📄 হাওয়াবের পুকুরিনী এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী
পথ চলতে চলতে হাওয়াবের পুষ্করিণী সামনে এল। একদল কুকুর কাফেলার ভিড় দেখে ঘেউঘেউ শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনে পড়ে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে উচ্চারিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী—একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আল্লাহই জানেন, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে।
ভবিষ্যদ্বাণী মনে পড়ামাত্রই হযরত আয়েশা রাযি. পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেন। একাধারে কয়েকদিন কাফেলা এখানেই স্থির থাকল। অবশেষে প্রায় পঞ্চাশ জন সাক্ষ্য দিল, এটা হাওয়াব নয়। তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হযরত আয়েশা রাযি. নিশ্চিন্ত হলেন।
অন্যদিকে হযরত আলী রাযি. উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীর আগমনের কথা শুনে বসরার উদ্দেশে মদীনা থেকে যাত্রা করে ফেলেছেন। এদিকেও লোকমুখে রটে গেল, সামনে চলো, ওদিক থেকে হযরত আলী রাযি.-এর বাহিনী আসছে। দুদিক থেকে দুই বাহিনী যেন তিরগতিতে ধেয়ে চলেছে—এই হলো তাবারী ও অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থের বিবরণ। মুসনাদে আহমাদে ঘটনাটি স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতেই বিবৃত:
قَالَتْ لَمَّا أَتَتْ عَلَى الْحَوْابِ سَمِعْتُ نُبَاحَ الْكِلَابِ فَقَالَتْ مَا أَظُنُّنِي إِلَّا رَاجِعَةٌ . إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَنَا أَيْتُكُنَّ تَنْبَحُ عَلَيْهَا كِلَابُ الْحَوْابِ فَقَالَ لَهَا الزُّبَيْرُ تَرْجِعِينَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يُصْلِحَ بِكِ بَيْنَ النَّاسِ.
অর্থ : যখন কাফেলা হাওয়াবের নিকট পৌঁছল, তখন আমি কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এখন তো আমার মনে হচ্ছে, আমার ফিরে যাওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছিলেন, জানি না, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে। তখন হযরত যুবায়ের রাযি. বললেন, আপনি ফিরে যেতে চাচ্ছেন? হতে পারে, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
অন্য একটি বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে আছে:
فَقَالَ بَعْضُ مَنْ كَانَ مَعَهَا بَلْ تَقَدَّمِيْنَ فَيَرَاكِ الْمُسْلِمُوْنَ فَيُصْلِحُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ذَاتَ بَيْنِهِمْ
অর্থ: তখন কিছু লোক বললেন, বরং আপনি সামনে এগিয়ে চলুন, কেননা যদি মুসলিমগণ আপনাকে দেখেন, তা হলে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
এরকম একাধিক বর্ণনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শান্তিকামী কাফেলার সংশোধন আর শান্তিস্থাপন ছাড়া আর কোনোই উদ্দেশ্য ছিল না।
📄 কুফাবাসীর অবস্থা
মক্কা মুআয্যমা, মদীনা মুনাওওয়ারা ও বসরার পর আরবের সবচেয়ে বড় নগরী ছিল কুফা। এখানকার আমীর ছিলেন হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিগণ যখন নিজ নিজ দলের পক্ষসমর্থনে যুক্তিতর্ক আর প্রমাণপঞ্জির মহড়া দিতে শুরু করেছেন, তখন হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি. এটাকে একটা বড় ফেতনা মনে করে বিবৃতি ও বক্তব্যের মাধ্যমে জনসাধারণকে সব ছেড়ে নির্জনবাস ও একাকিত্ব বরণের পরামর্শ দিয়ে