📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বসরা অভিমুখে

📄 বসরা অভিমুখে


যাই হোক, এটা ছিল হজের বছর। উম্মুল মুমিনীনের আহ্বানে শুধু হেরেম শরীফ থেকেই ছয় হাজার মানুষ লাব্বাইক বলে সাড়া দিলেন। আরবের দুজন নামকরা গোত্রপতি-ইবনে আমের এবং ইবনে মাম্বাহ কয়েক লক্ষ দিরহাম ও সওয়ারি উটের ব্যবস্থা করলেন। কাফেলার গন্তব্য নির্ধারণের জন্য হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিশ্রামাগারে পরামর্শ-সভা অনুষ্ঠিত হলো। হযরত আয়েশা রাযি.-এর মত ছিল, যেহেতু অবাঞ্ছিত সাবাঈ গোষ্ঠী এবং অন্যান্য বিদ্রোহীরা মদীনাতেই আছে, সেহেতু বাহিনী নিয়ে সেদিকেই যেতে হবে। হয়তো তাঁর মতই যথার্থ ছিল। এমনটা হলে, খুব সম্ভব, ঘটনার প্রেক্ষিত অন্য রকম হতো। কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও পর্যালোচনার পর বসরা অভিমুখে রওনা করার সিদ্ধান্ত হয়। হযরত আয়েশা রাযি. কাফেলা নিয়ে বসরার দিকে রওনা হলেন। উম্মুল মুমিনীনগণ-সহ অপরাপর জনসাধারণ হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিদায় জানাতে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। মানুষ সঙ্গে সঙ্গে পথ চলছিলেন আর অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলেন-এ কী হলো! এ কী হতে যাচ্ছে! মুসলমানদের ওপর এ কী বিভীষিকাময় সময় এসে পড়ল! ভাই ভাইয়ের রক্তপানে উদগ্রীব! আর সেই উৎকণ্ঠায়, সন্তানের ভালোবাসায় স্বয়ং মাতাকেই বের হতে হচ্ছে এত দিনের আরাধ্য নির্জনতা ও একাকিত্ব ভেঙে!

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বনু উমাইয়ার দূষিত বীজ

📄 বনু উমাইয়ার দূষিত বীজ


এদিকে বনু উমাইয়ার উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের পক্ষে, যাদের অন্যায় আর অনাচারের ফলেই পুরো মুসলিমজাহানে জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন, আত্মরক্ষার জন্য এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারত? এতদিন তারা দাপিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিল। এখানে-সেখানে আত্মগোপন করে শেষমেশ মক্কা শরীফের হেরেমে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই কালক্ষেপন না করে সুযোগসন্ধানী বিষাক্ত বীজটিও ঢুকে পড়ল উম্মুল মুমিনীনের পবিত্র কাফেলায়। আগুনের মতো যেন চারদিক ছড়িয়ে পড়ল, স্বয়ং মাতা আছেন বাহিনীর নেতৃত্বে। পথে পথে অসংখ্য মানুষ যোগ দিতে লাগল শান্তিকামী কাফেলায়—অনির্বাচনীয় আবেগ আর অনুভূতি নিয়ে, অফুরন্ত উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে।
বনু উমাইয়ার যুবকদের মনে না সংস্কারের বাসনা ছিল, না সমাধানের সংকল্প ছিল। তাদের যত মাথাব্যাথা ছিল—কী করে হযরত আলী রাযি. কে প্যাঁচের পর প্যাঁচ আর নানা গোলকধাঁধায় ফেলা যায়। তারা ধরেই নিয়েছিল, হযরত আয়েশা রাযি.-এর নেতৃত্বে অচিরেই একটি তৃতীয় শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে সেই তৃতীয় শক্তিটি হবে তাদের আরেক প্রতিপক্ষ। তাই যা করার এখনই করতে হবে। তারা অবিলম্বে গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে লাগল। যেহেতু সংশোধনকামী কাফেলায় একাধিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন, সেহেতু বনু উমাইয়ার যুবকদের যোগসাজশে জনমনে প্রশ্ন জাগল, অবাঞ্ছিত সাবাঈ গোষ্ঠীর পতনের পর বৃহত্তর মুসলিমজাহানের খলীফা হবেন কে? হযরত তালহা রাযি., না হযরত যুবায়ের রাযি.? হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টি বুঝতে পেরে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হাঙ্গামা প্রতিহত করলেন। কিন্তু জেগে উঠল নতুন প্রশ্ন—খেলাফতের কথা না হয় পরে ভাবা যাবে; কিন্তু আপাতত নামাযের ইমামতির হকদার কে? হযরত আয়েশা রাযি. হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.-এর পুত্রদ্বয়কে একদিন-একদিন করে পালাক্রমে ইমামতির দায়িত্ব দিলেন।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হাওয়াবের পুকুরিনী এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী

