📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 তিনি ছিলেন উচ্চ মনোবলসম্পন্না

📄 তিনি ছিলেন উচ্চ মনোবলসম্পন্না


প্রকৃতিগতভাবেই তিনি ছিলেন উচ্চ মনোবলসম্পন্না। তাঁর পবিত্র হৃদয় ছিল তেজস্বিতায় দ্বীপ্ত, সাহসিকতায় ভরা। তিনিই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিহাদে (ধর্মযুদ্ধ) অংশগ্রহণ করার অনুমতি চেয়েছিলেন; যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সে অনুমতি দেননি; বরং বলেছিলেন, হজই নারীর জিহাদ।’ এরও আগে, যখন পর্দার বিধান ছিল না, তিনি বেশ কিছু বিজয়াভিযানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থেকেছিলেন। একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বদরের যুদ্ধেও সঙ্গে ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম সৈন্যগণ প্রায় পর্যুদস্ত, বীর লড়াকুদের পদও যখন টলমল, এমন ঝুঁকির মুখেও হযরত আয়েশা রাযি. দৌড়ে দৌড়ে আহত সৈনিকদের পানি পান করাচ্ছিলেন। পরিখার যুদ্ধে মুসলিমগণ যখন অবরুদ্ধ, তখনো তিনি দুর্গ থেকে বের হয়ে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, নারীর স্বভাব ও প্রকৃতি নেতৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্বয়ং ইসলামই নেতৃত্বের যে অপরিহার্য গুণ ও শর্তাবলি আরোপ করেছে, তাতে নারী কখনোই নেতৃত্বের দায়ভার গ্রহণ করতে পারে না। এজন্যই ইসলাম তাদেরকে ঐশী বার্তাবাহকের দায়িত্ব (নবুওয়াত) দেয়নি; সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রতিনিধিত্ব (খেলাফত) থেকেও দূরে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। তাই বলে, কখনোই এমন ভুল বোঝা বা বোঝানো উচিত হবে না যে, একজন মুসলিম নারী কোনোক্রমেই জনগণকে পথপ্রদর্শন করতে বা মুসলিম যোদ্ধাদের দিক-নির্দেশনা দিতে পারবেন না-বিশেষত যখন গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা সর্বভুক হয়ে দেশ ও জাতিকে গ্রাস করে ফেলার উপক্রম হয় এবং তিনি মনে করেন যে, মুসলমানদের মধ্যে তিনি ছাড়া আর কেউই এ আগুন নেভাতে পারবেন না। ইমাম মালেক রহ., ইমাম তাবারী রহ., (অন্য এক বর্ণনা অনুযায়ী) ইমাম আবু হানীফা রহ.-সহ কতিপয় ইমামের দৃষ্টিতে প্রয়োজনে নারীও জনপ্রতিনিধি ও বিচারক হতে পারেন। হযরত উমর রাযি. তাঁর শাসনামলে বাজার-ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন একজন নারীর ওপর। শুধু তা-ই নয়, স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-ও যখন নারীদের মজলিসে থাকতেন এবং নামাযের সময় হয়ে যেত, তখন তিনি মধ্যখানে দাঁড়িয়ে যেতেন ইমাম হিসেবে।

টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, নারীদের হজ অধ্যায়।
২. সহীহ বুখারী, গাযওয়ায়ে উহুদ।
৩. মুসনাদে আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪১।
১. ফাতহুল বারী ও কাসতালানী, বাব কিতাব রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলা কিসরী।
২. আসমাউর রিজালে শিফা আদাবিয়ার জীবনী দেখুন।
৩. তাবাকাতে ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৩৬০। কিতাবুল উম্ম: ইমাম শাফেয়ী রহ. ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৪৫।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বসরা অভিমুখে