চলে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. কুফার নেতৃবর্গের নামে পত্র প্রেরণ করতে লাগলেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং ইমাম হাসান রাযি. হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষ নিলেন। তাঁরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর আহ্বানে সাড়া দেওয়া থেকে পিছিয়ে গেলেন। উপরন্তু হযরত আম্মার রাযি. একদিন কুফার জামে মসজিদে বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি বক্তব্যের শুরুতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব তুলে ধরলেন, এরপর বললেন, সবই ঠিক আছে; কিন্তু আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন—তোমরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পার কি না। তার বক্তব্য খুবই ক্রিয়াশীল প্রমাণিত হলো। কয়েক হাজার মানুষ তার সঙ্গে সুর মেলালেন। কিন্তু জনমনে সংশয় থেকেই গেল—একদিকে উম্মুল মুমিনীন, অন্যদিকে রাসূলের পিতৃব্যপুত্র ও জামাতা। ঠিক কী করা উচিত, কেউই যেন ঠাহর করতে পারছিলেন না।
হযরত আয়েশা রাযি. বসরার সন্নিকটে পৌঁছে কয়েকজনকে তথ্য সংগ্রহের জন্য বসরায় পাঠিয়ে দিলেন। শহরের আরব সরদারদের নামে পত্রও পাঠালেন। শহরে পৌঁছে স্বয়ং কয়েকজন নেতার বাড়িতে গেলেন। জনৈক গোত্রপতি অসম্মত ছিল জেনে তিনি নিজেই তার কাছে গেলেন এবং বোঝালেন। লোকটি বললেন, এটা খুবই লজ্জার হবে যে, আমি স্বয়ং মাতার কথাও রাখব না।
📄 বসরায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তৃতা
হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষ থেকে বসরার গভর্নর ছিলেন উসমান ইবনে হানীফ। তিনি ইমরান এবং আবুল আসওয়াদকে বাস্তবতা যাচাইয়ের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। তারা হযরত আয়েশা রাযি.-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং গভর্নরের পক্ষ থেকে তাঁর বসরা আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাদের জিজ্ঞাসার জবাবে নিম্নোক্ত বক্তব্যটি উপস্থাপন করলেন:
'আল্লাহর কসম, না আমার মতো মানুষ কখনো কোনো দুরভিসন্ধি নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারে, না কোনো মা তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে প্রকৃত অবস্থা গোপন রাখতে পারে। ঘটনা এই যে, কিছু কিছু গোত্রের একটি দুষ্টচক্র মহিমান্বিত মদীনাপ্রাঙ্গনে হামলা চালিয়েছে; সেখানে অশান্তির আগুন জ্বালিয়েছে, তাদের সমর্থকরাই শুধু সেখানে নিরাপদে আশ্রিত, এজন্য এরা আল্লাহর অভিশাপের যোগ্য; শুধু তাই নয়, তারা নিরপরাধ খলীফাতুল মুসলিমীনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, অন্যায়ভাবে পবিত্র রক্ত প্রবাহিত করেছে; যে সম্পদে হস্তক্ষেপের কোনো অধিকারই তাদের ছিল না, সে সম্পদও কুক্ষিগত করেছে; মহিমান্বিত নববীপ্রাঙ্গনের অপমান করেছে, পবিত্র হারাম মাসের অসম্মান করেছে;’ সম্মানিত ব্যক্তিবৃন্দকে লাঞ্ছিত, অপদস্থ করেছে; নিরপরাধ মুলমানদের বেধড়ক মেরেছে, মুসলমানদের বাড়িঘরে জোরপূর্বক ঢুকে পড়েছে; অথচ মুসলিমগণ তাদেরকে জায়গা দিতে চায়নি। এরা ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এদের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। সহজ-সরল মুসলমানরা না এদের থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে পারে, না এদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদে থাকতে পারে। আমি মুসলমানগণকে অসহায় অবস্থায় রেখে এসেছি। মুসলিমসমাজের কত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে! ক্ষণে ক্ষণে কত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে! অথচ মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِّنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ: তাদের অনেক আলাপ-আলোচনায়ই কোনো উপকার নেই। উপকার আছে শুধু তার কথায় যে আদেশ ও উপদেশ দেয় কল্যাণের, ন্যায়সঙ্গত কর্মের অথবা মানুষের মাঝে সংশোধনের। (সূরা নিসা, আয়াত: ১১৪)