📄 হাওয়াবের পুকুরিনী এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী


পথ চলতে চলতে হাওয়াবের পুষ্করিণী সামনে এল। একদল কুকুর কাফেলার ভিড় দেখে ঘেউঘেউ শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনে পড়ে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে উচ্চারিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী—একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আল্লাহই জানেন, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে।
ভবিষ্যদ্বাণী মনে পড়ামাত্রই হযরত আয়েশা রাযি. পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেন। একাধারে কয়েকদিন কাফেলা এখানেই স্থির থাকল। অবশেষে প্রায় পঞ্চাশ জন সাক্ষ্য দিল, এটা হাওয়াব নয়। তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হযরত আয়েশা রাযি. নিশ্চিন্ত হলেন।
অন্যদিকে হযরত আলী রাযি. উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীর আগমনের কথা শুনে বসরার উদ্দেশে মদীনা থেকে যাত্রা করে ফেলেছেন। এদিকেও লোকমুখে রটে গেল, সামনে চলো, ওদিক থেকে হযরত আলী রাযি.-এর বাহিনী আসছে। দুদিক থেকে দুই বাহিনী যেন তিরগতিতে ধেয়ে চলেছে—এই হলো তাবারী ও অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থের বিবরণ। মুসনাদে আহমাদে ঘটনাটি স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতেই বিবৃত:
قَالَتْ لَمَّا أَتَتْ عَلَى الْحَوْابِ سَمِعْتُ نُبَاحَ الْكِلَابِ فَقَالَتْ مَا أَظُنُّنِي إِلَّا رَاجِعَةٌ . إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَنَا أَيْتُكُنَّ تَنْبَحُ عَلَيْهَا كِلَابُ الْحَوْابِ فَقَالَ لَهَا الزُّبَيْرُ تَرْجِعِينَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يُصْلِحَ بِكِ بَيْنَ النَّاسِ.
অর্থ : যখন কাফেলা হাওয়াবের নিকট পৌঁছল, তখন আমি কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এখন তো আমার মনে হচ্ছে, আমার ফিরে যাওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছিলেন, জানি না, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে। তখন হযরত যুবায়ের রাযি. বললেন, আপনি ফিরে যেতে চাচ্ছেন? হতে পারে, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
অন্য একটি বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে আছে:
فَقَالَ بَعْضُ مَنْ كَانَ مَعَهَا بَلْ تَقَدَّمِيْنَ فَيَرَاكِ الْمُسْلِمُوْنَ فَيُصْلِحُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ذَاتَ بَيْنِهِمْ
অর্থ: তখন কিছু লোক বললেন, বরং আপনি সামনে এগিয়ে চলুন, কেননা যদি মুসলিমগণ আপনাকে দেখেন, তা হলে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
এরকম একাধিক বর্ণনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শান্তিকামী কাফেলার সংশোধন আর শান্তিস্থাপন ছাড়া আর কোনোই উদ্দেশ্য ছিল না।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 কুফাবাসীর অবস্থা

📄 কুফাবাসীর অবস্থা


মক্কা মুআয্যমা, মদীনা মুনাওওয়ারা ও বসরার পর আরবের সবচেয়ে বড় নগরী ছিল কুফা। এখানকার আমীর ছিলেন হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি.। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিগণ যখন নিজ নিজ দলের পক্ষসমর্থনে যুক্তিতর্ক আর প্রমাণপঞ্জির মহড়া দিতে শুরু করেছেন, তখন হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি. এটাকে একটা বড় ফেতনা মনে করে বিবৃতি ও বক্তব্যের মাধ্যমে জনসাধারণকে সব ছেড়ে নির্জনবাস ও একাকিত্ব বরণের পরামর্শ দিয়ে চলে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. কুফার নেতৃবর্গের নামে পত্র প্রেরণ করতে লাগলেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং ইমাম হাসান রাযি. হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষ নিলেন। তাঁরা হযরত আয়েশা রাযি.-এর আহ্বানে সাড়া দেওয়া থেকে পিছিয়ে গেলেন। উপরন্তু হযরত আম্মার রাযি. একদিন কুফার জামে মসজিদে বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি বক্তব্যের শুরুতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব তুলে ধরলেন, এরপর বললেন, সবই ঠিক আছে; কিন্তু আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন—তোমরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পার কি না। তার বক্তব্য খুবই ক্রিয়াশীল প্রমাণিত হলো। কয়েক হাজার মানুষ তার সঙ্গে সুর মেলালেন। কিন্তু জনমনে সংশয় থেকেই গেল—একদিকে উম্মুল মুমিনীন, অন্যদিকে রাসূলের পিতৃব্যপুত্র ও জামাতা। ঠিক কী করা উচিত, কেউই যেন ঠাহর করতে পারছিলেন না।
হযরত আয়েশা রাযি. বসরার সন্নিকটে পৌঁছে কয়েকজনকে তথ্য সংগ্রহের জন্য বসরায় পাঠিয়ে দিলেন। শহরের আরব সরদারদের নামে পত্রও পাঠালেন। শহরে পৌঁছে স্বয়ং কয়েকজন নেতার বাড়িতে গেলেন। জনৈক গোত্রপতি অসম্মত ছিল জেনে তিনি নিজেই তার কাছে গেলেন এবং বোঝালেন। লোকটি বললেন, এটা খুবই লজ্জার হবে যে, আমি স্বয়ং মাতার কথাও রাখব না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00