📄 বসরা অভিমুখে


যাই হোক, এটা ছিল হজের বছর। উম্মুল মুমিনীনের আহ্বানে শুধু হেরেম শরীফ থেকেই ছয় হাজার মানুষ লাব্বাইক বলে সাড়া দিলেন। আরবের দুজন নামকরা গোত্রপতি-ইবনে আমের এবং ইবনে মাম্বাহ কয়েক লক্ষ দিরহাম ও সওয়ারি উটের ব্যবস্থা করলেন। কাফেলার গন্তব্য নির্ধারণের জন্য হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিশ্রামাগারে পরামর্শ-সভা অনুষ্ঠিত হলো। হযরত আয়েশা রাযি.-এর মত ছিল, যেহেতু অবাঞ্ছিত সাবাঈ গোষ্ঠী এবং অন্যান্য বিদ্রোহীরা মদীনাতেই আছে, সেহেতু বাহিনী নিয়ে সেদিকেই যেতে হবে। হয়তো তাঁর মতই যথার্থ ছিল। এমনটা হলে, খুব সম্ভব, ঘটনার প্রেক্ষিত অন্য রকম হতো। কিন্তু সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও পর্যালোচনার পর বসরা অভিমুখে রওনা করার সিদ্ধান্ত হয়। হযরত আয়েশা রাযি. কাফেলা নিয়ে বসরার দিকে রওনা হলেন। উম্মুল মুমিনীনগণ-সহ অপরাপর জনসাধারণ হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিদায় জানাতে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। মানুষ সঙ্গে সঙ্গে পথ চলছিলেন আর অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলেন-এ কী হলো! এ কী হতে যাচ্ছে! মুসলমানদের ওপর এ কী বিভীষিকাময় সময় এসে পড়ল! ভাই ভাইয়ের রক্তপানে উদগ্রীব! আর সেই উৎকণ্ঠায়, সন্তানের ভালোবাসায় স্বয়ং মাতাকেই বের হতে হচ্ছে এত দিনের আরাধ্য নির্জনতা ও একাকিত্ব ভেঙে!

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বনু উমাইয়ার দূষিত বীজ

📄 বনু উমাইয়ার দূষিত বীজ


এদিকে বনু উমাইয়ার উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের পক্ষে, যাদের অন্যায় আর অনাচারের ফলেই পুরো মুসলিমজাহানে জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন, আত্মরক্ষার জন্য এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারত? এতদিন তারা দাপিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিল। এখানে-সেখানে আত্মগোপন করে শেষমেশ মক্কা শরীফের হেরেমে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই কালক্ষেপন না করে সুযোগসন্ধানী বিষাক্ত বীজটিও ঢুকে পড়ল উম্মুল মুমিনীনের পবিত্র কাফেলায়। আগুনের মতো যেন চারদিক ছড়িয়ে পড়ল, স্বয়ং মাতা আছেন বাহিনীর নেতৃত্বে। পথে পথে অসংখ্য মানুষ যোগ দিতে লাগল শান্তিকামী কাফেলায়—অনির্বাচনীয় আবেগ আর অনুভূতি নিয়ে, অফুরন্ত উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে।
বনু উমাইয়ার যুবকদের মনে না সংস্কারের বাসনা ছিল, না সমাধানের সংকল্প ছিল। তাদের যত মাথাব্যাথা ছিল—কী করে হযরত আলী রাযি. কে প্যাঁচের পর প্যাঁচ আর নানা গোলকধাঁধায় ফেলা যায়। তারা ধরেই নিয়েছিল, হযরত আয়েশা রাযি.-এর নেতৃত্বে অচিরেই একটি তৃতীয় শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে সেই তৃতীয় শক্তিটি হবে তাদের আরেক প্রতিপক্ষ। তাই যা করার এখনই করতে হবে। তারা অবিলম্বে গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে লাগল। যেহেতু সংশোধনকামী কাফেলায় একাধিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন, সেহেতু বনু উমাইয়ার যুবকদের যোগসাজশে জনমনে প্রশ্ন জাগল, অবাঞ্ছিত সাবাঈ গোষ্ঠীর পতনের পর বৃহত্তর মুসলিমজাহানের খলীফা হবেন কে? হযরত তালহা রাযি., না হযরত যুবায়ের রাযি.? হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টি বুঝতে পেরে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হাঙ্গামা প্রতিহত করলেন। কিন্তু জেগে উঠল নতুন প্রশ্ন—খেলাফতের কথা না হয় পরে ভাবা যাবে; কিন্তু আপাতত নামাযের ইমামতির হকদার কে? হযরত আয়েশা রাযি. হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.-এর পুত্রদ্বয়কে একদিন-একদিন করে পালাক্রমে ইমামতির দায়িত্ব দিলেন।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হাওয়াবের পুকুরিনী এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী

📄 হাওয়াবের পুকুরিনী এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী


পথ চলতে চলতে হাওয়াবের পুষ্করিণী সামনে এল। একদল কুকুর কাফেলার ভিড় দেখে ঘেউঘেউ শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মনে পড়ে গেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানে উচ্চারিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী—একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আল্লাহই জানেন, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে।
ভবিষ্যদ্বাণী মনে পড়ামাত্রই হযরত আয়েশা রাযি. পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেন। একাধারে কয়েকদিন কাফেলা এখানেই স্থির থাকল। অবশেষে প্রায় পঞ্চাশ জন সাক্ষ্য দিল, এটা হাওয়াব নয়। তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হযরত আয়েশা রাযি. নিশ্চিন্ত হলেন।
অন্যদিকে হযরত আলী রাযি. উম্মুল মুমিনীনের বাহিনীর আগমনের কথা শুনে বসরার উদ্দেশে মদীনা থেকে যাত্রা করে ফেলেছেন। এদিকেও লোকমুখে রটে গেল, সামনে চলো, ওদিক থেকে হযরত আলী রাযি.-এর বাহিনী আসছে। দুদিক থেকে দুই বাহিনী যেন তিরগতিতে ধেয়ে চলেছে—এই হলো তাবারী ও অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থের বিবরণ। মুসনাদে আহমাদে ঘটনাটি স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতেই বিবৃত:
قَالَتْ لَمَّا أَتَتْ عَلَى الْحَوْابِ سَمِعْتُ نُبَاحَ الْكِلَابِ فَقَالَتْ مَا أَظُنُّنِي إِلَّا رَاجِعَةٌ . إِنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَنَا أَيْتُكُنَّ تَنْبَحُ عَلَيْهَا كِلَابُ الْحَوْابِ فَقَالَ لَهَا الزُّبَيْرُ تَرْجِعِينَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يُصْلِحَ بِكِ بَيْنَ النَّاسِ.
অর্থ : যখন কাফেলা হাওয়াবের নিকট পৌঁছল, তখন আমি কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম, এখন তো আমার মনে হচ্ছে, আমার ফিরে যাওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেছিলেন, জানি না, তোমাদের কাকে দেখে হাওয়াবের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করবে। তখন হযরত যুবায়ের রাযি. বললেন, আপনি ফিরে যেতে চাচ্ছেন? হতে পারে, আল্লাহ আপনার মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
অন্য একটি বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে আছে:
فَقَالَ بَعْضُ مَنْ كَانَ مَعَهَا بَلْ تَقَدَّمِيْنَ فَيَرَاكِ الْمُسْلِمُوْنَ فَيُصْلِحُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ ذَاتَ بَيْنِهِمْ
অর্থ: তখন কিছু লোক বললেন, বরং আপনি সামনে এগিয়ে চলুন, কেননা যদি মুসলিমগণ আপনাকে দেখেন, তা হলে আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।
এরকম একাধিক বর্ণনা থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শান্তিকামী কাফেলার সংশোধন আর শান্তিস্থাপন ছাড়া আর কোনোই উদ্দেশ্য ছিল না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00