📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 খেলাফত-সঙ্কট

📄 খেলাফত-সঙ্কট


খেলাফতের জন্য চারজন বুযুর্গের প্রতিই ছিল অধিকাংশের নজর। তাঁরা হলেন হযরত তালহা রাযি., হযরত যুবায়ের রাযি., হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযি. এবং হযরত আলী রাযি.। এর মধ্যে হযরত সাদ রাযি. সংসারত্যাগী হয়ে পড়েন। সাধারণভাবে বসরাবাসীর মনোযোগ ছিল হযরত তালহা রাযি.-এর দিকে। আর মিশরবাসীর মনোযোগ ছিল হযরত যুবায়ের রাযি.-এর দিকে। তবে মিশরবাসী ও পরিবর্তনকামীদের একটি বিরাট অংশ চাইছিল হযরত আলী রাযি.-কে। এদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন আশতার নাখঈ, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রাযি.। অনেকে দ্বিতীয় খলীফার সাহেবজাদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি.-এর কথা বলছিল। বনু উমাইয়ারা বলছিল তৃতীয় খলীফার সাহেবজাদা হযরত আবানের নাম। প্রথম খলীফার পুত্র হযরত আবদুর রহমান রাযি.-এর নামও শোনা যাচ্ছিল। এভাবেই প্রায় তিন দিন পার হয়ে গেল। শেষমেষ বিদ্রোহীদের পীড়াপীড়িতে অল্প কিছু লোক ছাড়া মদীনার সর্বসাধারণের সম্মতিতে হযরত আলী রাযি. খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হেজাজে তখনো মতভেদ ছিলই। সিরিয়ায় হযরত মুআবিয়া রাযি. স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন দেখছিলেন। মিশরে মুহাম্মাদ ইবনে আবু হুযাইফা ইতোমধ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফেলেছেন।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হত্যাকে উম্মুল মুমিনিনের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান

📄 হত্যাকে উম্মুল মুমিনিনের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান


নবীজীর একজন প্রিয় সাহাবী, মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় নেতা ও সম্মানিত ইমাম হেরেমে নববীর অভ্যন্তরে অতি পবিত্র ও সম্মানিত মাসে মুসলমানদের হাতেই নৃশংসভাবে নিহত হলেন। এ এমন এক ট্রাজেডি ছিল যে, পুরো ইসলামী জাহানে একপ্রকার স্তব্ধতা ছেয়ে গেল। সাহাবা কেরামের মধ্যে হযরত উসমান রাযি.-এর কর্মকাণ্ডে যে সকল মহিমান্বিত ব্যক্তিবর্গ দ্বিমত প্রকাশ করেছিলেন, তাদের মধ্যে একটি বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি.-ও ছিলেন। তাঁরাও এ লোমহর্ষক ঘটনায় ছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাঁরা কেউই মুসলমানদের মধ্যে এমন অকল্যাণ ও বিপর্যয় কল্পনাও করতে পারেননি। হযরত উসমান রাযি.-এর হত্যাকাণ্ডের কিছুকাল পূর্বে আশতার নাখঈ হযরত আয়েশা রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই লোকটিকে (হযরত উসমান রাযি.) মেরে ফেললে কেমন হয়? তিনি বললেন-আল্লাহর পানাহ, যিনি ইমামগণের ইমাম তাঁর ব্যাপারে এহেন ধৃষ্টতা!
বিদ্রোহীদের দু-একজন গুজব ছড়িয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সম্মতি ছিল। তাদের প্রোপাগান্ডার পক্ষে অবশ্য একটা যুক্তি ছিল-হযরত আয়েশা রাযি.-এর অনুজ মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর বিদ্রোহী গ্রুপের একটি বিরাট অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. এ গুজবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি হযরত উসমান রাযি.-এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন-
'আল্লাহর কসম, আমি কখনোই চাইনি যে, হযরত উসমান রাযি.-এর কোনোরকম অসম্মান হোক। যদি কখনো এমন কিছু চেয়ে থাকি, তবে আমারও যেন এমনই হয়। আমি কখনোই চাইনি, তিনি নিহত হন। যদি কখনো চেয়ে থাকি তবে আমিও যেন নিহত হই। হে উবাইদুল্লাহ ইবনে আদি (ইনার পিতা হযরত আলী রাযি.-এর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন), আর যেন কেউ তোমাদের আমার ব্যাপারে ধোঁকা দিতে না পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবা কেরামের কর্ম ও কীর্তিকে ভূলুণ্ঠিত করার দুঃসাহস এই অবাঞ্ছিত দলটির উদ্ভব ঘটার আগে আর কারও হয়নি। এরা হযরত উসমান রাযি.-এর নামে অপবাদ আরোপ করেছে। শুধু তা-ই নয়, এরা এমন কিছু করেছেন—যা করা অনুচিত। এরা এমন কিছু বলেছেন—যা বলা অন্যায়। মুসলমানদের নামাযের সঙ্গে এদের নামাযের মিল নেই। আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি এদের চিন্তাধারা, এদের কর্মধারা সাহাবা কেরামের চিন্তাধারা ও কর্মধারা থেকে অনেক দূরে।”
পাঠক, চিন্তা করুন! শত্রুপক্ষের অজ্ঞাতনামা দু-একজনের ছড়ানো গুজবকে অসার বলে প্রত্যাখ্যান করার জন্য হযরত আয়েশা রাযি.-এর এমন দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের পরে আর কী লাগে?