শোনো, আমরা এই সংশোধনের আহ্বানই নিয়ে এসেছি। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সকলকে এই আদেশই দিয়েছেন। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এটাই। আমরা তোমাদেরকে পূণ্য অর্জনের এবং পাপ বর্জনের আহ্বান করছি।'
ইমরান এবং আবুল আসওয়াদ হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছ থেকে উঠে হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.-এর কাছে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর পুনরায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. তাদের একজনকে সম্বোধন করে বললেন, আবুল আসওয়াদ, দেখো, তোমার প্রবৃত্তি যেন তোমাকে দোজখের দিকে টেনে না নেয়। এরপর তিনি এই আয়াতে কারীমা তেলাওয়াত করলেন:
كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর কাজের জন্য প্রস্তুত থাকো, ন্যায় ও সত্যের সাক্ষী হও। (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৮)
টিকাঃ
১. হযরত উসমান রাযি. জিলহজ মাসে শহীদ হয়েছিলেন।
📄 বসরা-গভর্নরের অপরিণামদর্শিতা
ফল এই হলো যে, প্রতিনিধিদ্বয়ের একজন—ইমরান যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালেন এবং বসরার গভর্নরকেও যুদ্ধ পরিহারের পরামর্শ দিলেন। কিন্তু গভর্নর তার পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন। উল্টো আগে থেকেই একজন বাগ্মী বক্তা ঠিক করে রাখলেন শুক্রবার জুমার নামাযের পূর্বে যখন লোকজন সমবেত হবে, তখন উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার জন্য। ওই বক্তার বক্তব্য ছিল এরূপ:
'হাজিরিন, আমার নাম কায়স। এই মানুষগুলো, যাঁরা ইতোমধ্যে শহরের বাইরে এসে তাঁবু গেড়েছেন এবং আপনাদের কাছে সাহায্যের আবেদন করছেন, যদি জালেমদের হাত থেকে পালিয়ে এসে থাকেন এবং আপনাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে থাকেন, তা হলে তাদের এ কথা মোটেও ঠিক নয়। কেননা তারা এসেছেন মক্কা থেকে, যেখানে মানুষ মারা তো দূরের কথা, পাখি শিকার করাও নিষিদ্ধ। আর যদি তারা এটা মনে করে এখানে এসে থাকেন যে, আমাদের থেকে উসমান-হত্যার প্রতিশোধ নেবেন, তা হলে তো আমরা উসমানের হত্যাকারী নই। আমার কথা শুনুন, তারা যেখান থেকে এসেছেন, সেখানেই তাদেরকে ফিরে যেতে বলুন।'
শাস্ত্রজ্ঞ বক্তার বিভ্রান্তিকর তর্কজালে ফল যা হওয়ার হলো। এরই মধ্যে আগন্তুকদের মধ্য থেকে আরেকজন বলে উঠল:
'এই লোকগুলো কি বলছে যে, আমরা উসমান রাযি.-এর হত্যাকারী? বলছে না তো? এই লোকগুলো এজন্য আমাদের কাছে এসেছে যে, উসমান রাযি.-এর হত্যাকারীদেরকে শাস্তিপ্রদানে এরা আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করবে; যদি একথা সত্য হয়, যেমনটা তুমি বলছ, যে, তারা নিজ ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে এসেছে, তা হলে, তাদেরকে রক্ষা করবে কীসে? শহর, না শহরের মাঠ-ঘাট?'
আগন্তুকের শ্লেষাত্মক মন্তব্য বক্তৃতা ও বাগ্মিতার রীতি অনুসারে আগেরটার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।