সত্য বলেছেন। মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষ নিজ নিজ সারি ভেঙে দাঁড়িয়ে যেতে লাগল মহীয়সী মাতার সংশোধনকামী কাফেলায়। তখনো যাদের ভিন্ন মত ছিল, তারা কিছু বললে, সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা কড়া ভাষায় উত্তর দিতে একটুও বিলম্ব করছিল না।
একপর্যায়ে দুই দলের লোকজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেল। একটু একটু করে অবস্থা অন্য দিকে গড়াতে লাগল। হযরত আয়েশা রাযি. সংঘর্ষ এড়াতে সংশোধনকামী কাফেলাকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দিলেন। গভর্নরের লোকদের মধ্যে যারা হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্য শুনে মত পাল্টিয়েছিলেন, তারাও নিজ দল ছেড়ে সংশোধনকামী কাফেলার সঙ্গে চলে এলেন।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বিরোধীপক্ষের আক্রমণ এবং তাঁর ধৈর্যধারণ

📄 বিরোধীপক্ষের আক্রমণ এবং তাঁর ধৈর্যধারণ


পরের দিন উভয় পক্ষের লোকজন দলবেঁধে সারিবদ্ধভাবে বাইরে এল। বিরোধী পক্ষের নেতা ছিলেন হাকিম নামক জনৈক যোদ্ধা। তিনি বরাবরই সংঘাত বাধানোর চেষ্টা করছিলেন। শান্তিবাহিনীর লোকেরা নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বরাবরের মতো উভয় পক্ষকে শান্তি ও সমঝোতার এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু হাকিম নাছোড়বান্দা; কিছু একটা করেই ছাড়বে; একপর্যায়ে অধৈর্য হয়ে আক্রমণের নির্দেশ দিল নিজ দলের লোকদেরকে। শান্তিবাহিনী তবুও হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে। এ অবস্থা দেখে, হাকিম নিজ বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলল— সাথীরা, কাপুরুষ কুরাইশদের দ্যাখো, ওদের ভীরুতাই আজ ওদের মৃত্যুর কারণ হবে। লোকজন রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো। উভয় দিক থেকে ইট-পাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। একপর্যায়ে রক্তপাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটে গেল। হযরত আয়েশা রাযি. এবারও সংঘাত এড়ানোর জন্য নিজ বাহিনীকে পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। শান্তিবাহিনী পিছু হটল। তারা ওই স্থান ত্যাগ করে অন্য এক জায়গায় আশ্রয় নিলেন। হাকিমের বাহিনী সেখানেও চড়াও হওয়ার জন্য ধেয়ে এল। কিন্তু রাত ঘনিয়ে আসায় ফিরে যেতে বাধ্য হলো তারা।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আবুল জারবাহর মধ্যস্থতা

📄 আবুল জারবাহর মধ্যস্থতা


ঝামেলা এখানেই মিটে যাক, এমনটাই চাচ্ছিলেন অধিকাংশ মানুষ। আবুল জারবা তাইমি নামক জনৈক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রাযি.-সহ অন্যান্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন। সকলে তার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন এবং তাঁবু ফেললেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00