টিকাঃ
১. তাবাকাতে ইবনে সাদ: আহলে মদীনা, তরজমায়ে মারওয়ান ইবনে হাকাম।
২. তাবাকাতে ইবনে সাদ, পৃষ্ঠা: ৩৫৬।
১. পুরো বক্তব্যটি ইমাম বুখারী রহ. خلق أفعال العباد অংশে উদ্ধৃত করেছেন। মাতবায়ে আনসারি, দিল্লি।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সঙ্কট-নিরসনে আকাবিরে সাহাবার মশওয়ারা

📄 সঙ্কট-নিরসনে আকাবিরে সাহাবার মশওয়ারা


পুরো মুসলিম-সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছিল। ভীষণ উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কাটছিল সময়। সাহাবা কেরামের আলোকিত কাফেলা বুকের রক্তসিঞ্চনে তিলে-তিলে যে স্বর্গোদ্যান গড়ে তুলেছিলেন, চোখের সামনে আকস্মিক কোনো দুর্যোগে তা যেন তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। সাহাবা কেরামের একটি ক্ষুদ্র কাফেলা আর সইতে পারলেন না; সংস্কার আর সংশোধনের ঝাণ্ডা উঁচু করলেন। এই ক্ষুদ্র কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন: হযরত তালহা রাযি., হযরত যুবায়ের রাযি. এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি.।
কুরাইশের সর্বাগ্রে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন হযরত তালহা রাযি. ছিলেন তাদের অন্যতম। অগণিত বিজয়াভিযানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থেকেছেন তিনি। প্রথম খলীফার জামাতা এবং সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভায়রা হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। হযরত যুবায়ের রাযি.-ও কম ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুসলিম বীর, লড়াকু ও সাহসী যোদ্ধাদের অন্যতম। সম্পর্কে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফাতো ভাই, ভায়রা এবং প্রথম খলীফার জামাতা। উপরন্তু এই দুই মহান মানুষই ছিলেন হযরত উমর রাযি. কর্তৃক খেলাফতের জন্য মনোনীত ছয় সদস্যের অন্তর্ভুক্ত।
যাই হোক, হযরত উসমান রাযি. অবরুদ্ধ থাকাবস্থায়ই হযরত আয়েশা রাযি. প্রতি বছরের রীতি অনুসারে হজের উদ্দেশে মক্কাভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তিনি হজ সম্পাদন করে মদীনায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে হযরত উসমান রাযি.-এর শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে মর্মাহত হন। আরও কিছু দূর এগিয়ে আসার পর হযরত তালহা রাযি. এবং হযরত যুবায়ের রাযি.-এর সাক্ষাৎ পান। তাঁরা দুজন মদীনা থেকে পালিয়ে আসছিলেন। তাঁরা হযরত আয়েশা রাযি.-কে বললেন-
إِنَّا تَحَمَّلْنَا بِقِلْتِنَا هَرَابًا مِّنَ الْمَدِينَةِ مِنْ غَوْغَاءٍ وَ أَعْرَابِ وَفَارَقْنَا قَوْمًا حَيَارَى لَا يَعْرِفُوْنَ حَقًّا وَلَا يُنْكِرُوْنَ بَاطِلًا وَلَا يَمْنَعُوْنَ أَنْفُسَهُمْ
অর্থ: আমরা কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবকের দৌরাত্ম্য ও অরাজকতা থেকে বাঁচতে মদীনা থেকে পালিয়ে এসেছি। মানুষের অবস্থা এই যে, তারা কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, কিছুই বুঝতে পারছে না। গা বাঁচিয়ে চলা বা আত্মরক্ষা করাও সম্ভব হচ্ছে না।
হযরত আয়েশা রাযি. তাঁদেরকে বললেন, আপনারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করুন—এই নাজুক মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিত! এরপর তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলেন-
وَلَوْ أَنَّ قَوْمِي طَاوَعَتْنِي سُرَاتُهُمْ * لَأَنْقَذْتُهُمْ مِنَ الْخَبَالِ أَوِ الْحَبْلِ
অর্থ: যদি আমার জাতির নেতৃস্থানীয়রা আমার কথা মানতেন, তা হলে আমি তাদেরকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারতাম।
এরপর তাঁরা তিনজনই মক্কা মুআয্যমায় ফিরে এলেন। জনসাধারণ তাঁদের প্রত্যাবর্তনের কথা জানতে পেরে চতুর্দিক থেকে ছুটে আসতে লাগলেন। তাঁরা সংস্কার ও সংশোধনের আহ্বান করলেন। উমরাহ বিনতে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আল্লাহ তাআলার এই বাণীকে যারা উপেক্ষা করবে তাদের মতো অপরাধী আর কেউ হবে না-
وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا اللَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا
অর্থ: যদি মুমিন-সম্প্রদায়ের দুটো দল আত্মকলহে লিপ্ত হয়, তা হলে তাদের সংশোধন করো। আর যদি একটি দল অন্য দলের ওপর অন্যায় করে, তা হলে সকলে মিলে অন্যায়কারী দলটির বিরুদ্ধে লড়াই করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়। যদি মেনে নেয়, তা হলে তাদের সংশোধন করো। (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ৯)

টিকাঃ
১. তারীখে তাবারী।
১. মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, বাবুত তাফসীর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00